Published : 12 Sep 2025, 09:52 PM
বাউল সাধকেরা যে সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের সমাজ গড়েছিলেন, তা এখন বিলুপ্তপ্রায় বলে মন্তব্য করেছেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী।
তিনি বলেছেন, “বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা যখন সমাজে সম্প্রীতির বাঁধনকে আলাদা করে দেয়, যখন সমাজে বিভক্তি বাড়তে থাকে, যখন সহিষ্ণু সমাজটি অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে, তখন শাহ আবদুল করিমকে বারবার স্মরণ করতে হবে।”
২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হন প্রায় দেড় হাজারের মতো গানের স্রষ্টা প্রয়াত লোকসাধক শাহ আবদুল করিম। তাকে স্মরণ করে শুক্রবার সন্ধ্যায় ‘শ্রোতার আসর’ আয়োজন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।
শুরুতেই আয়োজনটির তাৎপর্য নিয়ে বক্তব্য দেন সারওয়ার আলী।
তিনি বলেন, “ছায়ানট প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সচেষ্ট ছিল আবহমান যে বাংলা গান, তার আগ্রহী শ্রোতা সৃষ্টি করতে। ছায়ানট প্রতিষ্ঠার প্রথম বছর থেকেই ‘শ্রোতার আসর’ আয়োজন করে আসছে। এখন প্রতি দুই মাসে একবার এ আয়োজন করা হয়।
“এবারের শ্রোতার আসরটি একটি বিশেষ আয়োজন। বাউল সাধক শাহ আবদুল করিমকে আমরা স্মরণ করছি আজকের বাস্তবতায়, প্রাসঙ্গিকতায়।”
বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাধরেরা ‘অপ্রকৃতিস্থ’ হয়ে পড়েছে মন্তব্য করে সারওয়ার আলী বলেন, “এমন সময় শাহ আবদুল করিম যে ‘বাউলের পৃথিবীর স্বপ্ন’ দেখেছেন, তা আমাদেরও স্বপ্ন।
“শাহ আবদুল করিম ব্যতিক্রমী এক বাউল সাধক। তিনি গান করেছেন বাঁচার জন্য, বঞ্চনার বিরুদ্ধে। তিনি সমাজ সচেতন বাউল সাধক। করিমের গান মানুষকে সম্প্রীতির বাঁধনে বাঁধে।”
বাংলার গ্রামীণ সমাজে বৈষম্য ছিল, রক্ষণশীলতা, কুসংস্কারও ছিল উল্লেখ করে সারওয়ার আলী বলেন, “তারপরও গ্রামীণ সমাজে যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছিল, সেটি সম্ভব হয়েছিল বাংলার লোকগীতিধারার কারণে।
“লালন থেকে সুনামগঞ্জের শাহ আবদুল করিম- এই ধারার পরম শ্রদ্ধার মানুষ। তারা গ্রামীণ সমাজে একটি সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের সমাজ গড়েছিলেন, যা এখন বিলুপ্তপ্রায়।”
সংগীত পরিবেশনার শুরুতেই শিল্পী ফারজানা আফরিন ইভা শোনান শাহ আবদুল করিমের জনপ্রিয় গান- ‘প্রাণ নাথ ছাড়িয়া যাইও না বন্ধুরে’ এবং ‘তোমার পিরিতে বন্ধু গো’।
পরে সোহেল রানা শোনান- ‘মন মিলে মানুষ মিলে সময় মিলে না’ এবং ‘জীবন আমার ধন্য যে হয়’ গান দুটি।
নাজমুল আহসান তুহিন গেয়ে শোনান- ‘মানুষ হয়ে তালাশ করলে মানুষ পাওয়া যায়’ এবং ‘দরদীয়া রে বন্ধু’ গান দুটি। বিমান চন্দ্র বিশ্বাস গেয়ে শোনান- ‘কেন পিরিতি বাড়াইলি রে বন্ধু’ এবং ‘ভব সাগরের নাইয়া’ গান দুটি।
আবুল কালাম আজাদ গেয়ে শোনান- ‘মন মজালে ওরে বাউলা গান’ এবং ‘আগের বাহাদুরি এখন গেল কই’ গান দুটি।
অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে ছিল খ্যাতিমান লোকসংগীতশিল্পী চন্দনা মজুমদারের পরিবেশনা। তিনি শোনান- ‘কূলমান সঁপিলাম তোমারে’, ‘তুমি বিনে আকুল পরান’ এবং ‘আমার প্রাণ কান্দে’ গানগুলো।
শাহ আবদুল করিমের শিষ্য বাউল রণেশ ঠাকুর এসেছিলেন সুনামগঞ্জ থেকে। আয়োজন শেষ হয় তার পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। তিনি গেয়ে শোনান- ‘মোদের দিন গেল গোলমালে’, ‘সাধ করে পরেছি গলে’ এবং ‘কূল হারা কলঙ্কিনী’ গানগুলো।
অনুষ্ঠানে নেপথ্য পাঠ ও সঞ্চালনায় ছিলেন জয়ন্ত রায়।
যন্ত্রণাসঙ্গে ছিলেন- দোতারায় রতন কুমার রায়; মন্দিরায় প্রদীপ কুমার রায়; ঢোলে দশরথ দাশ; তবলায় স্বরূপ হোসেন এবং বাঁশিতে ছিলেন মামুনুর রশীদ।