Published : 06 Sep 2026, 10:28 PM
পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ১৯৯৭ সালে যে তীব্র অর্থনৈতিক বিপর্যয় আঘাত হেনেছিল; তা নাড়িয়ে দিয়েছিল এ অঞ্চলের অর্থনীতির ভিত। বিভিন্ন দেশের মুদ্রার ধস, মূলধন পাচার এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ব্যর্থতার মত বাজার উত্তেজনার মধ্য দিয়ে এ সংকট এশীয় অঞ্চলের অর্থনীতিকে ফেলেছিল চরম বিপদে।
লন্ডনভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বহুজাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক নিউম্যানের মতে, এশিয়ার বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৯৭ সালের সংকটের ঠিক আগের সময়টির কিছু বিস্ময়কর সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এটি এশীয় অঞ্চলের অর্থনীতি নিয়ে আশঙ্কা তৈরি করছে।
সিএনবিসির খবর অনুযায়ী, অর্থনীতিবিদ নিউম্যানের মতে ১৯৯৭ সালে এশিয়ায় সংকটের আগের সময়টির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির যে প্রধান সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে তা হল, মার্কিন ট্রেজারি ইয়েল্ডে (যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ইস্যু করা বিভিন্ন মেয়াদি ঋণপত্র বা বন্ডের বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য সুদের হার) সুদের হার বৃদ্ধি। যেমন দশ বছর মেয়াদী মার্কিন বেঞ্চমার্ক বন্ডের (যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ইস্যু করা ট্রেজারি নিরাপত্তা বন্ড, যা বিশ্বব্যাপী আর্থিক বাজারের সুদের হার, বিনিয়োগের ঝুঁকি এবং রিটার্ন মূল্যায়নের মানদণ্ড) সুদ ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে প্রায় ৮ শতাংশে পৌঁছেছিল।
এমনকি ১৯৯৭ সালের এপ্রিলেও ইয়েল্ড ছিল প্রায় ৭ শতাংশ, যা চার বছর আগের তুলনায় প্রায় ২০০ বেসিস পয়েন্ট বেশি ছিল।
সে ঘটনার সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, দশ বছর মেয়াদী মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড ২০২০ সালের অগাস্টে মাত্র ০.৫ শতাংশের সর্বনিম্ন স্তর থেকে বেড়ে সম্প্রতি ৪.৭৯ শতাংশে পৌঁছে গেছে।
নিউম্যান বলেন, “ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ডের এই উত্থানটি হতে ছয় বছর সময় লেগেছে মানছি। কিন্তু কেবল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে থাকা ৩.৯ শতাংশ থেকে ইয়েল্ড প্রায় ৮০ বেসিস পয়েন্ট লাফিয়ে বেড়ে গেছে।”
সিএনবিসি বলছে, গত মাসে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, তারা বাইব্যাক বা বন্ড ফেরত কেনার জন্য বাজারের ১০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদী অংশকে লক্ষ্যবস্তু করবে। সরকার তাদের বাইব্যাক কার্যক্রমের সর্বোচ্চ পরিধি ২০০ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে কমপক্ষে ৪০০ কোটি ডলার অর্থাৎ দ্বিগুণ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
ফ্রেডেরিক নিউম্যানের মতে ১৯৯৭ এর আর্থিক মন্দার সঙ্গে এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি সাদৃশ্য হল, জাপানি ইয়েনের সাম্প্রতিক দরপতন।
তার মতে, ১৯৯৫ সালের এপ্রিলে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার ছিল সর্বনিম্ন ৮০। ১৯৯৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে তা লাফিয়ে বেড়ে ১৩০-এ দাঁড়ায়; যা ডলারের বিপরীতে ইয়েনের প্রায় ৫৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন।
একইভাবে ইয়েনের বিনিময় হার ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ১০৩ থেকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সর্বোচ্চ ১৬৩ তে পৌঁছে ৫৭ শতাংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ওয়াশিংটন ও টোকিওর যৌথ হস্তক্ষেপে ইয়েন আবার শক্তিশালী হয়ে ১৬০-এর কাছাকাছি পৌঁছায়। তবে ইয়েনের সাম্প্রতিক দরপতনের কারণে বাজার বিশেষজ্ঞরা আবার এ ক্ষেত্রে নতুন কোনো সরকারি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা আছ কিনা তা খতিয়ে দেখছে।
নিউম্যানের মতে, ১৯৯৭ সালের সংকটের শুরুর দিকে ইন্টারনেটের আত্মপ্রকাশের কারণে বাজারগুলো প্রযুক্তি খাত নিয়ে অতি আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। একইভাবে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের জোয়ারও ঠিক একই ধরনের আশাবাদের জন্ম দিচ্ছে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ১৯৯০-এর দশকে এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের অর্থনীতি ছিল, তারা বিদেশে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করত, তার চেয়ে বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ গ্রহণ করত। এ ক্ষেত্রে তাদের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় নিজস্ব ব্যয় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে ডলারের খরচ বৃদ্ধি এবং নড়বড়ে ইয়েন বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করে তুলেছিল। তবে এখন এশীয় অর্থনীতিগুলো বিনিয়োগকারী দেশে পরিণত হয়েছে। তাই ডলারের উচ্চ মূল্য বা ইয়েনের দুর্বল হওয়া এ অঞ্চলের জন্য অতটা বড় চাপের কারণ নাও হতে পারে।