Published : 11 Oct 2025, 07:28 PM
কোন দল ক্ষমতায় যেতে পারে, সেটা বিবেচনায় নিয়ে কারো কারো মধ্যে কাজ করার প্রবণতা দেখছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ।
শনিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরীতে নির্বাচন নিয়ে এক কর্মশালায় তিনি এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কারো কারো মাঝে আগামী সময় কোন দল ক্ষমতায় আসতে পারে, সে বিবেচনা মাথায় রেখে কাজ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
“যেটা মানুষ আমাদের কাছে প্রত্যাশা করে না। মানুষ চায়, আমরা কোনো দলের নয়, কোনো মতের নয়, কোনো আদর্শের নয়। আমরা দলদাস না, আমরা হচ্ছি জনদাস। আমরা জনদাস হয়ে দায়িত্ব পালন করতে চাই। এসব ক্ষেত্রে দলপতি যেদিকে যায়, পিছনের লোকেরাও সেদিকে যায়।”
এসব ‘দলদাসকে’ আলাদা করে নির্বাচনি দায়িত্ব পালন থেকে দূরে রাখা যায় কিনা, তা বিবেচনা করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের প্রতি অনুরোধ জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের সময় ও নির্বাচনের পরে নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা আছেন, তাদের সব অপকর্ম কঠোর হাতে দমন করতে হবে।”
কর্মশালায় উপস্থিত থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীনকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “এক্ষেত্রে আপনাদের কঠোরতা আমাদের দায়িত্বশীল করবে। নির্বাচনের সময় কোনো রকমের ছাড় দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলো যে নীতিমালার মধ্যে নির্বাচনি কাজ করার কথা, তার যদি কোনো রকম ব্যত্যয় ঘটে, সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের যদি কেউ কোনো অপকর্ম করেন, সঙ্গে সঙ্গে আমরা ব্যবস্থা নিব।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা মিলছে না জানিয়ে ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, “আইন প্রয়োগের অন্যতম শর্ত হচ্ছে- অধিকাংশ মানুষ আইন মেনে চলবে। কিছু সংখ্যক মানুষ আইন মেনে চলবে না। তাদের জন্য আমরা আইন প্রয়োগের চেষ্টা করে থাকি।
“কিন্তু বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর যেরকম অংশগ্রহণ দরকার, সেই পর্যায়ের সহযোগিতা আমরা পাচ্ছি না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একতার অভাবে, অন্তঃকলহের কারণে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হুমকি, দাঙ্গা, এমনকি হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় পুলিশের পক্ষে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।”
তিনি বলেন, “কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো কোনো দলের চার-পাঁচজন এমপি পদপ্রার্থী, যারা মনোনয়ন পাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে আছেন, তারাও নিজেদের মধ্যে নানা রকমের অনৈক্যের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সড়ক অবরোধ, ভাংচুর, একজনের বিরুদ্ধে আরেক জনের অপচেষ্টা- এসব কাজ বর্তমানে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
নির্বাচনটা ‘ব্যবসা ও বিনিয়োগ হয়ে গেছে’
আহসান হাবিব পলাশ বলেন, “বাংলাদেশে নির্বাচনে প্রার্থীদের অন্যতম একটা ভাবনা হচ্ছে, তারা ব্যবসা এবং বিনিয়োগ হিসেবে ব্যপারটাকে গ্রহণ করেন। নির্বাচনে জয় লাভ করতে পারলে, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পারলে তাদের অর্থসম্পদের বিকাশ অবারিত হওয়ার সুযোগ থাকে।
“তাই টাকা ছাড়া নির্বাচন হয় না- রাজনৈতিক দল, নেতা এবং ভোটারদের মাঝেও এরকম একটা ভাবনা রয়ে গেছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের বড় অন্তরায়।”
তিনি বলেন, “বর্তমান সময়ে এই টাকা জমানোর প্রবণতার কারণে প্রার্থীরা নানা ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। অর্থাৎ সামনে নির্বাচন, নির্বাচনের জন্য টাকা লাগবে।”
বিগত সরকার সমর্থকদের ভেড়াতে চায় সবাই
বিগত সরকারের সমর্থকদের নিজেদের তীরে ভেড়ানোর জন্য প্রায় সব রাজনৈতিক দল উঠেপড়ে লেগেছে মন্তব্য করে ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, “তাদের অপকর্ম ঢেকে এবং তাদের অপকর্মকে উপেক্ষা করে নিজ নিজ দলে ভেড়ানোর যে অপচেষ্টা, সেটাও আমাদের জন্য বিব্রতকর।
“পুলিশ এদেরকে গ্রেপ্তার করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সবাই একসঙ্গে গিয়ে এর প্রতিবাদ করে। কোর্টে গিয়ে তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে তাদের জামিনসহ অন্যান্য কার্যক্রম করে দেয়। এগুলো দিন দিন আমাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
নির্বাচন বানচাল করার জন্য যেসব অপশক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া সংবাদ ও গুজব প্রচারের চেষ্টা করছে, তাদের মোকাবিলার জন্য প্রকৃত তথ্য জানা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আগামী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য এবার হয়তো নগদ অর্থের পরিবর্তে অনলাইন লেনদেন বেড়ে যাবে জানিয়ে আহসান হাবিব পলাশ বলেন, “তাই মোবাইল আর্থিক যে সেবা আছে (এমএফএস), তাদের মাধ্যমে টাকার লেনদেনের প্রবণতা দেখা যেতে পারে।
“এমন একটা ব্যবস্থা থাকা দরকার, যার নিয়ন্ত্রণ যেন নির্বাচন কমিশনের কাছে থাকে। আপনাদের নির্দেশনার বাইরে যেন তারা যেতে না পারে।”
নগরীর এস এস খালেদ রোডে লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মিলনায়তনে এ কর্মশালা হয়। শিরোনাম ছিল, ‘নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে চ্যালেঞ্জসমূহ নিরূপন ও উত্তরণের উপায়’।