রায়ের পর জানা গেল, আসামি মারা গেছে ৯ মাস আগে

আদালতের কাছে আসামি আবুল বশর চৌধুরীর মৃত্যুর তথ্য ছিল না। এমনকি তার আইনজীবীও তা জানতেন না।

চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 20 Sept 2022, 05:00 PM
Updated : 20 Sept 2022, 05:00 PM

অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক এক কর্মচারীর সাজা ঘোষণার পর জানা গেছে তিনি নয় মাস আগেই মারা গেছেন।

সম্পদের তথ্য গোপন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে বন্দরের সাবেক নিরাপত্তা পরিদর্শক আবুল বশর চৌধুরীকে দুটি ধারায় মোট সাড়ে ৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদকের মামলায় রোববার চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ মুনসী আবদুল মজিদ এ রায় দেন।

আদালতের কাছে আবুল বশরের মৃত্যুর তথ্য ছিল না। এমনকি তার আইনজীবীও তা জানতেন না। মঙ্গলবার পর্যন্ত আদালতে তার মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আবেদনও করা হয়নি।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার গোবিন্দর খিল গ্রামের মৃত আব্দুর রশিদ চৌধুরীর ছেলে আবুল বশর চৌধুরী।

আবুল বশরের ছেলে শাওন চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার বাবা ২৩ ডিসেম্বর মারা গেছেন। সেদিনই হাদু চৌধুরী জামে মসজিদে বাবার জানাজা ও দাফন হয়েছে।

“আমরা আইনি বিষয়গুলো কি করতে হবে তা জানতাম না। তাই আদালতে জানাতে পারিনি। আজ রায়ের বিষয়টা জানতে পেরে বিকালে আদালতে গিয়েছি। আদালতের কর্মচারীদের সাথে আলাপ করেছি।

“তারা পরবর্তী প্রক্রিয়া কি করতে হবে বলেছেন। আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে জানাব বাবা মারা গেছেন।”

জানতে চাইলে দুদকের সরকারি কৌঁসুলি কাজী সানোয়ার আহমেদ লাভলু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কোনো মামলার আসামি মারা গেলে সেটা আদালতকে জানাতে হয়। অবহিত করলে সেক্ষেত্রে মামলা আর চলে না।

“কিন্তু আদালতের খাতায় তিনি পলাতক আসামি। স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তার সাজার রায় হয়েছে।”

দুদকের এই আইনজীবী বলেন, “ওনার পরিবার বা আইনজীবী কেউ আমাদের জানাননি যে, তিনি মারা গেছেন। তিনি নিয়মিত মামলায় হাজিরা দিতেন। কিন্তু শেষ কয়েকটি নির্ধারিত দিনে তিনি আর আসেননি।”

মামলার নথিতে দেখা যায়, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর মামলার নির্ধারিত শুনানির দিনে হাজির ছিলেন আবুল বশর চৌধুরী।

এরপর চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি তিনি হাজির না হলে তার পক্ষে সময়ের আবেদন করা হয়। ১৪ মার্চও ধার্য দিনে আবুল বশর চৌধুরী হাজির না হওয়ায় ১৮ মে তার জামিন বাতিল করে আদালত।

বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. মুসা জানান, পলাতক আবুল বশর চৌধুরীকে গ্রেপ্তারে পটিয়া থানায় পরোয়ানা পাঠানো হয়েছিল। তবে সেটি তামিল হয়নি।

এই মামলায় ৪ অগাস্ট সর্বশেষ সাক্ষ্য-জেরা হয়। ১৪ অগাস্ট যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হয় আদালতে। এরপর মামলাটি রায়ের জন্য প্রস্তুত হয়।

আাসামি আবুল বশরের আইনজীবী রতন কুমার চক্রবর্তী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। খুবই অসুস্থ ছিলেন। নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতে হত।

“শেষ যেদিন তিনি আদালতে আসেন সেদিন তিনি বসতেও পারছিলেন না। তখন আমি আদালতের কাছে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আবেদন করি।”

“আদালতও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তারিখ নির্ধারণ করেন। কিন্তু এরপর তিনি আর আসেননি।”

তিনি বলেন, “নির্ধারিত শুনানির দিনে না আসায় আমরা সময়ের আবেদনও করি। পরিবারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তাদের মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া গেছে। পরে তার জামিন বাতিল হয়ে যায়।

“তিনি যে মারা গেছেন সেটা পরিবার বা আত্মীয়-স্বজন কেউ আমাদের না জানানোয় আদালতকে তা অবহিত করতে পারিনি।”

পটিয়ার হাদু চৌধুরী জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির প্রচার সম্পাদক আজিজুল হক মুনসী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই মসজিদের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।

“ওনার পরিবারের সদস্যরা শহরে থাকেন। শুনেছি রবিবার ওনার নামে একটি মামলায় রায় হয়েছে।”

পটিয়া পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শেখ সাইফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আবুল বশর চৌধুরী পৌর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি গত বছর ডিসেম্বরে মারা গেছেন।”

আবুল বশরের জানাজায় অংশ নেওয়া হাদু চৌধুরী জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মাওলানা জামাল ‍উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বন্দরে কাজ করতেন আবুল বশর চৌধুরী। তার বাড়ি গোবিন্দরখিল।

“তিনি মারা গেছেন। এখানেই দাফন হয়েছে। জানাজা ও দাফনে আমি ছিলাম।”

পটিয়া থানার ওসি রেজাউল করিম মজুমদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনার নামে পরোয়ানা বা মৃত্যুর বিষয়টি আমরা জানি না। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে মৃত্যুর বিষয়ে প্রতিবেদন আদালতে পাঠাব।”

মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ সম্পদের বিবরণ জমা দেন আবুল বশর চৌধুরী।

ওই বিবরণীতে তিনি ২৭ লাখ ১৭ হাজার ৪২১ টাকার স্থাবর ও ২১ লাখ ৪৭ হাজার ১৪১ টাকার অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব দেন।

দুদক পরে সম্পদ বিবরণী যাচাই করে আবুল বশর চৌধুরীর মোট ৫১ লাখ ১০ হাজার ১২৬ টাকার জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পদের সন্ধান পায়।

পরে সেসময়ের দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক এইচ এম আকতারুজ্জামান বাদী হয়ে দুদক আইন ২০০৪ অনুসারে সম্পদের তথ্য গোপন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেন।

ওই মামলায় ২০১৬ সালের ৩০ অগাস্ট অভিযোগপত্র দেয় দুদক। অভিযোগ গঠন হয় ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল। মামলার মোট ১৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন।

রোববার দেওয়া রায়ে সম্পদের তথ্য গোপন করায় দুদক আইন ২০০৪ এর ২৬ (২) ধারায় ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরো ১ মাসের সাজা দেওয়া হয়।

পাশাপাশি দুদক আইন ২০০৪ এর ২৭(১) ধারায় অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ৭ বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেয় আদালত।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক