অর্থনীতির কঠিন সময়ে ব্যাংকমুখী টাকার প্রবাহেও টান
টানা দুই মাস আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ শতাংশের কিছু বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই একজন অতিরিক্ত পরিচালক বলেছেন, এটি কাঙিক্ষত হারের অর্ধেকের মত।
স্বয়ং পরিকল্পনা উপদেষ্টা অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা প্রকাশের পর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪১ মাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে নামার পর এবার আমানতের ক্ষেত্রেও একই চিত্র পাওয়া গেছে।
‘উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে আসার মধ্যে’ অক্টোবরে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ।
সরকার পতনের মাস অগাস্টে চরম নৈরাজ্যের মধ্যেও ব্যাংকে আমানতে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তথ্য দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক এই তথ্য প্রকাশ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই একজন অতিরিক্ত পরিচালক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্যাংকখাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ‘হওয়া উচিত’ ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। সেই হিসাবে এটি কাঙিক্ষত হারের অর্ধেকের মত।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার আগে অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর গত জুলাইয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “অর্থনীতির যে আকার, তাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ হওয়া উচিত ছিল।”
চলতি বছর অক্টোবরে ব্যাংকখাতে আমানত দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। আর সেপ্টেম্বরে ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ১৪ হাজার ২০৮ কোটি টাকা ব্যাংকে এসেছে।
ব্যাংকাররা আমানতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১০ শতাংশের ওপর থাকলেই তাকে ‘ভালো’ হিসাবে ধরে থাকেন। সবশেষ ১০ শতাংশের কম প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে; ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। তবে এর দুই মাস পরে ডিসেম্বরেই এই হার বেড়ে হয় ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ, যা ছিল ২৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে করোনাভাইরাস মহামারির বৈশ্বিক লকডাউনের সময় সুদহার কমে গেলেও আমানতের প্রবৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।
সরকার পতনের পর নানা খাতে বিশৃঙ্খলা, নতুন বিনিয়োগে ব্যবসায়ীদের অনীহার মধ্যে গত ৬ ডিসেম্বর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ টানা চার মাস কমার তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অক্টোবরে এই ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা গত ৪১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
করোনাভাইরাস মহামারীতে লকডাউন পরিস্থিতিতে ২০২১ সালের মে মাসে ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর কখনও তা ৯ শতাংশের নিচে নামেনি।
ব্যাংক খাতে ঋণপ্রবাহ ও আমানতের প্রবৃদ্ধিতে টানের এই তথ্যটি প্রকাশ পেল এমন সময়ে যখন অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
গত ২৫ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠক শেষে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে, বিশৃঙ্খলার কারণে বেসরকারি খাতে উৎপাদন যা আছে সেখানে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। গার্মেন্ট খাতে স্থবিরতা আছে।
“বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নাইই। তার ওপর সুদের হার অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে করে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হচ্ছেন না নতুন বিনিয়োগের ব্যাপারে। সেক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না, অন্য দিকে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ও যদি না বাড়ে তাহলে তো অর্থনীতির মন্দা অবস্থা তৈরি হবে।”
‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়েছে’ সঞ্চয়ের সক্ষমতা
সিটিজেনস ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ মাসুম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাংকে আমানত কমছে।
“সংসারের খরচ আগের চেয়ে বাড়ছে। সেই অনুযায়ী আয় নেই। তাই মাস শেষে হাতে টাকা না থাকার কারণে ব্যাংকে আমানত কমছে।“
ব্যাংকখাত নিয়ে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে বলেও মনে করেন এই ব্যাংকার। তার মতে এটিও ব্যাংকমুখী টাকার প্রবাহ কমার একটি কারণ।
“এছাড়া ব্যাংকখাত নিয়ে কয়েক মাস ধরেই এক রকমের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ‘ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে’ এমন গুজবে টাকা তুলে নিয়েছে অনেকে। নতুন করে যারা টাকা রাখতে চেয়েছিল বা পরিকল্পনা ছিল তারাও রাখছে না।“
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বারবার সুদের হার বাড়ানো হলেও সুফল মিলছে না নিত্যপণ্যের বাজারে; চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি নভেম্বরে আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশে। আগের মাসে এই হার ছিল ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
তার মানে ২০২৩ সালের নভেম্বরে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা এ বছরের নভেম্বরে কিনতে ব্যয় করতে হয়েছে ১১১ টাকা ৩৮ পয়সা।
পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির এ হার চলতি অর্থবছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছেন, ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ বাড়ছে। এটিও আমানতে প্রবৃদ্ধি কমার একটি কারণ।
বর্তমানে ট্রেজারি বিল-বন্ডে সুদের হার ১২ শতাংশের ওপর। আর ব্যাংকে আমানত রাখলে ৮ থেকে ১১ শতাংশের ওপর সুদ পাওয়া যায়। আবার ব্যাংকে আমানতের সুদের ওপর আয়কর শনাক্ত নম্বর বা টিআইএন থাকা বা না থাকার ওপর ভিত্তি করে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কর কেটে রাখে সরকার। কিন্তু ট্রেজারি বিল-বন্ডে মুনাফার ওপর কর হার ৫ শতাংশ।
