Published : 30 Jul 2026, 10:18 PM
দেশের ইতিহাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিবি) সর্বনিম্ন বাস্তবায়ন হয়েছে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে।
৩০ জুন শেষ হওয়া এই আর্থিক বছরে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি ৮০ লাখ টাকা খরচ করেছে, যা সংশোধিত এডিপির ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ।
দেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো অর্থবছরে এডিপির এত কম অর্থ খরচ হয়নি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বৃহস্পতিবার এডিপি বাস্তবায়নের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা (সংশোধিত)।
এর আগে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে বাস্তবায়নের হার প্রত্যাশিত না হওয়ায় গত ১২ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এডিপির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে খরচ হয় ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা; বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ১ হাজার ৬ কোটি কোটি টাকা। খরচ হয়েছিল ৯৯৯ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ছিল ৯৯ শতাংশ।
এর পর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ৮০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন হয়েছে। দুয়েক অর্থবছরে ১০০ শতাংশের বেশিও খরচ হয়েছে। অনেক বছরে ৯০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং প্রশাসনে রদবদলের ধাক্কায় এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময়ও প্রশাসনে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। ফল সে সময় অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ও ঠিকাদার কাজ ছেড়ে চলে যায়।
এসবের প্রভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন আইএমইডির কর্মকর্তারা।
আইএমইডির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে খরচ হয়েছিল ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
এদিকে ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এডিপি পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ মুহাম্মদ আব্দুর রহিম সাকি।
বৃহস্পতিবার আগাঁরগাওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) এক সেমিনারে সাকি বলেন, “আগামী ১৭ অগাস্ট সরকারের ১৮০ দিন পূর্তির আগেই এডিপির এই পুনর্বিন্যাসের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। সংশোধিত এডিপিতে শুধু নতুন প্রকল্প নয়, চলমান প্রকল্পগুলোকেও নতুন কৌশলপত্রের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
“বর্তমান এডিপি প্রস্তুতের সময় সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও প্রণয়নাধীন পাঁচ বছরব্যাপী উন্নয়ন ও সংস্কার কৌশলপত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য করার মতো পর্যাপ্ত সময় ছিল না। সেই কারণে বাজেট ঘোষণার পরও প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, “১৭ অগাস্টের আগেই আমরা এ কাজ শেষ করতে চাই। তখন এক ধরনের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা দাঁড়াবে, যা সরকারের ইশতেহার ও কৌশলপত্রের সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন রেট শিডিউলের পরিবর্তে একটি অভিন্ন ও বিশেষায়িত রেট শিডিউল তৈরির কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) একটি সফটওয়্যার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারিত রেট শিডিউলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে।
“প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় ম্যানুয়ালি যাচাই করা বাস্তবে খুবই কঠিন। তাই প্রযুক্তির সহায়তায় এই প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে চাই।”
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপিতে ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখে বাজেট পাস করেছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার সেই এডিপি কমিয়ে ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৪ কোটি টাকায় নামিয়ে আনে। এর মধ্যে খরচ হয় ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। যা মোট বরাদ্দের ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্বে আসা অন্তর্বর্তী সরকার অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেয়।
এতে আগের সরকারের নেওয়া অনেক প্রকল্পে অর্থছাড় কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে চলমান অনেক প্রকল্পের কাজও স্থগিত হয়ে যায়। সব মিলিয়ে এডিপির বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় কমে যায়।
এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল যথাক্রমে ৯২ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।
৩ বছর ধরে কম খরচ হচ্ছে
আইএমইডির তথ্যে দেখা যায়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ১৩ হাজার ১১৮ কোটি টাকা কম খরচ হয়েছে। এমন ঘটনা খুব একটা ঘটে না। তবে গত তিন বছর ধরেই আগেরবারের চেয়ে কম টাকা খরচ হচ্ছে এডিপিতে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপির ২ লাখ ৫ হাজার ১১৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরে (২০২৫-২৬) এডিপিতে খরচ আরও ১৩ হাজার কোটি টাকা কমে যায়।
১৫ মন্ত্রণালয়ের গড় বাস্তবায়নের হার ৭৮.৬৫%
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গড় বাস্তবায়নের হার ৭৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
এর মধ্যে শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৯৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ ব্যয় করেছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৮৮ দশমিক ৬০ শতাংশ খরচ করেছে বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
এছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় ৮৭ দশমিক ২৩ শতাংশ, বিদ্যুৎ বিভাগ বাস্তবায়ন করেছে ৮৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ, স্থানীয় সরকার বিভাগ ৮২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ অর্থ খরচ করেছে। ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশ খরচ করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ।
সেতু বিভাগ খরচ করেছে ৭৩ দশমিক ৮১ শতাংশ; গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ৭৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ অর্থ।
সবচেয় কম খরচ করেছে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ; ৫০ দশমিক ৩৩ শতাংশ।