Published : 02 May 2026, 09:48 PM
চুয়াল্লিশ বছর আগে, ১৯৮২ সালের কথা। একের পর এক হিট সিনেমা আর বিশাল ভক্তকূলের ভালোবাসা- সবমিলিয়ে বিনোদ খান্না তখন বলিউডে খ্যাতির চূড়ায়। ঠিক সেই সময় তার সিনেমা ছাড়া ঘোষণায় চমকে গিয়েছিল সবাই। কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সে সময়ের বড় এই তারকা?
অনিয়ন্ত্রিত জীবন থেকে আধ্যাত্মিকতা টেনেছিল বিনোদ খান্নাকে। গোছানো একটি জীবনের সন্ধানে নামতেই ওরেগনের রজনীশপুরমের আধ্যাত্মিক গুরু ওশোর আশ্রমে যোগ দিতেই সিনেমা ছেড়েছিলেন তিনি।
তার এই আকস্মিক বিদায় দর্শকদের করেছিল হতবাক, পরিবারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল পাশাপাশি তার ক্যারিয়ারের গতিপথও বদলে দিয়েছিল।
যা বলেছিলেন বিনোদ খান্না
সিনেমা ছাড়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন বিনোদ। সংবাদ সম্মেলন ডেকে প্রকাশ্যে সেই ঘোষণা দিয়েছিলেন; বলেছিলেন, আধ্যাত্মিক জীবন বেছে নিতে সিনেমা ছাড়ছেন। স্পষ্ট করেই বলে দিন, যে পথ বেছে নিতে যাচ্ছেন, তার প্রতি তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পরে সিমি গারেওয়ালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তার সিদ্ধান্তটি স্বার্থপরের মতো হলেও নিজের মনোজগতের উন্নতির জন্য প্রয়োজন ছিল।
“এটা ঠিক যে, স্বার্থপর না হলে আপনি এমন কিছু করতে পারবেন না। কারণ আপনার সত্তাকেই সেই উত্তরণের পথ খুঁজে পেতে হবে সবাইকে একাই পথ চলতে হয়। আপনি একাই আসেন, একাই যান। আপনাকে নিজের পথে একাই চলতে হবে।
“আমি আমার পরিবারের সাথেই ছিলাম। এমন না যে পালিয়ে গিয়েছিলাম। আমি সবকিছুর ব্যবস্থাই করেছিলাম।”
কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, প্রশ্নে বিনোদ খান্না ওই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “নিজের মনের জন্য। অতিরিক্ত চিন্তা করতাম। খুবই বিচলিত ছিলাম। চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। খুব যেতাম। এক চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। মানুষ আপনার মেজাজ খারাপ করে দিতে পারে, আপনাকে প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য করতে পারে। সবকিছু আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
“কিন্তু আমি দেখতাম, যখন ধ্যান করতাম, এই বিষয়গুলো আমাকে একেবারেই প্রভাবিত করত না। আপনাকে নিজের মনের প্রভু হতে হবে এবং এই বিষয়গুলোই আমাকে বলতে বাধ্য করেছিল যে, যথেষ্ঠ হয়েছে, আমি যথেষ্ঠ টাকা উপার্জন করেছি... এখন, যদি আমি ধ্যানে ডুব দিতে চাই তবে আমাকে এতে পুরো সময় দিতে হবে। আমাকে একটি আশ্রমে থাকতে হবে, আমার গুরুর চরণে বাস করতে হবে। সুতরাং, স্পষ্টতই, আমার এর প্রয়োজন ছিল।"
অক্ষয় খান্নার ভাবনা
বিনোদ যখন সিনেমাকে বিদায় বলেছিলেন, তখন ছেলে অক্ষয় খান্না মাত্র পাঁচ বছরের শিশু।
সিমি গারেওয়ালকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে অক্ষয় খান্নার কাছে প্রশ্ন ছিল, পাঁচ বছর বয়সে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কি না কী ঘটেছিল?
অক্ষয়ের ভাষ্য, “না, আমার মনে হয় না যে ওই বয়সে কেউ কিছু বুঝতে পারে। কিন্তু বিষয়গুলোর পেছনের ঘটনা সম্পর্কে আমাদের মোটামুটি ধারণা ছিল। সত্যি বলতে, আমার মনে পড়ে না যে আমাকে কখনো এটা ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। ব্যাপারটা এমনই ছিল।
“কিন্তু আমার মনে পড়ছে না... ওই বয়সে এসব বোঝা যায় না... প্রত্যেকেরই পরিস্থিতি সামলানোর নিজস্ব উপায় থাকে, কেবল তখনই একজন সত্যিটা বুঝতে পারে... আমি অবশ্যই মনে করি না, এটা কোনো খারাপ বা ভুল কাজ ছিল।”
‘স্বার্থপর’ হওয়া নিয়ে বাবার পক্ষ নিয়ে অক্ষয় বলেন, “আমি আত্মকেন্দ্রিক বা স্বার্থপর হওয়াতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। নিজে সুখী না হলে অন্যকে সুখী করা যায় না। যতদিন আপনি মিথ্যার ভান করে বাঁচবেন, ততই অন্য মানুষ এবং নিজের প্রতি আপনার বিরক্তি তৈরি হবে। আমার মনে হয়, প্রত্যেকের নিজের জন্য বাঁচা উচিত। নিজের জন্য বাঁচতে সাহস লাগে। খুব কম মানুষই এটা করতে পারে।"
বিনোদের আধ্যাত্মিক যাত্রা নিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীর ভাষ্য
আধ্যাত্মিকতার প্রতি বিনোদ খান্নার আগ্রহের বিষয়ে তার দ্বিতীয় স্ত্রী কবিতার ভাষ্য, অনেকের ধারণার চেয়েও অনেক আগে থেকেই এই আগ্রহের শুরু।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “তিনি বরাবরই আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি বোম্বের বিখ্যাত বইয়ের দোকান স্ট্র্যান্ড বুকস্টোর থেকে 'অটোবায়োগ্রাফি অব এ যোগী' বইটি নিয়েছিলেন এবং শেষ না করা পর্যন্ত বইটি রাখেননি। সারারাত জেগে বইটি পড়তেন।
“যখনই জে কৃষ্ণমূর্তি শহরে আসতেন, শুটিং থাকলে সেদিন ছুটি নিয়ে বক্তৃতা শুনতে যেতেন।”
কবিতা বলেন, "তার পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যু, যাদের মধ্যে মায়ের মতো খুব কাছের মানুষও ছিলেন, তেমন একটা ভয়াবহ সময়ে তিনি ওশোর বক্তৃতা শো শুরু করেছিলেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি আশ্রমে গিয়ে সন্ন্যাস নেন। এভাবেই সেই যাত্রা শুরু হয়েছিল।"
তবে আশ্রমে থাকার সময়ও বিনোদ অসমাপ্ত সিনেমাগুলোর কাজ চালিয়ে গেছেন বলে জানান কবিতা।
“বেশিরভাগ মানুষই জানে না, তিন বছর ধরে তিনি চুক্তিবদ্ধ সিনেমাগুলোর শুটিং করতে আসতেন। এরি মধ্যে ছিল 'হেরা ফেরি' এবং
'কুরবানি'র মতো সুপারহিট সিনেমা, যেগুলোতে তাকে সেরা রূপে দেখা গেছে।”
আশ্রমে থাকার সময় একেবারেই সাদামাটা জীবনযাপন করতেন বিনোদ খান্না।
স্ত্রী কবিতা বলেন, “যদি শুটিং বাইরে হত, তিনি সেখানেই থাকতেন, কিন্তু তার মূল ঠিকানা ছিল পুনে। আশ্রমে তার মাত্র চার ফুট বাই ছয় ফুট একটা ঘর ছিল। ওশোও সেই জায়গা নিয়ে মজা করতেন। ঘরটা এতটাই ছোট ছিল যে তাকে বিছানার উপর আড়াআড়িভাবে শুতে হতো।”
সিনেমা আর আধ্যাত্মিকতার মধ্যে ভারসাম্য রেখেই চলতেন বিনোদ।
"ক্যামেরার সামনে অভিনয় আর ক্যামেরার বাইরে ধ্যান করতেন। আশ্রমে তিনি ওশোর মালী ছিলেন। তারপর তিনি ওরেগনে চলে যান," বলেন কবিতা।
এক সময়ে আশ্রম ছেড়ে সিনেমায় ফেরেন বিনোদ খান্না। কেন আশ্রম ছেড়েলেন?
এর ব্যাখ্যায় কবিতার ভাষ্য, তিনি আধ্যাত্মিকভাবে পরিপূর্ণতা অনুভব করেছিলেন।
"আমার মনে হয়, যা খুঁজছিলেন তা পেয়েছিলেন। তার আর আশ্রমে থাকার প্রয়োজন হয়নি।”
বন্ধু কবির বেদি চোখে বিনোদ খান্না
বন্ধু বিনোদ খান্নার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং ওশোর প্রতি দুজনের শ্রদ্ধার কথা বলেছেন অভিনেতা কবির বেদি।
তিনি ফিল্মফেয়ারকে বলেন, “দর্শনিকতা নিয়ে বিনোদের বেশ ঝোঁক ছিল। ওশোর প্রতিও তার খুব আগ্রহ ছিল। একটা সময় সে ওশোর অন্যতম একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে ওঠে। নিঃসন্দেহে, ওশোর প্রতি আমারও অগাধ শ্রদ্ধা ছিল।”
বেদি আরও বলেন, "যখন আশ্রমে সে একঘেয়ে বা ক্লান্ত হয়ে পড়ত, তখন লস অ্যাঞ্জেলেসে আমার কাছে আসত, আমরা একসাথে দারুণ সময় কাটাতাম। আর সেখানে যা কিছু কানাঘুষা চলছিল, তার সবই আমি জানতাম।
“নেটফ্লিক্সে 'ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড কান্ট্রি' নামে একটি তথ্যচিত্র আছে, যেখানে ওশোর জীবনের সেই পর্বটি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এটি খুবই আকর্ষণীয়। কিন্তু ওশো কেমন ছিলেন এবং একজন শিক্ষক ও দার্শনিক হিসেবে তার গুরুত্ব কী ছিল, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা দেয় না। সেই অর্থে এটি তার প্রতি খুবই অন্যায় ছিল। তবে এটা নিশ্চিত যে, তার কিছু অনুসারীর কারণে সেই আশ্রমে অনেক খারাপ ঘটনা ঘটেছিল। আমি সবই জানতাম, কারণ বিনোদ আমাকে বলেছিল কী ঘটছিল। প্রকৃতপক্ষে, তিনি (ওশো) ছিলেন একজন মহান নির্মাতা, দার্শনিক, মানুষ।"
পাঁচ বছর বিরতির পর বিনোদ খান্না ১৯৮৭ সালে 'ইনসাফ' সিনেমা দিয়ে ফিরে আসনে বলিউডে। এরপর বেশ কয়েকটি ব্যবসা সফল ছবি উপহার দেন।
১৯৮৯ সালে 'সূরিয়া' এবং 'চাঁদনি' সিনেমায় পান ব্যাপক সাফল্য। ক্যারিয়ারে 'ওয়ান্টেড' (২০০৯), 'দাবাং' (২০১০), 'দাবাং ২' (২০১২), এবং 'দিলওয়ালে' (২০১৫) এর মতো ব্লকবাস্টার সিনেমায় বলিষ্ঠ বাবার চরিত্রে অভিনয় করেও ব্যাপক প্রশংসিত হন বিনোদ।
অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিতেও নাম লিখিয়েছিলেন বিনোদ খান্না। পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরে বিজেপির হয়ে নির্বাচন করে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।