১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

চাকসুর জুলাই ফেস্টের প্রদর্শনীর ফেস্টুনে সাঈদীর ছবি-বাণী, ক্ষোভ

এ ঘটনাকে চাকসুতে ছাত্রশিবিরের ‘দলীয় প্রভাব বিস্তারের পাঁয়তারা’ হিসেবে দেখছে ছাত্রদল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Aug 2026, 12:48 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:25 PM

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) আয়োজিত ‘জাগ্রত জুলাই: কালচারাল ফেস্ট’ এর একটি ফেস্টুনে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামী প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি ও বাণী ঘিরে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।  

একে চাকসুতে ছাত্রশিবিরের ‘দলীয় প্রভাব বিস্তারের পাঁয়তারা’ আখ্যা দিয়ে বিষয়টিকে ‘আপত্তিজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন ছাত্রদল নেতারা। 

চাকসু উদ্যোগে মঙ্গলবার সকালে ক্যাম্পাসে শহীদ আব্দুর রব হল মাঠে দুইদিনব্যাপী ‘জাগ্রত জুলাই কালচারাল ফেস্ট’- এর উদ্বোধন করা হয়। এ সময় উদ্বোধনস্থলের পাশেই প্রথমে প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছবি সম্বলিত ফেস্টুনের পাশে সাঈদীর ফেস্টুনটি দেখা যায়। 

তবে উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর সেই ফেস্টুন মাঠের অন্য পাশে সরিয়ে ফেলা হয়। সাঈদীর ছবি সম্বলিত ফেস্টুনে লিখা রয়েছে- ‘আমি দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে উত্তর গগণে কালো মেঘ জমা হয়েছে। যদি সক্ষমভাবে মোকাবিলা করতে না পারেন, তবে এমন গাঢ় কালো অমাবশ্যার রাত আসতে পারে, যার সুবহে সাদিক হওয়া অসম্ভব।’

এ বিসয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ছাত্রদল প্যানেল থেকে নির্বাচিত চাকসুর এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, “চাকসুকে দলীয়করণ ও দলীয় প্রভাব বিস্তার করার একটা পাঁয়তারা করছে ছাত্র শিবির। চাকসু সকল মতের মানুষকে ধারণ করার কথা থাকলেও, সেখানে জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ফেস্টুন থাকাটা আপত্তিজনক। যদিও পরে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ফেস্টুন এনে ব্যালেন্স করার চেষ্টা করা হয়েছে।

“এখানে জুলাইয়ের সব মানুষের ভূমিকা তুলে ধরার কথা থাকলেও, বিষয়টি উঠে আসে নি। এই প্রোগ্রামে জামায়াত ঘরানার মানুষদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যেমন জামাতপন্থি কবি মতিউর রহমান মল্লিকের ফেস্টুন থাকলেও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটা ফেস্টুন নাই। জুলাইয়ে নারীদের ভূমিকাও সেখানে তুলে ধরা হয়নি। চাকসুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে আমি গুরুতর আপত্তি জানিয়েছি।”

চবি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন, “খুব দুঃখজনকভাবে যারা যুদ্ধাপরাধী, বিতর্কিত, রাজাকার তাদের ছবিসহ ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে। এটা নরমালাইজ করার জন্য এখানে আবার জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ছবিও রাখা হয়েছে। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক। জিয়াউর রহমানের পাশে ছবি টাঙালেই রাজাকাররা ইতিহাস থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না। তারা (ছাত্রশিবির) ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করছে।

“কালচারাল ফেস্টে শিক্ষার্থীদের টাকায় চাকসুর নামে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং রাজাকারকে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এর জন্যে চাকসু এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে।”

এ বিষয়ে ছাত্রশিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব বলেন, “দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বাংলাদেশের আপামর জনগণের শ্রদ্ধার পাত্র। তিনি বাংলাদেশকে ধারণ করতেন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী সম্মুখ সারির যোদ্ধা ছিলেন। তখনকার সময় যেই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর অপরাধের সাজা দেওয়া হয়, ওই ট্রাইব্যুনালকে সেই সময়ের সব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন বিতর্কিত এবং অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করেছিল।

“আমরা চাকসুর অনুষ্ঠানে বেগম খালেদা জিয়া, জিয়াউর রহমান এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী অর্থাৎ যারা বাংলাদেশকে ধারণ করত তাদের তিনটি বাণী রেখেছি। এটা সব শিক্ষার্থী আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছে।”

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সিকদার বলেন, “জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণের নাম করে ১৯৭১ এর পাক বাহিনীর এজেন্ডা ও রাজকারদের নরমালাইজ করার চেষ্টা করছে চাকসু। ১৯৭১ সালে যারা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করেছে, মা বোনের ইজ্জত নিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে তারাই রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত। তাদের মধ্যে অন্যতম দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।”

চবি গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সদস্য রিশাদ আমীন বর্ণ বলেন, “ছাত্রশিবির চাকসুর ব্যানারে নিজেদের রাজনৈতিক বয়ান প্রচার করছে। তাদের ১৯৭১ এর স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন জুলাই ফেস্টে সাঈদীর ছবিসহ ফেস্টুন। যুদ্ধাপরাধীদের নরমালাইজ করতেই জুলাইকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করতে চাইছে তারা।”

এ বিষয়ে জানতে চাকসু সভাপতি উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল্-ফোরকানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। 

দুই দিনব্যাপী চিত্রকলা ও গ্রাফিতি প্রদর্শনী এবং চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা 

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে ক্যাম্পাসে দুই দিনব্যাপী চিত্রকলা ও গ্রাফিতি প্রদর্শনী এবং শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘর গ্যালারিতে চিত্রকলা ও গ্রাফিতি প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল্-ফোরকান। পরে সাড়ে ১১টায় চাকসু কেন্দ্রে আয়োজিত শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতারও উদ্বোধন করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে উপাচার্য মোহাম্মদ আল্-ফোরকান বলেন, “জুলাইয়ের ঘটনাগুলো আমাদের কখনো ভুলে গেলে চলবে না। সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জীবন দিয়ে গণতন্ত্র, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং নিরাপদ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল। আজ আমরা যে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি, সেটি তাদের আত্মত্যাগেরই ফল।”