Published : 14 Sep 2026, 12:22 PM
সদ্য শেষ হওয়া ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে আলোচনার জন্ম দেওয়া সিনেমাগুলোর একটি ‘নাজা’। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নির্বিচারে মানুষ হত্যা এবং সেই কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের দিক নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রটি পেয়েছে উৎসবের মর্যাদাপূর্ণ বিশেষ জুরি পুরস্কার।
'নাজা' পরিচালনা করেছেন ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর; দুজনেই ইসরায়েলি পরিচালক। ‘নাজা’ পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি এই চলচ্চিত্রটি উৎসবের তিরাশিতম আসরে গড়েছে নতুন রেকর্ডও।
ভেনিসে গত ১০ সেপ্টেম্বর 'নাজা'র প্রিমিয়ার হয়। এরপর দর্শকেরা প্রায় ২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে করতালি দেন। এই অভিবাদন ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাসে দীর্ঘতম স্ট্যান্ডিং ওভেশন। এই ঘটনাটি ‘নাজা’ সিনেমাটিকে উৎসবের অন্যতম আলোচিত চলচ্চিত্রে পরিণত করে। সেদিন দর্শকদের অনেকের হাতে ছিল ফিলিস্তিনি পতাকা।
এর আগে এই রেকর্ড ছিল গত বছর ভেনিসে প্রদর্শিত ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’ সিনেমাটির দখলে; ওই সিনেমার প্রদর্শনীর পর ২৩ মিনিট ধরে করতালি দেয় দর্শকরা। ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’ সিনেমার চিত্রনাট্যও গাজাকেন্দ্রিক।
দ্য গার্ডয়ান এবং ভ্যারাইটি জানিয়েছে, ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে পুরস্কার হাতে নিয়ে ইউভাল আব্রাহাম আপ্লুত হয়ে পড়েন। পাশাপাশি তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষোভও প্রকাশ করেন।
আব্রাহামের কথায়, বিশ্ববাসীকে বাস্তবতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক কিছুই করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, চিত্রনাট্যে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ তোলা হয়েছে সেটি তারা অস্বীকার করেছে।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইউভাল আব্রাহাম বলেন, এখানে দাঁড়িয়ে এই পুরস্কার নেওয়া সত্যিই সহজ নয়।
“কারণ ইসরায়েলের রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকরা যাদের অনেকে সিনেমাটি এখনো দেখেননি, কিন্তু না দেখেই এখন এর বিরুদ্ধে আক্রমণ করছেন। সিনেমার বক্তব্য অস্বীকার করছেন।”
ক্ষোভ ঝরিয়ে তিনি বলেন, “এই উৎসব শুরুর পর মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই গাজায় ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ছয় ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। বোমা হামলা করা হয় একটি স্কুলে, সেখানে তিন বছরের শিশুর প্রাণ যায়। বাবার সঙ্গে গাড়িতে থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছে সাত বছরের আরেক শিশু। আর আর দুই বোন মারা গেছে নিজেদের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায়।”
আব্রাহাম বলেন, গাজা হত্যাকাণ্ড কোনো দুর্ঘটনা নয়।
“এটি একটি পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার অংশ।ফিলিস্তিনিদের অমানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার মানসিকতা থেকে এই হত্যাকাণ্ড চলছে।”
চিত্রনাট্যের সত্যতা নিয়ে আব্রাহাম বলেন, তিনি পরিষ্কার করে বলতে চান, ইসরায়েলিরা যে গাজায় হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছেন সেই সত্যের প্রমাণ নথিবদ্ধ হয়েছে সিনেমায়।
আব্রাহাম বলেন, “ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা হত্যাকাণ্ডের কথা বিশ্বকে জানিয়েছেন। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় দুই শতাধিক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাদের মুখ চিরতরে বন্ধ করা হয়েছে।”
আব্রাহাম চান ইসরায়েলিরা ‘নাজা’ সিনেমাটি দেখুক। তার ভাষ্য, কোনো অপরাধ অস্বীকার করার অর্থ সেই অপরাধকে টিকে থাকার সুযোগ করে দেওয়া।
ইতালির দর্শকদের ‘নাজা’ দেখতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ইতালি ও জার্মানির সরকার ইসরায়েলের ওপর এমন চাপ তৈরির পথে বাধা দিচ্ছে, যা এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকদেরও সিনেমাটি দেখার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, “গাজায় চলমান হত্যাকাণ্ডের বড় একটি অংশের অর্থায়ন করছে যুক্তরাষ্ট্র। ”
‘নাজা’ সিনেমায় যা আছে
‘নাজা’ নামটি ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো বিমান হামলায় সম্ভাব্য বেসামরিক প্রাণহানির সংখ্যা বোঝানো হয়।
৮০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই সিনেমাটি তৈরিতে সময় নেওয়া হয়েছে তিন বছর। এই সিনেমায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগের ২৪ জন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তবে নিরাপত্তার কারণে নাম পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তেল আবিবের বিভিন্ন ভবনের ছাদে রাতের অন্ধকারে তাদের সাক্ষাৎকার ধারণ করা হয়। পরে তাদের মুখ ও কণ্ঠ ডিজিটালি পরিবর্তন করা হয়েছে।
‘নাজা’ সিনেমায় ‘ল্যাভেন্ডার’ নামের একটি এআইনির্ভর ব্যবস্থার কথা উঠে এসেছে।
এই এমন একটি ব্যবস্থা যা টেলিযোগাযোগ ও নজরদারি থেকে তথ্য সংগৃহ করে। তারপর সেই তথ্যের সাহায্যে সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারে বলে ওই কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। এক কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়াকে ‘ভিডিও গেইম’ এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে বিপুলসংখ্যক লক্ষ্যকে দ্রুত শনাক্ত করে সেখানে হামলা চালানো সম্ভব হয়েছে তা তুলে ধরেছেন নির্মাতারা।
সিনেমাটি প্রযোজনা করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। প্রযোজক জেমস উইলসন এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেব কাজ করেছেন।
এরপর ‘নাজা’ দেখানো হবে স্পেনের সান সেবাস্তিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবে; তারপর ‘নাজা’ যাবে নিউ ইয়র্ক চলচ্চিত্র উৎসবে।