“আজকে যে সংকট, তা আমাদের নিজেদের সৃষ্টি নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা কিন্তু বসে নেই, কাজ করে যাচ্ছি,” বলেন তিনি।
Published : 07 Feb 2024, 08:01 PM
বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা চাপে পড়লেও, মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তির কারণ হলেও বাংলাদেশের মানুষ ‘অতটা খারাপ নেই’ বলেই মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বলেছেন, “আজকে যে সংকট, তা আমাদের নিজেদের সৃষ্টি নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা কিন্তু বসে নেই, কাজ করে যাচ্ছি।”
বুধবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের অর্থনীতি, সরকারের উদ্যোগ, নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন সংসদ নেতা। বিকালে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মুজিবুল হক চুন্নু এক সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, “আমি দেখতে পাচ্ছি- ইমেডিয়েট কিছু সমস্যা রয়েছে। ডলার সংকট নিয়ন্ত্রণ করেছেন, রপ্তানি কমে আসছে, রেমিটেন্স কমে আসছে, গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন না হওয়ায় অনেক পোশাক শিল্পের উৎপাদন কমে আসছে, মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯.৫%-এ, অনেকগুলো ব্যাংক চলছে না, একীভূত করার পরামর্শ- এ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ সরকার কীভাবে মোকাবেলা করবেন দেশবাসী জানতে চায়।”
জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “কী কী করণীয় তা প্রশ্নোত্তরে বলা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতিহারেও সবকটি কথা বলা রয়েছে। ব্যাংক খাত, আর্থিক খাতে দক্ষতা, দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার কথা বলা রয়েছে।
“আজকে যে সংকট, আমাদের নিজেদের সৃষ্টি নয়। এক দিকে করোনা অতিমারী ২০২০ সাল থেকে শুরু হল, যোগাযোগ, রপ্তানি বন্ধ ছিল এবং সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়, মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে। তার আগ পর্যন্ত আমাদের মূল্যস্ফীতি যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে ছিল, পাঁচ ভাগের নিচে ছিল, প্রবৃদ্ধি ৬ ভাগের উপরে ছিল।”
তিনি বলেন, “অতিমারী, তার উপর ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধ; স্যাংশন কাউন্টার স্যাংশন- যার ফলে প্রতিটি পণ্য, যা আমাদের আমদানি করতে হয়, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। যার সাথে সরবরাহ জাহাজ ভাড়া থেকে শুরু করে সাপ্লাই চেইন সবগুলোর বৃদ্ধি পায়। এই যে অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়া, এটাকে ধারণ করা খুব কঠিন ছিল।”
সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, “বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি মাত্র দেশ, যেগুলো কোনো উন্নত দেশ করতে পারেনি, আমরা করেছিলাম। তিন-চারটা ভ্যাকসিন বিনা পয়সায় দেশের মানুষকে দিয়েছি আমরা। যার ফলে অতিমারী যেভাবে হোক আমরা মানুষকে রক্ষা করতে পেরেছি। টেস্টিংও বিনামূল্যে করা হয়েছে।
“যখন কেবল এ অভিঘাত থেকে উত্তরণ ঘটাচ্ছি, তখনই ইউক্রেইন রাশিয়ার যুদ্ধে স্যাংশন কাউন্টার স্যাংশনে পড়ে গেলাম- যার ফলাফলে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। যার ফলে আমাদের খরচের ব্যাপারে মিতব্যয়ী হতে হয়েছে, কিছু সংকুচিত করতে হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমরা কিন্তু অতটা খারাপ নেই।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডলারের যে সংকট ছিল, তা এখন ‘নেই’। আমদানি-রপ্তানির ব্যাপারে ‘মনিটরিং’ বাড়ানো হয়েছে। রপ্তানি আয় ‘খুব একটা কমেনি’।
“যেসব দেশে রপ্তানি করি, খুব ধনী দেশ, তাদের ক্রয় ক্ষমতা কমেছে। বাজার সংকুচিত হয়েছে তাদের। সেখানে অর্ডার একটু কমে গেছে। অর্থনৈতিকভাবে তারা চাপে আছে এবং তাদের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজেই তারই ফলে হয়ত কিছুটা কমেছে। আমরা বিকল্প ব্যবস্থা নিচ্ছি, বাজার খুঁজে বেড়ানো, রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য বহুমুখীকরণে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছি।”
গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের গ্যাস কিছু আছে। ইতোমধ্যে কূপ খননের মাধ্যমে নতুন গ্যাস ফিল্ডও পেয়েছি। উত্তোলন করতে কিছুটা সময়ও লাগবে। তাছাড়া ভোলার গ্যাস সিএনজি করে রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় ইন্ডাস্ট্রিতে আনার ব্যবস্থা করে নিয়েছি। ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এটা ভালোভাবে চালু হলে গ্যাস সংকটটা আর থাকবে না।
“পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। একটা বিষয় হচ্ছে, কৃষক যখন পণ্যটা উৎপাদন করে যথাযথ মূল্যটা না পায়, তাতে কৃষকের ক্ষতি হয়। আর মূল্য বৃদ্ধি পেলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের কষ্ট হয়। আমরা মানুষকে এ মূল্যস্ফীতি থেকে মুক্তি দিতে কোটি পরিবারকে টিসিবির পারিবারিক কার্ড দিচ্ছি। নিম্নবিত্তদের বিনা পয়সায় খাদ্য সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্নভাবে সহায়তা সহযোগিতা করে যাচ্ছি।”
সংসদ নেতা বলেন, “বিভিন্ন ব্যাংক, আসলে যেগুলো হয়ত ভালোভাবে চালাতে পারছে না। ইতোমধ্যে একটি ব্যাংক একীভূত করে দিয়েছি। পদ্মা ব্যাংক করা হয়েছে। ঠিক এভাবে আমরা নানা পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমরা কিন্তু বসে নেই, কাজ করে যাচ্ছি।”
নির্বাচন
প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতে সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য চয়ন ইসলামের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করার সুযোগ পেয়েছি। এবারের নির্বাচনে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল, অনেক চক্রান্ত ছিল, ষড়যন্ত্র ছিল।
“আমি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সব ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে দেশের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়েছে। তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে এবং নির্বাচনে আমাদেরকে জয়ী করে দেশ সেবার সুযোগ দিয়েছে।”
একটা ‘সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ’ নির্বাচন করতে পারায় নির্বাচন কমিশন এবং দেশের সর্বস্তরের জনগণকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রেখে আমরা যে উন্নয়ন করেছি, সে উন্নয়নকে টেকসই করার সুযোগ এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ আমাদের দিয়েছে। সেটাই আমরা করতে চাই।”
‘তিন ফসলি জমি নষ্ট করে শিল্প প্রতিষ্ঠান নয়’
গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য উম্মে কুলসুম স্মৃতির সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষিজমি রক্ষার স্বার্থে অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হয়েছে। এরপরেও কিছু মানুষ এর ব্যত্যয় ঘটায়।
“আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে-তিন ফসলি জমি কেউ নষ্ট করতে পারবে না। কেউ নষ্ট করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেব। মাথায় রাখতে হবে, ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য যোগান দিতে হয়।”
কৃষি জমি নষ্ট না করে আবাসন, শিল্প গড়ে তোলার বিষয়ে সরকার সচেতন রয়েছে বলে জানান শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, “কেউ শিল্প করতে চাইলে যেন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জায়গা নিয়ে নেয়। যত্রতত্র যেন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠে; আর যদি এ ধরনের শিল্প গড়ে ওঠে, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ কোনো সেবা পাবে না তারা। আমরা চাই- খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষি জমি সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি শিল্প করতে হলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি নিয়ে সেখানে শিল্প গড়ে তুলবে।”
‘বিএনপি-জামায়াতের নাশকতায় ব্যবস্থা’
সরকার দলীয় সংসদ সদস্য শাহাজান খানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিএনপি ও তার দোসররা নির্বাচন প্রতিহতের নামে অযৌক্তিক ও জনসম্পৃক্ততাহীন আন্দোলনের মাধ্যমে অগুন-সন্ত্রাস, নিরীহ মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হত্যা এবং জনগণের সম্পদ বিনষ্ট করার অশুভ খেলায় মেতে উঠেছে।
“এই অশুভ শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানকেই অস্বীকার করছে না, আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষার যে জনবান্ধব ধারার সৃষ্টি হয়েছে, তা বানচাল করে অতীতের ধারাবাহিকতায় একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চাইছে। বাংলাদেশকে তারা আবারো উগ্র জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস-লুটপাটের সেই দুঃসহ দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিতে চায়।”
২০১২ থেকে ২০১৫ এবং ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ৭ জানুয়ারি ভোটের দিন পর্যন্ত আন্দোলনে ১৮৮ জন নিহত ও চার হাজার ৯৭৩ জন আহত হয় বলেও জানান তিনি।
এসব নাশকতার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে এ সময়ে আট হাজার ১০৫টি মামলা করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এর মধ্যে এক হাজার ৯৬৭টি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এতে এক হাজার ২৪১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
“২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর হতে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়েরকৃত মামলাগুলোর বিষয়ে তদন্ত কাজ চলমান রয়েছে।”
লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের মো. আবদুল্লাহর প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে হরতাল-অবরোধে সারাদেশে ৬০০ টির বেশি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়।
এই সময়ে ১৮৪টি বাস, ৪৮টি ট্রাক, ২৮টি কাভার্ড ভ্যান, ৩টি অটোরিকশা, ৪টি প্রাইভেট কার, ১১টি পিকআপ, ৫টি ট্রেন, ১৫টি মোটর সাইকেল, ৩টি লেগুনা, ১টি ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়, একটি অটোরিক্সা, ১টি উচ্চ বিদ্যালয়, ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি বসতঘর, ১টি বৌদ্ধমন্দির, ১টি নৌকাসহ ৩২৮টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, “তাদের হরতাল-অবরোধে চালক, হেলপার, পুলিশ, বিজিবি, শ্রমিক, মুক্তিযোদ্ধাসহ বহু লোক নিহত, আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছে। এসব ঘটনায় ১৩ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ট্রেনের নাশকতায় নিহত ৯ জন।“