Published : 09 Sep 2026, 08:36 PM
আকস্মিক বা সাময়িক গ্যাস সংকটে শিল্পখাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সেজন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, নতুন গ্যাসের অনুসন্ধান এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (টুডি) এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সমুদ্র অঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করার তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নভেম্বরে সেসব দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা রয়েছে।
স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ প্রণয়নের কাজও চলছে বলে জানান তিনি।
দেশীয় মজুদ ফুরিয়ে আসায় বেশ কিছুদিন ধরেই গ্যাস সংকটে ভুগছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট দেশীয় উৎস এবং প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট আমদানি করা এলএনজি থেকে আসছে।
বর্তমান সরবরাহের সঙ্গে চাহিদার ব্যবধান ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ক্রমশ কমছে। গত এপ্রিলে সংসদে দেওয়া তথ্যে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ছিল ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
এর মধ্যে ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন হয়ে গেছে এবং ২০২৬ সালের শুরুতে অবশিষ্ট ছিল ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে বর্তমান হারে উৎপাদন অব্যাহত থাকলে এই মজুদ দিয়ে ১২ বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে তখন তিনি জানিয়েছিলেন।
এ পরিস্থিতিতে সরকার একদিকে বিদ্যমান কূপগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নতুন কূপ খনন ও অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী এর আগে সংসদে জানিয়েছিলেন, ১৫০ কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে ৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
এলএনজি সংকট
দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু চলতি বছর পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত সেই সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহের অন্যতম বড় উৎস কাতার। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহনে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় কাতারএনার্জি রপ্তানি বন্ধ রেখেছে।
ফলে ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে সরকারকে। অন্য দেশের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার চুক্তির মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও পেট্রোবাংলা জানিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারের সংকটের পাশাপাশি দেশে এলএনজি সরবরাহের অবকাঠামোতেও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি, এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ ২১ জুলাই কারিগরি সমস্যায় বন্ধ হয়ে যায়। তাতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে।
আগস্টে ওই টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হলেও পরে এলএনজি মজুদ শেষ হয়ে আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
দুই টার্মিনাল মিলে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যায়, যেখানে জাতীয় চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
অগাস্টে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি কার্গো মহেশখালীর সামিট টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় সেখান থেকেও সরবরাহ বন্ধ হয়েছিল। ওই সময় দুই টার্মিনাল মিলে এলএনজি সরবরাহ প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে যায়।
ঘাটতি সামাল দিতে এলএনজি সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়ানোরও উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা। ৮ সেপ্টেম্বর নতুন স্পট এলএনজি সরবরাহকারীদের তালিকাভুক্তির শর্ত শিথিল করার খবর আসে। পেট্রোবাংলার হিসাবে, অগাস্টে গড়ে গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক ২ হাজার ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ সংকট সামাল দিতে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনার কথা সংসদে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এলএনজি সরবরাহের আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলে উপযুক্ত স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
বর্তমানে মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে দিনে কমবেশি ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান।
ভোলার গ্যাসের কী হবে
সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় ভোলার গ্যাসও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে আনতে গেলে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে। তাই ভোলায় গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি একটি সার কারখানা এবং ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
গ্যাস পাওয়া সাপেক্ষে অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) ও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
সরকারের এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হল স্বল্পমেয়াদে সরবরাহের ঘাটতি সামাল দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও অনুসন্ধান বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো।