১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

জঙ্গল ছলিমপুরে যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে হামলা: ‘নিজের চোখে আজরাইল দেখছি’

“আমাদের যদি দেখত, তাহলে তারা নিশ্চিত মেরে ফেলত। আমরা এখানে কাজ করার কারণে তারা ক্ষুব্ধ ছিল,” বলেন একজন নির্মাণ শ্রমিক।

জঙ্গল ছলিমপুরে যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে হামলা: ‘নিজের চোখে আজরাইল দেখছি’
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুরে সন্ত্রাসী হামলায় যৌথ বাহিনীর নির্মাণাধীন ক্যাম্প ভাংচুর করে সন্ত্রাসীরা। ছবি: সুমন বাবু

উত্তম সেন গুপ্ত

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 May 2026, 01:53 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:41 PM

চট্টগ্রামের জঙ্গল ছলিমপুরে যৌথবাহিনীর জন্য ক্যাম্প বানানোর কাজ করছিলেন ২৭ জন শ্রমিক। গভীর রাতে সেখানে হামলা আর গোলাগুলির পর তাদের মনে ভর করেছে মৃত্যুভয়।

চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে মো. নীরব নামের এক শ্রমিক বললেন, “আমাদের যদি দেখত, তাহলে তারা নিশ্চিত মেরে ফেলত। আমরা এখানে কাজ করার কারণে তারা ক্ষুব্ধ ছিল। মনে হচ্ছে নিজের চোখে আজরাইল দেখছি। মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরছি।” 

রোববার গভীর রাতে মূল সড়কের বিভিন্ন স্থানে কেটে জঙ্গল ছলিমপুরের আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে ত্রিমুখী হামলা চালায় ‘সন্ত্রাসীরা’। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা গোলাগুলির পাশাপাশি নির্মাণাধীণ একটি ক্যাম্প ভেঙে দিয়ে যায় তারা। 

র‌্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান এ ঘটনার জন্য জঙ্গল ছলিমপুরের 'অধরা নিয়ন্ত্রক' ইয়াছিন বাহিনীকে দায়ী করেছেন।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়াও নতুন ক্যাম্প নির্মাণের কাজে থাকা শ্রমিকরা হামলার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। সোমবার সকালে আলী নগরে তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের চোখে মুখে দেখা যায় চাপা আতঙ্ক। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারায় কাজ করলেও তারা এখন সেখানে নিরাপদ বোধ করছেন না। 

মাকসুদুল আলম নামে এক নির্মাণ শ্রমিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট্কমকে জানালেন, গত ১ মে থেকে নতুন ক্যাম্প নির্মাণের কাজে আছেন তারা। 

“আমরা খাওয়া দাওয়া করে রাত ১টার দিকে নির্মাণ শেডে ঘুমাতে যাই। হঠাৎ গুলি শব্দ শুনে বের হয়ে দেখি ক্যাম্পের সামনে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরা আলী নগর স্কুলের দিকে দৌঁড়ে যাচ্ছে। সেদিক থেকে গুলির শব্দ বেশি শোনা যাচ্ছিল।”

পূর্ব দিক থেকে (পেছন দিক থেকে) একটি ট্রাক আসতে দেখেন মাকসুদুল আলম। তিনি বলেন, ট্রাকের পেছনে কয়েকশ লোক লাঠিসোঁটা ও অস্ত্র নিয়ে দৌড়ে আসে এবং ক্যাম্পে হামলা চালায়।

“ট্রাকে করে এক্সক্যাভেটর নিয়ে এসেছিল সন্ত্রাসী বাহিনী। পেছনে মোটর সাইকেলে করেও কিছু লোকজন আসে। এসেই আমাদের নির্মাণাধীন ক্যাম্পে হামলা শুরু করে। ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গুলি ছোড়ে।”

তাদের অনেকের হাতে ‘ছোট’, আবার কারো কারো হাতে ‘বড়’ অস্ত্র দেখার কথা বলেন মাকসুদুল।

“তারা পাথর ও গুলি ছুড়ে লাইট পোস্টের লাইটগুলো ভেঙে দিতে শুরু করে। তখন পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় ব্যাপক বৃষ্টি।” 

শ্রমিকদের মধ্যে মাকসুদুলসহ তিনজন ভয়ে নালায় গিয়ে লুকান। আরো চারজন দৌঁড়ে গিয়ে নির্মাণাধীন ক্যাম্পের বিপরীতে থাকার ঘরে ঢুকে পড়েন। 

শাহীন আলম নামে একজন বলেন, “আমরা এখানে ২৭ জন কাজ করি। রাতে থাকি সাত জন। রাতে পশ্চিম দিক থেকে (আলী নগর স্কুল) গুলির শব্দ শুনলাম। বের হয়ে দেখি পূর্ব দিক দুই তিনশ লোক দৌঁড়ে আসছে। তাদের সামনে একটি ট্রাক, পেছনে মোটর সাইকেল। সবার হাতে অস্ত্র, লাঠিসোঁটা, ধারালো অস্ত্র। আমিসহ চার জন দৌঁড়ে গিয়ে আমাদের থাকার ঘরে ঢুকে যাই। 

“তখন তারা মোটর সাইকেল থেকে গুলি ছুড়ছিল। আমাদের ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে পেয়ে বেদম মারধর করেছে। অন্যরা ভেতরে বাথরুমে লুকিয়ে ছিল। ঘরের ভেতর থেকে আমাদের টাকা পয়সা মোবাইল সব লুট করে নিয়ে গেছে।” 

চট্টগ্রামের জঙ্গল ছলিমপুরে রোববার রাতে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির পর সকালে সড়কের পাশে একটি পোড়া মোটরসাইকেল পড়ে থাকতে দেখা যায়। ছবি: সুমন বাবু

চট্টগ্রামের জঙ্গল ছলিমপুরে রোববার রাতে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির পর সকালে সড়কের পাশে একটি পোড়া মোটরসাইকেল পড়ে থাকতে দেখা যায়

‘প্রস্তুতি’ চলছিল আগে থেকেই, ‘হুমকিও’ দেওয়া হয়েছিল

৯ মার্চ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তিন হাজার ১৮৩ জন সদস্যকে নিয়ে জঙ্গল ছলিমপুরে অভিযানে গিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ৪৮৭, বিজিবি ১২২ জন, র‌্যাবের ৩৭১ জন সদস্য ছিলেন। তিনটি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি, ডগ স্কোয়াড, ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয় সেই অভিযানে।

অভিযানের পর আলী নগর স্কুলে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। যেখানে পুলিশ, এপিবিএন, আরআরএফ, র‌্যাবের শতাধিক সদস্য অবস্থান করেন। আলী নগর স্কুল থেকে কয়েকশ গজ দূরে পূর্ব দিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য আলাদা একটি ক্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই কাজই করছিলেন ওই শ্রমিকরা। 

তারা জানান, ঈদের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসার কথা থাকায় গত চার দিনে ক্যাম্পে ব্যাপক কাজ হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ কাজ শেষে হয়ে গিয়েছিল। 

হৃদয় ইসলাম নামের এক শ্রমিক বলেন, “মঙ্গলবার আমরা ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাব। সেজন্য রোববার বিকালে সবাইকে বকেয়া মজুরির টাকা পরিশোধ করা হয়েছিল।” 

মো. নীরব বলেন, “টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। সেটার চেয়ে বড় কথা হল, আমরা মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরেছি। চোখের সামনে আজরাইল দেখেছি।” 

তার দাবি, গত শনিবার বিকালে আনুমানিক ২৫/২৬ বছর বয়েসী এক যুবক নির্মাণ শেডে গিয়ে ভিডিও করতে করতে তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।

আলী নগরের ওই হামলার জন্য আগে থেকেই পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি চলছিল বলে এখন মনে করছেন নির্মাণ শ্রমিকরা। এই ধারণার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নীরব বলেন, ওই এলাকার দোকানগুলো রাত ১২টার দিকে বন্ধ হয়। কিন্তু রোববার রাতে ১০টার দিকেই সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়।

“রাতে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমি সিগারেট কিনতে অটো রিকশা স্ট্যান্ডে গিয়েছিলাম। যাবার সময় এখানকার এক পুলিশ সদস্যও আমাদের সাথে গিয়েছিল। সে সময় সেখানে পাঁচ/ছয় জন লোককে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকাতে দেখেছি। এ ধরনের লোক আগে কখনও দেখিনি। তাদের আচরণও সন্দেহজনক ছিল।” 

সোমবার ঘটনাস্থলে গিয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, “আলীনগর এলাকায় আমাদের নতুন যে ক্যাম্পটা করা হচ্ছিল ওটার প্রতি তাদের বিশেষ নজর ছিল। সেটা তারা ভাঙার জন্য এক্সক্যাভেটর থেকে শুরু করে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে এসেছিল।”

সোমবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বায়েজিদ লিঙ্ক রোড থেকে যাওয়ার পথে জঙ্গল ছলিমপুরের খেজুর তলা, পাথরি ঘোনা ও আলী নগর চৌরাস্তা মোড় এলাকায় চারটি স্থানে এক্সক্যাভেপর দিয়ে রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছে। সে কারণে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের কোনো গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। কয়েক কিলোমিটার পায়ে হেঁটে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন। 

চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের ‘দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত জঙ্গল ছলিমপুরে রোববার রাতে সন্ত্রাসী হামলার পর সোমবার সকালে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। ছবি: সুমন বাবু

চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের ‘দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত জঙ্গল ছলিমপুরে রোববার রাতে সন্ত্রাসী হামলার পর সোমবার সকালে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী

সেখানকার দায়িত্বরত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় লোকজন ও ক্যাম্প নির্মাণের কাজে সম্পৃক্ত শ্রমিকরা জানান, ট্রাকে করে এক্সক্যাভেটর নিয়ে আসে সন্ত্রাসীরা পেছনে মোটর সাইকেলে করে তাদের লোকজন আসে। তারাই আলী নগর স্কুলের পূর্ব, পশ্চিম পাশ এবং দক্ষিণ পাশ থেকে হামলা শুরু করে। ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গুলিও ছোড়ে তারা। 

ঘটনাস্থলে র‌্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, “আলী নগরের সন্ত্রাসী ইয়াছিন গ্রুপের দুই-তিনশ সন্ত্রাসী এই হামলা চালিয়েছে। দেশীয় অস্ত্র, লাঠি, রামদার পাশাপাশি একে-৪৭, চায়নিজ রাইফেল এ ধরনের অস্ত্র নিয়ে তারা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা করে।”

এরপর দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রচুর পরিমাণে গোলাগুলি হয়েছে। তবে কেউ আহত হয়নি। আমাদের বেশিরভাগ টিয়ার শেল ও শটগানের বুলেট খরচ হয়েছে। লাস্ট মোমেন্টে তারা যখন একে-৪৭ দিয়ে ফায়ার করেছিল, তখন আমাদের অল্প কিছু রাইফেল দিয়ে ফায়ার করেছে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা।”    

র‌্যাব-৭ অধিনায়কের দাবি, এক্সক্যাভেটর দিয়ে স্কুলের পেছনের সীমানা প্রাচীরের দুই জায়গায় ভেঙে ফেলা হয়। পরে সেখান থেকে গুলি করলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। 

“নতুন যে ক্যাম্প বানানো হচ্ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়ে গেছিল। সেই ক্যাম্পটাতে তারা ভাঙচুর করেছে এবং প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করেছে।” 

খবর পাওয়ার পরে র‌্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করে জানিয়ে র‌্যাব-৭ অধিনায়ক বলেন, “আসার পরে দেখলাম যে রাস্তায় বেশ কিছু কালভার্টের সামনে বড় বড় ডিচ করে রেখেছে। যাতে আমরা যাতে গাড়ি নিয়ে আসতে না পারি। 

“পরে গাড়ি রেখে আমরা হেঁটে চলে এসেছি। যখন এসেছি ততক্ষণে তারা বেশিরভাগই পালিয়েছে। কিছু সন্দেভাজনকে আমরা পেয়েছি। জিজ্ঞাসাবাদ করছি। সম্পৃক্ততা পেলে গ্রেপ্তার করা হবে। না হলে ছেড়ে দেব।”         

জঙ্গল ছলিমপুরের আলীনগর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ঠেকাতে কয়েকটি স্থানে সড়ক কেটে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। ছবি: সুমন বাবু

জঙ্গল ছলিমপুরের আলীনগর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ঠেকাতে কয়েকটি স্থানে সড়ক কেটে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়

নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে

চলতি বছর ১৯ জানুয়ারি র‌্যাবের একটি দল কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে জঙ্গল ছলিমপুরে অভিযানে যায়। সেখানে ‘মাইকে ঘোষণা’ দিয়ে র‌্যাব সদস্যদের ঘিরে তিনজনকে আটকে ফেলে স্থানীয়রা। তাদের পিটুনিতে নিহত হন র‌্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া।

এরপর গত ৯ মার্চ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তিন হাজারের বেশি সদস্যকে নিয়ে সেখানে অভিযানে যায় স্থানীয় প্রশাসন। তখন বেশ কয়েকজনকে ধরা হলেও ‘সন্ত্রাসীদের হোতা’ ইয়াছিন ছিলেন অধরা।

অভিযানের পরপরই সেখানে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করার তথ্য দিয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি ও র‌্যাবের বর্তমান মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ বলেছিলেন, “সেখানে পুলিশ ও র‌্যাব মিলে ৩০০ সদস্য দায়িত্ব পালন করছে। সেখানে আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আশাকরি পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব।”

তার দেড় মাস পর কীভাবে এ ধরনের পরিকল্পিত হামলা চালানো সম্ভব হল–এ প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, জঙ্গল ছলিমপুর দীর্ঘদিন সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে এবং তারা এখানে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করেছে। 

“এটা বিরাট একটা সাম্রাজ্য। পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আসার কারণে এ সাম্রাজ্যে তাদের ইন্টারেস্টে ভাটা পড়েছে। তারা মুখিয়ে ছিল যে কোনো সময়ে এটার ব্যাপারে তারা কাউন্টার কোনো কিছু করবে। দীর্ঘদিন যেহেতু তাদের সাম্রাজ্য ছিল, এখানে একটু সময় লাগবে।”

একই প্রশ্নের উত্তরে র‌্যাব-৭ অধিনায়ক হাফিজুর রহমান বলেন, “পাহাড়ের ভেতর দিয়ে এক্সক্যাভেটর আনা হয়েছে। রাস্তা কাটাসহ সব কাজ খুব কম সময়ের মধ্যে করেছে। এক ঘণ্টার মধ্যে কাজ শেষ করে হামলা করেছে। তারা চর্তুদিক থেকে হামলা করেছে। ইট পাথরও মেরেছে। সামনে ককটেল মেরেছে।” 

তার দাবি, পাহাড়ের উপরে নির্মিত কিছু টিনের ঘর থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে। এক ঘণ্টার মধ্যে বাকি প্রস্তুতি সেরে ফেলে তারা হামলা করেছে। আর হামলা চলাকালে এক্সক্যাভেটর দিয়ে ভাংচুর করেছে।

হামলার মোটিভ কী জানতে চাইলে র‌্যাব-৭ অধিনায়ক বলেন, “ইয়াছিন গ্রুপ প্রায় ১৮-২০ বছর ধরে এই এলাকায় একটা নিজস্ব রাষ্ট্র তৈরি করেছে। সেখানে আমরা অভিযান পরিচালনা করে তাকে উৎখাত করেছি। তারা স্বার্থের জন্য, সরকারকে বিব্রত করার জন্য সবকিছুই করছে। সে (ইয়াছিন) যেহেতু ক্রিমিনাল, তার সব খারাপ ইস্যু নিয়েই সে এই হামলা করেছে।”   

কে এই ইয়াছিন? 

স্থানীয় লোকজনদের ভাষ্য, ২০০২-০৩ সাল থেকে জঙ্গল ছলিমপুর ও আলী নগরে বসতি শুরু হয়। জঙ্গল ছলিমপুরের পুরো ছিন্নমূল এলাকাকে ১১টি ‘সমাজে’ ভাগ করা হয় ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্য।

আর আলীনগর এলাকাটি ‘আলী নগর বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে পরিচালিত হলেও তার পুরা নিয়ন্ত্রণ থাকে ইয়াছিনের হাতে। 

মূলত এই সমিতি দেখাশোনা করেন ইয়াছিনের ছোট ভাই ওমর ফারুক ও ভাগ্নে আনোয়ার। এছাড়া রয়েছেন নুরুল হক ভাণ্ডারী, মোর্শেদ, কালা ফারুক, মেহেদী হাসান নামে আরও কয়েকজন। যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর তারাও সবাই গা ঢাকা দিয়েছেন। 

এলাকাবাসীর ভাষ্য, একসময় জঙ্গল ছলিমপুরের ওই অংশে এসে বসতি স্থাপন করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষ। তবে বর্তমানে সেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি উচ্চবিত্তরাও জায়গা নিয়েছেন। যাদের মধ্যে আছে সরকারি কর্মকর্তারাও। 

একসময় আমিন টেক্সটাইল মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন ইয়াসিন। ছিন্নমূল এলাকার নেতা আলী আক্কাসের সঙ্গে ছলিমপুরে আসেন তিনি। এরপর আক্কাস ছিন্নমূলের নিয়ন্ত্রণ নিলে ইয়াসিন নেন আলীনগরের নিয়ন্ত্রণ। 

ছলিমপুরের পাহাড়ে এই অবৈধ বসতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ২০০৪ সালে একাধিক পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ২০১০ সালে স্থানীয় লাল বাদশা ও আক্কাসের গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। 

ওই বছরের ২৩ মে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্ধুকযুদ্ধে’ আক্কাস নিহত হন। এরপর ছিন্নমূল এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ‘সমাজের’ বিভিন্ন জনের কাছে। তবে আলীনগরে নিজের নিয়ন্ত্রণ আরো পোক্ত করেন ইয়াছিন।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুরে প্রবেশের রাস্তা কেটে ফেলায় গাড়ি অনেক দূরে রেখে আলীনগর এলাকায় পৌঁছাতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। ছবি: সুমন বাবু

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুরে প্রবেশের রাস্তা কেটে ফেলায় গাড়ি অনেক দূরে রেখে আলীনগর এলাকায় পৌঁছাতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের

স্থানীয়দের দাবি, এক সময় শুধু আলী নগর এলাকায় নিয়ন্ত্রণ ছিল ইয়াছিনের হাতে। ২০২৪ সালের পট পরিবর্তনের পর জঙ্গল ছলিমপুরের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে চলে যায়। এ এলাকায় কে আসবে যাবে–সবকিছুই ইয়াছিনের ওপর নির্ভর করে। 

তাদের ভাষ্য, এক কথায় আলীনগরে ইয়াছিন ছাড়া কোনো ‘রাজা’ নাই।

গত মার্চের অভিযনের পর এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে জঙ্গল ছলিমপুর ও আলী নগর এলাকায় যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদক। সেখানে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এখনও ছলিমপুর ও আলীনগর এলাকার ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ’ রয়ে গেছে দখলদারদের হাতে। ফলে প্রশাসন যতই বলুক ছলিমপুরে সন্ত্রাসীরা আর নেই, তবু ভয় ও উৎকণ্ঠা তাদের পিছু ছাড়ছে না।               

তাদের ভাষ্য ছিল, অভিযানের পর আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যাদের ধরেছে, তারা ‘উল্লেখযোগ্য কেউ না’; আসল সন্ত্রাসীরা অধরা রয়ে গেছে। 

এদিকে সোমবার র‌্যাব-৭ অধিনায়ক হাফিজুর রহমানের কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল–কেন ধরা যাচ্ছে না ইয়াছিনকে। 

জঙ্গল ছলিমপুরের আলীনগর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ঠেকাতে কয়েকটি স্থানে সড়ক কেটে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। ছবি: সুমন বাবু

জঙ্গল ছলিমপুরের আলীনগর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ঠেকাতে কয়েকটি স্থানে সড়ক কেটে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়

জবাবে তিনি বলেন, “এটা অনেক বড় একটা পাহাড়ি এলাকা। মূল সমস্যাটা হচ্ছে আমাদের কমিউনিকেশন। সবসময় আমরা একটা জিনিসের প্রবলেম ফেইস করতেছি। আমরা যেদিক দিয়েই আসি, কোনো দিক দিয়ে গাড়ি নিয়ে ঢুকতে পারি না। গাড়ি এলেও খুব স্লো আসে। দ্রুত গতিতে এসে পৌঁছাতে পারি না। সে কারণে আমরা ঢোকার সাথে সাথে সে আরেক দিক দিয়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। 

“পাহাড়ের ভেতরে একজন মানুষকে খুঁজে বের করা খুব ডিফিকাল্ট। যদি রাস্তাঘাটগুলো ঠিক হয়ে যায়, তাহলে এই এলাকায় আর তার লুকিয়ে থাকা সম্ভব হবে না।”

হাফিজুর রহমান বলেন, “গাড়ির রাস্তা যদি ঠিক থাকে, যোগাযোগ ব্যবস্থাটা যদি ঠিক থাকে, বায়েজিদ লিংক রোড থেকে এ পর্যন্ত যদি পাকা রাস্তা পাই, ৫ মিনিটে পৌঁছে যাব। তখন সে পালানোর সুযোগ পাবে না।”