১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

'আড্ডানামায়' জুয়েল আইচ: ‘কেবল আনন্দ দিতে চেয়েছি’

“মুক্তিযুদ্ধে আমাদের থ্রি নট থ্রি রাইফেল আর ওদের হাতে মেশিনগান, পতঙ্গের মত আমার বন্ধুদের মেরেছে।”

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 22 Aug 2026, 10:57 AM

Updated : 16 Sep 2026, 01:03 PM

পিরোজপুরের সমুদয়কাঠি গ্রামের বাড়িগুলোতে তখন বেদের দল আসত, থানা গাড়ত সার্কাস পার্টি; দেখাত রিং খেলা আর চোখ ধাঁধানো সব কায়দা কৌশল! 

সে সব দেখে ওই গাঁয়ের একটি শিশু ঠিক করে নেয়, এমন কিছু একটা করে তাক লাগিয়ে দিতে হবে, যা হবে সবার চেয়ে আলাদা।

ম্যাজিকের চিন্তা তখনও মাথায় আসেনি। কিন্তু সেই শিশুকালে বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে দলবল বানিয়ে ‘পা-কাটার’ খেলা দেখানোর প্রস্তুতি নিয়ে ফেলে সে। যদিও বড়দের শাসনে তা ভেস্তে যায়। 

এরপর স্কুলে খানিকটা উঁচু ক্লাসে উঠে সবার থেকে নিজেকে আলাদা প্রমাণ করার তাড়নায় সেই কিশোর ম্যাজিকের হাতেখড়ি নেয়। সেখান থেকেই শুরু। তিনি জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ। 

জাদুর কারিশমায় সবাইকে বিস্মিত করেন তিনি। দেশ-বিদেশের অতিথি ও দর্শকের সামনে অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন। সবাইকে হতবাক করে দেন, তারপর আনন্দে ভাসান। 

তার আরেকটি পরিচয়, তিনি বংশীবাদক। বাঁশিতে তোলেন ধ্রুপদী সংগীতের সুর।

গ্লিটজের সাক্ষাৎকার সিরিজ ‘আড্ডানামা’য় অতিথি হয়ে এসে জুয়েল আইচ শুনিয়েছেন তার জাদুর দুনিয়ায় ভ্রমণের গল্প, পাশাপাশি বলেছেন বাস্তব জীবনের জানান-অজানা নানা ঘটনার কথা।

তার বয়ানে উঠে এসেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় কীভাবে তার পা হারানোর দশা হয়েছিল। 

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের পাল্লায় পড়ে কীভাবে তার সিনেমা বানানোর শখ উবে যায়, সে কথাও বলেছেন সবিস্তারে। 

সব মিলিয়ে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার, মানুষের কল্যাণে আমৃত্যু কাজ করে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা উঠে এসেছে এই আড্ডায়।   

আড্ডনামা সঞ্চালনা করেছেন অভিনেত্রী নিমা রহমান। গ্লিটজের এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে আলোক হেলথকেয়ার এন্ড হাসপাতাল। বৃহস্পতিবার রাতে প্রচার হয়েছে ‘আড্ডানামা’র দ্বিতীয় পর্ব।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ফেইসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে এ অনুষ্ঠান।

আড্ডানামায় জুয়েল আইচ।

আড্ডানামায় জুয়েল আইচ।

জাদুর হাতছানি 

বি কে আইচ ও সরযু আইচের ছেলে জুয়েল আইচের আনুষ্ঠানিক নাম গৌরাঙ্গ লাল আইচ। পিরোজপুর জেলার সমুদয়কাঠি গ্রামে তার জন্ম; শৈশব-কৈশোর সেখানেই কেটেছে। গ্রামেই আনাড়ি হাতে তার প্রথম ম্যাজিক দেখানো।

ছেলেবেলার স্মৃতি হাতড়ে জুয়েল আইচ বলেন, "বেদেরা আসত আমাদের বাড়িতে। তারপরে ওইটা দেখে খুব ভালো লেগেছিল কিন্তু ম্যাজিক করব ভাবিনি। তো তারপরে সার্কাস এসেছিল জলাবাড়ি পাশের গ্রামে।"  

সেই সার্কাস দেখে জাদুকর হওয়ার প্রেরণা পান। তখনো স্কুলে তার নাম লেখানো হয়নি।

প্রথমবারই এক বন্ধুর ‘পা-কাটার’ ম্যাজিক দেখাতে গিয়ে একটুর জন্য বাঁচলেন লাঠির বাড়ি থেকে।

জুয়েল আইচ বলেন, "আমার চাইতে একটু ছোট বয়স কিন্তু বন্ধুর। তো ওর গলা কাটতে যাব, ও বলল না গলা না, পা-টা কাটো। তো কী করব ওর অনুরোধ রাখতে হল। সেসময় ওর বাবা করেছে কী তখন, হাতে একটা বড় লাঠি নিয়ে দৌড়ে এসে বলেন, 'এরে হারামজাদারা দেখি কে কার ঠ্যাং কাটে'। 

“আর তো সবাই দৌড়, কারণ তার স্বভাব সবাই জানে যে ওই লাঠি যে কারো মাথায় পড়তে পারে। এখন ওই আমি যার পা কাটছি ওর চোখ বন্ধ ছিল। তো ও ওই অভিনয়টা করতে পারল না। ও ভয়ে আমার দিকে তাকিয়ে অনুমতি না নিয়ে ও দিল দৌড়।" 

এ ধরনের ম্যাজিক দেখানোর অ্যাডভেঞ্চার তখনই শেষ বলে জানান জাদুশিল্পী।

জাদুর মঞ্চে জুয়েল আইচ। 

জাদুর মঞ্চে জুয়েল আইচ।

‘আনন্দ দিয়ে আনন্দ পাব’

কৈশোরে পিরোজপুরে সরকারি স্কুলে পড়ার সময় ‘সাধনা লায়ন সার্কাস’ এ জাদুশিল্পী আব্দুর রশিদের কাছ থেকে হাতে-কলমে কিছু শেখার সুযোগ হয় জুয়েল আইচের।

তার কথায়, আব্দুর রশীদ ‘অসাধারণ’ একজন জাদুশিল্পী ছিলেন। 

কীভাবে তার নাগাল পাওয়া গেল জানতে চাইলে জুয়েল আইচ বলেন, “উনার ম্যাজিক দেখে আমার খুব ভালো লেগেছিল। মানুষটিও খুব ভালো ছিলেন। তো আমি ঘুরঘুর করি দেখে তিনি বললেন, 'তোমাকে দেখছি কয়েকদিন যাবৎ এখানে ঘুরছ। ব্যাপার কী?’ 

“আমি বললাম আমার জাদু খুব ভালো লেগেছে, আমি শিখব। বললেন, ‘তাহলে তো তোমাকে আসতে হবে রেগুলার’। আমি বললাম আসব। তো উনি একটু একটু করে আমাকে কিছু শেখালেন।"  

আব্দুর রশিদের কাছে হাতেখড়ি হলেও, দর্শকদের স্টেজে তুলে তাদের হাসির খোরাক বানানোর বিষয়টি মানতে পারেননি জুয়েল আইচ। একটি ঘটনায় তার জীবনদর্শন ভিত্তি পায়।  

জুয়েল আইচ বলেন, "সেই সময় ম্যাজিশিয়ানরা দর্শকদেরকে স্টেজে ডেকে অথবা সার্কাসের রিংয়ের মধ্যে ডেকে নিয়ে নানা রকম মজা করতেন, হাসি তৈরি করতেন। রশিদ সাহেবের ম্যাজিক দেখে আমার খুবই ভালো লেগেছে। কিন্তু একদিন তিনি এক দর্শককে যখন বিদায় দিচ্ছেন তখন বলেন 'আরে সব টাকা তো ফেরত দাওনি। আরও তো রয়ে গেছে'। 

“তখন ওই দর্শকের এক পা দড়ির বাইরে আরেক পা রিংয়ের মধ্যে। উনি করলেন কী হাতের কৌটোটা লুঙ্গির নিচে ধরলেন। আর টপ টপ টপ টপ করে কতগুলো টাকা পড়ল। আর দর্শক চিৎকার করে হেসে উঠল।”

জুয়েল আইচ বলেন, “আমি হাসতে পারলাম না। আমি কুঁচকে গেলাম। আমি ওই মানুষটির জায়গায় নিজেকে বসালাম যে— আচ্ছা আমার যদি এরকম হত? তাহলে আমি কতখানি অপমানিত বোধ করতাম। আমি খুব কুঁচকে গেলাম। রশীদ সাহেবের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধটা আমার ছিল, সেটা আমার অনেকখানি কমে গেল। 

“আমি চিন্তা করলাম এইভাবে আমি ম্যাজিক দেখাব না। আমি আনন্দ দিয়ে আনন্দ পাব। অতএব দর্শককে সম্মানিত করে আমি সম্মানিত হব।”

এরপর কী ধরনের ম্যাজিকের কৌশল রপ্ত করবেন তা ভাবতে শুরু করেন জুয়েল আইচ। কবি বন্দে আলীয় মিয়া এবং চিত্রশিল্পী কাজী আবুল কাসেম তার মনের দরজা খুলে দেন। 

একজনের রূপকথার বই আর আরেকজনের বইয়ে আঁকা প্রচ্ছদ তাকে নিয়ে যেত কল্পনার রাজ্যে। 

“আমি চিন্তা করলাম যে, আরে ম্যাজিক করলে তো এইরকম করে করব। আমি ওই আব্দুর রশিদ সাহেবের কাজের সঙ্গে কল্পনায় এইটা মিলালাম। মিলিয়ে আমি ভিন্নরকম করে ম্যাজিক করতে শুরু করলাম।”

জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ

জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ

‘যুদ্ধে পতঙ্গের মত আমার বন্ধুরা মরেছে’

এইচএসসি পাসের পর পিরোজপুর ছাড়েন জুয়েল আইচ। ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। তবে বিএ পরীক্ষার আগে বেজে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের দামামা। বন্ধুকে নিয়ে ঘর ছাড়েন তিনি।

“মুক্তিযুদ্ধের সময় তো আর পরীক্ষা দেওয়ার সেই মন থাকে না। আমি বাড়িতে কাউকে না বলে যুদ্ধে চলে গেলাম। পেয়ারা বাগানে, ওখানে স্বরূপকাঠি, ঝালকাঠি এবং বানারীপাড়া তিনটে থানা নিয়ে একটা বিশাল পেয়ারা বাগান। সেইখানে মুক্তিযোদ্ধারা আছে খবরটা পেয়ে আমি পালিয়ে চলে গেলাম আমার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে। সেইখানে যুদ্ধ করলাম।"

থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে নিয়ে পাকিস্তানিদের মেশিনগানের সামনে দাঁড়িয়ে যান জুয়েল আইচ ও তার সহযোদ্ধারা।

যুদ্ধের শুরুর দিকের কথা তুলে ধরে জুয়েল আইচ বলেন, “ভয়ঙ্কর কঠিন যুদ্ধ ছিল। আমাদের প্রথম দিকে থ্রি নট থ্রি রাইফেলে টার্গেট প্র্যাকটিস ছিল। আমার বন্ধু ছিল মেজর জিয়া, আমার ক্লাসমেট ছিল। ওর সঙ্গে ওই যে পাখি মারার বন্দুক, ওই টার্গেট প্র্যাকটিস ছিল। কিন্তু অধিকাংশেরই ওই রকম টার্গেট প্র্যাকটিসও ছিল না।”

জুয়েল আইচ দেখেছেন দেশ বাঁচানোর যুদ্ধে ধনী-গরিবের কোনো শ্রেণিভেদ ছিল না। সহায়সম্বলহীন মানুষেরাও যুদ্ধ নামতে পিছপা হননি।

তিনি বলেন, “আমরা যারা একটু সচ্ছল পরিবারের, কঠিন দারিদ্র্য কিন্তু দেখিনি। তাদের অনেকেই গায়ে শার্ট ছিল অনেকের গেঞ্জিটা এতটাই ছেঁড়া যে দুই পাশে এতখানি হাঁ করে গিট দিয়ে তারপরে সেই গেঞ্জি পরা। এইরকম মানুষগুলো যুদ্ধ করেছেন। আমাদের থ্রি নট থ্রি রাইফেল আর ওদের হাতে মেশিনগান আর কত কী!”

সহযোদ্ধাদের মৃত্যুর কষ্ট এখনো বুকে বয়ে বেড়ান জুয়েল আইচ। 

“পতঙ্গের মত আমাদের বন্ধুরা মারা গেছে। এরকম হয়েছে যে কাউকে ঠিকমত কবরও দিতে পারেনি। কোনোরকমে গর্ত করে মাটি চাপা দিতে হয়েছে, এরকম অবস্থা হয়েছে।”

পরে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পান জুয়েল আইচ। তার কথায়, তিনি ‘মরতেই’ গিয়েছিলেন।     

"স্বরূপকাঠিতে সেহাংগল বলে একটা গ্রাম ছিল। ওখানে গিয়ে খলিল হাজরা নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হল। সেহাংগলের আমাদের যে এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) ছিলেন, উনার নাম ছিল এনায়েত হোসেন খান। উনি পাঠিয়েছিলেন খলিল হাজরাকে ভারত থেকে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে জয়েন করতে চাই তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। 

“আমি তো অলরেডি রেডি। কিন্তু প্রথম দিকে মানুষ কিন্তু অত আগ্রহী...মানে অত সাহস পেত না। আগ্রহ থাকলেও সাহস ছিল না। আমার তো অলরেডি সাহস আছে। আমি তো মরতেই গিয়েছিলাম। সেই সময় তো অন্যরকম তেজ।"

ডাক্তার বললেন 'পা-কাটতে হবে'

মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণ নিতে একটি দলের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জে চলে যান জুয়েল আইচ, সেখান থেকে হাসনাবাদে। ওখানেই তার পায়ে গ্যাংগ্রিন ধরা পড়ে।

জুয়েল আইচ বলেন, “হাসনাবাদে গিয়ে একটা লঞ্চে ছিলাম। তারপরে আমাদেরকে রিক্রুট করতে আসে। তো আমার পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়ে গিয়েছিল।”

এ কথায় সঞ্চালক নিমা রহমান আঁতকে ওঠেন! জুয়েল আইচের গল্পে আসে গতি।

“আমি যখন ওই লাইনে দাঁড়ালাম, তো যারা আমাদেরকে রিক্রুট করতে এসছেন, উনাদের মধ্যে একজন বাঙালি অফিসার ছিলেন। উনি আমার ওই ফোলা পা দেখে ক্ষেপে গেলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ? তোমরা ওকে যুদ্ধে পাঠাবে? তোমরা দেখছ না ও ছেলেটা হাঁটতে পারছে না?’ এক পায়ে ওই পায়ে একটু ভর দিয়ে আমি খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগোচ্ছিলাম। বলা হল, ‘ওকে এক্ষুনি হাসপাতালে পাঠাও’। উনি আমাকে উনার জিপে করে আমাকে দমদম ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেলেন। তো সেইখানে আমার পা কাটার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।”

সেখানে সুদেব নামের এক তরুণ চিকিৎসকের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত পা অক্ষত থাকে জুয়েল আইচের। তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

সেই গল্পটি শোনানোর অনুরোধ জানালে জুয়েল আইচ বলে চলেন, “সুদেব তরুণ ডাক্তার, অনেক পড়াশোনা করা, সে গোপনে এসে একটা লম্বা সুঁইয়ের মত সরু জিনিস আমার পায়ের মধ্যে ঢোকাতে শুরু করল নিচ থেকে। আমি টেরও পাইনি। কিন্তু একটু উপরের দিকে যখন উঠল, হাঁটুর নিচে যখন আমি চিৎকার করে উঠলাম। সে দেখে খুশি হয়েছে। সে কিন্তু আমার বন্ধু। সে আমাকে এত ব্যথা দেবে আমি ভাবতে পারিনি। কিন্তু সে খুশি হয়েছে আমার ব্যথা দেখে! 

“সে বলল, পা কাটতে হবে না। আমি বললাম 'সত্যি?' কারণ একটা পা নেই আমি সারাজীবন এভাবে চলব এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছিল। তো আমার সেই ডাক্তার বন্ধু আমাকে বলল তোমার কোনো ভয় নেই। তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাবে স্বাক্ষর করে যে আমার পা কাটার দরকার নেই। আমি পরের ব্যবস্থা করব। তো আমি বললাম আমার তো টাকাপয়সা কিচ্ছু নেই।”

সুদেব তখন জুয়েল আইচের চিকিৎসার সব ভার নিজের কাঁধে নেন। 

দমদমের সেই চিকিৎসকের কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে জুয়েল আইচের।

“সত্যি সুদেব মানে দেবতার মতো সু। সে যে কী করল...মানে ভাবতে গেলে বুকটা কেমন করে ওঠে, কান্না আসে চোখে।”

পা ভালো হওয়ার পর ওই চিকিৎসকই বাহাদুরপুর ক্যাম্প স্কুলে জুয়েল আইচের শিক্ষকতার চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। 

কিন্তু পরে সুদেবের আর কোনো খোঁজ পাাননি জাদুশিল্পী। সেই আক্ষেপ তার এখনো আছে।

স্ত্রী বিপাশাকে নিয়ে মঞ্চে জুয়েল আইচ

স্ত্রী বিপাশাকে নিয়ে মঞ্চে জুয়েল আইচ

‘ম্যাজিক লেগে গেল, ব্যস, এবার আর যায় কই’

নিজের সম্পর্কে জুয়েল আইচের বর্ণনা হল, “যা ভালো লাগত আমি তাই করতাম। আর মানুষের যা ভালো লাগত, আর আমি যদি সেটা পারতাম, তা করতে না করতাম না। তো আমি প্রত্যেক বছর শীতকালে একটা আতশবাজি করতাম। আমার নিজস্ব কায়দার আতশবাজি।"

কেমন সেই আতশবাজি? জুয়েল আইচ বলেন, "দিনের বেলা তো আতশবাজি হয় না। আমার আতশবাজি দিনের বেলাও হত। রাতের বেলা তো হতই। আমার আতশবাজি অনেক উপরে উঠে দুম করে ফেটে গিয়ে ওখান থেকে এক সাহেব ছাতা মাথায় নিয়ে হাতে একটা ব্রিফকেস নিয়ে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ভাসতে অনেক দূর পর্যন্ত গেল।”

প্রচলতি ধারার বাইরে কিছু করার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল জুয়েল আইচের। সে সময় বয়সে বড় কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীর অনুরোধে ম্যাজিকের শো করেন জুয়েল আইচ। জলাবাড়ি হাটে মঞ্চের ব্যবস্থা তারাই করেন।

কেমন হল সেই ম্যাজিক? জুয়েল আইচ হাসতে হাসতে বললেন, “করলাম ম্যাজিক। ম্যাজিক লেগে গেল। ব্যস। এবার আর যায় কই।”

এরপর একে একে স্বরূপকাঠি, ভাণ্ডারিয়া, পিরোজপুর ও বরিশালে ডাক পড়তে থাকে তার। চারদিকে জুয়েল আইচের জাদুর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। দূর দূরান্ত থেকে শিশু, ছেলে-বুড়ো নানা বয়সের দর্শক তার শো দেখতে আসতেন। 

তিনি বলেন, “মানে একেবারে চারিদিকে হইচই লেগে গেল। ডাক পড়ে গেল। আর সেই সময় এক্সিবিশন হত। সেখানে ওই ধরনের ম্যাজিক তো দেখেনি কেউ। সেই কারণে আমার প্যান্ডেলে ভিড়ও হত একেবারে সার্কাস অথবা যাত্রার চাইতেও বেশি লোক আসত আমার ম্যাজিকে।”

স্ত্রী বিপাশা আইচ ও মেয়ে খেয়া আইচের সঙ্গে জুয়েল আইচ

স্ত্রী বিপাশা আইচ ও মেয়ে খেয়া আইচের সঙ্গে জুয়েল আইচ

‘সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেল’

ঢাকায় জাদুশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে এক কঠিন সময় পার করতে হয়েছে জুয়েল আইচকে। প্রথম দিকে তিনি রেডিওতে বাঁশিতে ক্লাসিক্যাল বাজাতেন। 

১৯৭৭ সালে একটা দুর্ঘটনা ঘটে। একদল ডাকাত জলাবাড়িতে জুয়েল আইচের বন্ধুর বাড়ি পুড়িয়ে দেয়, সেখানে ছিল তার জাদুর সব সরঞ্জাম।

“তো ওর বাড়িসমেত আমার জিনিসপত্র সমেত সবকিছু পুড়ে গেল।”

ফলে শো করার মত আর কোনো পরিস্থিতি ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে তাকে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য একের পর এক টেলিগ্রাম পাঠানো হচ্ছিল।  

জুয়েল আইচ বলেন, “সেই টেলিগ্রাম আমি দেখি, আর কষ্ট পাই। কারণ আমাকে ডাকা হচ্ছে কিন্তু আমি যেতে পারছি না। আমি রেখে দিই। ফিফথ টেলিগ্রামটা যখন এল, আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে গেল আমার ফ্রেন্ড। পড়ে দেখে যে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পাঠিয়েছেন এবং টেলিগ্রাম ওই যে সংক্ষিপ্ত ভাষায় লেখা থাকে, ওই রকম না। বেশ কয়েক লাইন। 

“তো আমার সেই বন্ধুটা আমার উপর চটে গেল। বললো, ‘তুই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সাহেবকে চিনিস?’ আমি বললাম না তো। ‘তুই জানিস যে উনার প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারলে তার জীবন ধন্য হয়ে যায়?’ 

“আমার বন্ধু বলল, ‘এরকম একজন মানুষ পাঁচ পাঁচটা টেলিগ্রাম করে আর তুই হা করে তাকিয়ে থাকিস আর পকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখিস? জোর করে সেইদিন আমাকে লঞ্চে তুলে দিল। আমি চলে এলাম।” 

টেলিভিশন শোতে সাফল্যের কৃতিত্ব জুয়েল আইচ দেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে। 

“শুরু হল একের পর এক শো এবং টেলিভিশনে প্রথম শোতেই মানুষ পছন্দ করে ফেলল। তারপর তো প্রত্যেকটা প্রোগ্রামে উনি (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ) নিতে শুরু করলেন। বিশেষ করে আনন্দমেলায়।”

জুয়েল আইচ বলেন, বিটিভি থেকে ঈদের আনন্দমেলা করার দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, অনেকজনকে একসঙ্গে জড়ো করে অনুষ্ঠান করাটা তার জন্য কঠিন। তিনি কেবল ম্যাজিক শো দিয়ে একটি আনন্দমেলা করতে চাইলেন, তাতে বিটিভি কর্তৃপক্ষ রাজি হয়ে গেল। 

“আমি করলাম। তো সেটাও মানুষ খুব অ্যাকসেপ্ট করল।”

‘আমি চিনে ফেললাম, হি ইজ অরসন ওয়েলস'

দেশে পরিচিতি পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পা রাখেন জাদুশিল্পী। ১৯৮০ সালে তিনি 'সোসাইটি অব আমেরিকান ম্যাজিশিয়ানস' এর আমন্ত্রণ পান সেখানকার একটি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার। পরের বছর সরকারি সহযোগিতায় দলবল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বস্টনে যান জুয়েল আইচ।

শোয়ের গল্প জুয়েল আইচ বলেন এভাবে, “আমি তো ইংরেজি জানি, কিন্তু ওদের বাচনভঙ্গির সঙ্গে পার্থক্য থাকায় আমার একটু সংশয় ছিল যে ওরা বুঝবে কি না। আমাদের এখানে তো একটা ম্যাজিক শেষ হলে হাততালি পড়ে, আর ওদের ওখানে দেখা গেল একটা ম্যাজিকের মধ্যেই চার-পাঁচবার হাততালি পড়ছে। আমি ভাবলাম যে ওরা কি আমাকে বিদ্রুপ করছে?”

শো শেষে একটি ঘটনায় জুয়েল আইচের জীবনের বাঁক আরও একটু বদল হয়।

“শোয়ের পরে আমি মুখ ধুতে গেছি। একটা বাচ্চা ছেলে এসে বলল, 'জুয়েল, অরসন ইজ ওয়েটিং ফর ইউ'। আমি ওকে ফলো করলাম। গিয়ে দেখি একজনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অনেকে। আমি যেতেই দুভাগ হয়ে গেল। দেখা গেল একজন ভদ্রলোক বসে আছেন মোটা সোটা, পাশের সিটটা ফাঁকা। আমাকে বসতে বললেন। উনি বললেন 'বয়, ইউ ডিড ইট'। 

“আরে আমি তো এই ভয়েস চিনি। তারপরে যখন বললেন যে তোমার ম্যাজিক তো সবার চাইতে আলাদা। এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমি চিনে ফেললাম। হি ইজ অরসন ওয়েলস।”

জুয়েল আইচের এই কথায় বিস্ময় প্রকাশ করেন সঞ্চালক। নিমা রহমান বলেন, “অরসন ওয়েলসকে দেখলে তুমি সামনাসামনি?”

জুয়েল আইচ বলেন, “উনি আমাকে আদর করে এমনভাবে বললেন যে তুমি সবার চাইতে আলাদাভাবে ম্যাজিক করো এবং তোমার ম্যাজিকের মধ্যে তুমি গল্প বলো এবং সেই গল্পের মাধ্যমে তুমি তোমার দেশকে তুলে ধরতে পারো।”

এর পরের ঘটনা আরও চমকপ্রদ। হলিউড নির্মাতার মনে হয়েছিল, জুয়েল আইচের মধ্যে একজন পরিচালক সত্তা আছে সুপ্ত অবস্থায়। তাই জুয়েল আইচকে পরিচালনার উপরে পড়াশোনার জন্য পাঠালেন হলিউড ফিল্ম স্কুলে।

জাদুশিল্পী বলেন, “উনি একটা নাম দিলেন, ফোন নম্বর দিলেন এবং বললেন যে ওখানে চলে যাও, তোমাকে নিয়ে নেবে। কোথায় বস্টন আর কোথায় হলিউড। হলিউড ফিল্ম স্কুল। সেখানে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন আমাকে একটা কোর্স করার জন্য। ডিরেকটিংয়ে তিন মাসের শর্ট কোর্স।”

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে জুয়েল আইচ

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে জুয়েল আইচ

‘হ‌ুমায়ূন আর আমি, ছিলাম হরিহর আত্মা’ 

নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হ‌ুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে সখ্য ছিল জুয়েল আইচের। কেমন করে বন্ধুত্ব হল জানতে চাইলে জাদুশিল্পী বলেন, যোগাযোগ শুরু পিরোজপুরে থাকতে। 

“হ‌ুমায়ূনের বাবা রহমান সাহেব ছিলেন পিরোজপুরের পুলিশ কর্মকর্তা। সে সময় ছুটিতে হ‌ুমায়ূন যেতেন।”

সেখানে লেখকের সঙ্গে জুয়েল আইচের পরিচয় শুরু হলেও প্রকৃত আত্মার টান তৈরি হয় ঢাকায় আসার পর।    

“ঢাকায় এসে উনার প্রথম যে ধারাবাহিকটা (এইসব দিনরাত্রি) চালু হল, ওখানে যুবরাজকে (খালেদ খান) ম্যাজিশিয়ানের রোল দিয়েছিল। টেলিভিশনে আমি ওকে ইন্ট্রোডিউস করে দিচ্ছিলাম, জুয়েল আইচ হিসেবে।

“ওইখান থেকে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার ভাবটা তৈরি হতে হতে এমন হয়ে গেল যে একেবারে হরিহর আত্মা হয়ে গেলাম আমরা। মানে একজন আরেকজনকে ছাড়া চলত না। যখনই তার ফুরসত হত, আমাকে ডাকত। এবং সে ডাকলে আমি আর না গিয়ে পারতাম না।”

‘একটা সুন্দর পরিচ্ছন্ন জীবন কাটিয়ে চলে যেতে চাই’ 

মরণোত্তর দেহদানের সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছিলেন জুয়েল আইচ। নতুন করে ভেবেছেন আরেকটি কথা।

“আমি চাই তাজা অবস্থায় আমার সমস্ত অর্গান যাতে মানুষের কাজে লাগে! আমি বারডেমের আজাদ ভাইকে (ড. এ কে আজাদ খান) গিয়ে বলব 'আজাদ ভাই, আমাকে অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে আমার সমস্ত অর্গানগুলোকে নিয়ে যার যার দরকার তাকে দিয়ে দেন'।" 

আড্ডানামায় জুয়েল আইচ।

আড্ডানামায় জুয়েল আইচ।

জুয়েল আইচ বলেন, "আমার মনটা একেবারে ছটফট করে এইটা করার জন্যে। কারণ তাহলে আমাদের এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে দারুণ একটা উৎসাহ তৈরি হবে, সাহস তৈরি হবে। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে মানুষকে দিয়েই তো আমি পেতে চাই। মানুষকে দিয়েই আনন্দ, ওটাই আমার আনন্দ।"

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে জাদুশিল্পী বলেন, বর্তমানে যারা ম্যাজিক করছে তাদের সবভাবে সহযোগিতা করছেন তিনি।

আর বাকি জীবন নিয়ে জুয়েল বলেন, ‘একটা সুন্দর পরিচ্ছন্ন জীবন কাটিয়ে চলে যেতে চাই।”