Published : 05 Aug 2026, 04:46 PM
চট্টগ্রামে একাধিক জোড়া খুনসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড ও চাঁদাবাজির ঘটনায় বারবার নাম আসা রায়হান আলম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলমকে লক্ষ্য করে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন।
ওই পোস্টে রায়হান লিখেছেন, “দোযখ আর জাহান্নামে তফাৎ কি মাসুদ স্যার?”
কিন্তু কেন পলাতক এই সন্ত্রাসী এরকম পোস্ট দিয়েছেন?
গেল সপ্তাহে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ‘অল্পের’ জন্য পুলিশের হাত থেকে রায়হান ফসকে গেছেন বলে দাবি করেছিলেন চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম।
রায়হানের সহযোগী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর গেল ৩০ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেছিলেন, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে একটি বাড়িতে ছিলেন রায়হান। ২৯ জুলাই পুলিশের অভিযানে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যান।
তিনি বলেছিলেন, “অলৌকিকভাবে সে (রায়াহন) বেঁচে গিয়েছিল। সে জাহান্মাম দেখেনি, দোজখ দেখে ফেলেছে।”
পুলিশ সুপারের এ বক্তব্যের পর গেল সোমবার স্যুট পরে প্রাইভেট কারে বসা নিজের ছবি পোস্ট করে রায়াহন পুলিশ সুপার মাসুদ আলমকে লক্ষ্য করে ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, “দোযখ আর জাহান্নামে তফাৎ কি মাসুদ স্যার?”
এই পোস্টে রায়হান পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে তাকে সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদও দিয়েছেন স্থানীয় লোকজনকে।
রায়হান লিখেছেন, “ধন্যবাদ নোয়াখালী রংমালার মানুষদের তারা এমন নিকুত (নিখুঁত) ভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে, বিপদে সাহায্য সহযোগীতা (সহযোগিতা) পাবার জন্য ভালো খারাপ সব লেভেলের মানুষ আশা করে, যা আমি ও পেয়েছি নোয়াখালী থেকে।”
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপারের কাছে রায়হানের অবস্থান নিয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “রায়হান কোথায় আছে আমরা জানি না। সোশাল মিডিয়ায় আমরা তাকে দেখছি।”
নোয়ালাখীর অভিযানের কথা তুলে ধরে পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, “কোম্পানীগঞ্জের রংমালা এলাকায় তাকে ধরতে আমরা পাঁচ ঘণ্টার চিরুনি অভিযান করেছিলাম। আল্লাহ রহম করছে, সে পুলিশের কাছ থেকে বেঁচে গেছে।”
রায়হানের ফেইসবুক পোস্ট বিষয়ে তিনি বলেন, “ওই এলাকার কিছু দুষ্ট লোক তাকে আশ্রয় দিয়ে লুকিয়ে রেখেছে। সেজন্য সে স্ট্যাটাসে তাদের ধন্যবাদ দিতে ভুলে নাই।”
চট্টগ্রামে সরোয়ার হত্যা, জোড়া খুনসহ বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোচিত নাম এ রায়হান। নগরীর পাশাপাশি জেলার কয়েকটি হত্যাকাণ্ডেও আলোচনায় আসে তার নাম।
কীভাবে আলোচনায় রায়হান?
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ৭ নম্বর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জুরুরকুল মুন্দার খলিফার বাড়ির বাসিন্দা বদিউল আলমের ছেলে রায়হান।
একসময় রাউজান এলাকায় বালুর মহালে টাকা তোলা এবং ছোটখাটো অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এ রায়হান। পরে চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ এলাকায় বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবন ও প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন।
চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা পুলিশে দায়িত্ব পালন করা একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী এ রায়াহান।
তারা বলেন, ছোট সাজ্জাদ ওরফে বুড়ির নাতি সাজ্জাদ, বোরহান, রায়হান ও ডেভিড ইমন সবাই এক পক্ষ।
ওই পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ছোট সাজ্জাদ, বোরহান, রায়হান মূলত বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের এক সময়ের সহযোগী সরোয়ার ও ম্যাক্সনের হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করতেন।
বড় সাজ্জাদের সঙ্গে সরোয়ার ও ম্যাক্সনের দূরত্ব সৃষ্টি হলে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ট হন ছোট সাজ্জাদ, বোরহান, রায়হান ও ডেভিড ইমন।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর বড় সাজ্জাদ গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ যায় বোরহানের হাতে। পরপর বেশ কয়েকটি ঘটনায় বোরহানের নাম আলোচনায় আসার পর রায়াহনকে সামনে নিয়ে আসেন বড় সাজ্জাদ।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর রায়হানের হাত ধরে সাজ্জাদ গ্রুপে যুক্ত হন মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন।
জানা যায়, ছোট সাজ্জাদ ও বোরহানের বিকল্প হিসেবে রায়হান কাজ করেন। জোড়া খুন, বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনি জনসংযোগে গুলি করে সরোয়ারকে খুনসহ বিভিন্ন চাঁদাবাজিতে রায়হানের নাম আলোচনায় চলে আসায় ডেভিড ইমন পরবর্তীতে বড় সাজ্জাদের হয়ে বেশকিছু চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটান।
গত ৫ নভেম্বর বায়েজিদ চালিতাতলী এলাকায় বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনি জনসভায় গুলি করে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সরোয়ার হত্যা মামলায়ও আলোচনায় আসে রায়হানের নাম।
ভিড়ের মধ্যে পেছন থেকে কাঁধে পিস্তল ঠেকিয়ে সরোয়ারকে গুলি করা ব্যক্তিটি রায়হান বলে ধারণা পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।
গত বছরের ৩০ মার্চ ভোরে নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রাইভেট কার থামিয়ে দুই জনকে গুলি করে খুন করা হয়। এ মামলায়ও আসে রায়হানের নাম।
একই বছরের ১৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে গুলি করে ঢাকাইয়া আকবরকে খুনের ঘটনারও অন্যতম আসামি রায়হান।
গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহুনিতে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাসুদ চৌধুরী হত্যা মামলার এজাহারে ১ নম্বরে তার নাম রয়েছে।
এর আগে ওই বছরের ২২ এপ্রিল রাউজান উপজেলা সদর ইউনিয়নের পূর্ব রাউজানের গাজী পাড়ায় মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে মো. ইব্রাহীম (৩০) নামে এক যুবককে খুন করা হয়।
তার আগের দিন গাজীরপাড়া এলাকায় রায়হানকে ধরতে অভিযানে যায় চট্টগ্রাম নগর পুলিশের একটি দল।
কথিত আছে রায়হান সেই এলাকায় অবস্থানের বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল ইব্রাহীম। এর বদলা নিতে পরদিন দলবল নিয়ে সেখানে হাজির হন রায়হান। গুলি করে খুন করা হয় ইব্রাহীমকে।
আগের খবর:
চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীকে ‘ব্লেড দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারার’ হুমকি
রাউজানে যুবদল নেতা খুন: 'আলোচিত সন্ত্রাসী' রায়হান প্রধান আসামি
চট্টগ্রামে ‘বড় সাজ্জাদ’ এর নামে ফোন, ‘চাঁদা না পেয়ে’ ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি