Published : 20 Aug 2026, 11:50 PM
চট্টগ্রাম নগরীর স্কুল, কলেজ, বাজার, নির্মাণাধীন ভবন, আবাসিক এলাকা, পরিত্যক্ত ভবন, শিল্প এলাকা, দোকান এমনকি মাজারেও মিলেছে মশার প্রজনন ক্ষেত্র।
চলতি মাসের প্রথম ১৮দিনে নগরীর ছয়টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় জরিপ চালিয়ে মশার ৯২টি প্রজনন ক্ষেত্রের সন্ধান মিলেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি)।
সিটি করপোরেশনের জরিপ প্রতিবেদন বলছে, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় দুই কলেজ চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজেও মিলেছে মশার প্রজনন ক্ষেত্র। তবে এই দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ্যানোফিলিস মশার উপস্থিতি বেশি।
এমনকি চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের পারিবারিক বাড়িতেও মিলেছে মশার প্রজনন ক্ষেত্র।
ওই বাড়ির সীমানা ঘেরা প্রাঙ্গণের একটি বড় অংশে পানি জমে আছে। সেখানেই মশার জন্ম হয় বলেছেন সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম নগরীতে চিহ্নিত মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলোতে মশার প্রজনন থামাতে কার্যক্রম শুরু করেছে সিসিসি।
পাশাপাশি বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিহ্নিত নগরীর আটটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়াতে ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করেছে সংস্থাটি।
এসব এলাকায় অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, লার্ভা নিধন এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ করা হবে।
ছয় ওয়ার্ডেই ৯২ প্রজনন ক্ষেত্র
চলতি মাসের ১৮ দিনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ছয়টি ওয়ার্ডে জরিপ শেষ করেছে। এসব ওয়ার্ড হল- পাঁচলাইশ, পশ্চিম বাকলিয়া, চকবাজার, উত্তর কাট্টলী, পাথরঘাটা ও জালালাবাদ। আরও দুটি ওয়ার্ডে জরিপ চালানো হবে।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ছয়টি ওয়ার্ডে চলতি মাসের প্রথম ১৮ দিনে জরিপ চালিয়ে ৯২টি মশার প্রজনন ক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছে জরিপকারী দল।
এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১টি স্থান নগরীর উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডে শনাক্ত হয়েছে। এই ওয়ার্ডের ঈশান মহাজন হাটের বড় কালিবাড়ী, সাগরিকা শিল্প এলাকা, কাস্টমস একাডেমি ল্যাবরেটরি স্কুল, কাট্টলী সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কাট্টলী নুরুল হক চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় ও খেজুরতলা জেলে পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে মশার প্রজননস্থলের সন্ধান মিলেছে।
এছাড়া নগরীর জালালাবাদে ২২টি, পাঁচলাইশে ১৫টি, চকবাজার ও পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ডে ১০টি এবং পাথরঘাটা ওয়ার্ডে চারটি প্রজননস্থল পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে চকবাজার ওয়ার্ডের পাঁচলাইশ এলাকায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের পারিবারিক বাড়ির প্রাঙ্গণও মশার প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছে জরিপকারী দল।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় চারতলা বাড়িটির সীমানা দেওয়ালের ভেতরের একটি অংশে পানি জমে আছে। তবে ভবনটির নিচতলায় কেউ থাকেন না।
ওই ভবনের এক নিরাপত্তা রক্ষী বলেন, “পাশের নালায় সমস্যার কারণে এখান থেকে পানি নামতে পারে না। পানি জমে থাকায় মশা হয়। আগে সিটি করপোরেশনের লোকজন ওষুধ মারত। এখন নিয়মিত ওষুধ মারে না।”
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রক পরিদর্শক মুহাম্মদ এমরানুল কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওই বাড়ির নিচতলার আশেপাশে কাদা ও মাটি ভরা। সেখানে পানি জমে ডোবার আকার ধারণ করেছে। সেই পানিও নোংরা।
“কারো বাড়ির প্রাঙ্গণ এরকম হলে সেটা আমরা বাড়ির মালিকদের বলে আসি। ওনাদেরও জানাব পরিষ্কার করতে। সেখানে আমরা প্রতি সপ্তাহে ওষুধ স্প্রে করি।”
চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় মুহাম্মদ ইউনূসের পৈত্রিক বাড়ি। সিটি কপোরেশন বাড়িটিকে মশার প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে
এই ওয়ার্ডে কাপাসগোলা সিটি করপোরেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজেও মশার প্রজনন ক্ষেত্র মিলেছে।
এমরানুল কবির বলেন, “কাপাসগোলা কলেজের পাশে হিজরা খালের সংস্কার কাজের জন্য নালা বন্ধ। তাই ময়লা জমে সেখানে মশার জন্ম হচ্ছে। এটার স্থায়ী সমাধানে সময় লাগবে।
“আর মহসিন কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজে পাহাড়ি এলাকা ও গাছপালা বেশি থাকায় মূলত অ্যানোফিলিস জাতীয় মশার প্রজনন হয়। সখানে আমরা প্রতি সপ্তাহে ফগার মেশিন দিয়ে স্প্রে করি।”
নগরীর বাকলিয়া ইছাইক্যার পুল এলাকার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “বর্ষা শুরুর পর থেকে মশা অনেক বেড়ে গেছে। মশারি টাঙানো ছাড়া একদিনও ঘুমানো যায় না। বাসায় মশা, দোকানে মশা, কোনো অফিসে বসলে সেখানে, এমনকি এসির মধ্যেও দেখি মশা।”
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপের কথা তুলে ধরে পরিবেশ আন্দোলন সংগঠক আমিনুল ইসলাম বলেন, “চট্টগ্রাম শহরে মশা নেই কোথায়? এত ওষুধ ছিটানোর দাবি করা হয়, তবু মশা তো কমে না। প্রতিবার বৃষ্টির সপ্তাহ খানেক পর থেকে মশার সংখ্যা কয়েক গুণ করে বাড়তে থাকে।
“এখন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। মশা নিয়ন্ত্রণে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে সেগুলো খুব বেশি কার্যকর বলে মনে হয় না।”
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চিহ্নিত ব্রিডিং জোনগুলোতে আমরা নিয়মিত ওষুধ দিচ্ছি। তবে কারো ব্যক্তিগত ভবনের ভিতরে আমরা ওষুধ দিই না। আবাসিক এলাকায়, ভবনের আশেপাশে এবং ভবন ঘিরে থাকা নালাতে ওষুধ ছিটাই।
“স্বাস্থ্য বিভাগ যে আটটি হটস্পট চিহ্নিত করেছিল সেখানেও আমাদের মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। এছাড়া নতুন করে ৬০ জন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারাও এখন থেকে মশক নিধনে কাজ করবেন।”
আবার ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর পাথরঘাটায় সেন্ট প্লাসিডস স্কুলের সামনে থেকে মশা নিধনে মাসব্যাপী ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করেছে সিটি করপোরেশন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিহ্নিত নগরীর আটটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
এসব এলাকায় অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, লার্ভা নিধন এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ করা হবে।
সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব আশরাফুল আমিন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে সিটি করপোরেশন বিটিআই (ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেন্সিস) ব্যবহার করছে। এর ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তিনি বলেন, গত বছর এ সময়ে সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৮০০ এর বেশি থাকলেও চলতি বছরে তা প্রায় ৫৫০-৫৮০ জনে রয়েছে। একই সময়ে গত বছর ডেঙ্গুতে আটজনের মৃত্যু হলেও চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ প্রয়োগ নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে আশরাফুল আমিন বলেন, “বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জায়গা, জমে থাকা পানি এবং বিভিন্ন স্থাপনায় এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করে তা ধ্বংস করা হবে।”
এ লক্ষ্যে সিটি করপোরেশনের ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেটকে বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। আগামী এক মাস তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করবেন।
যেখানে ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়া যাবে, সেখানে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও কারাদণ্ডসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে সিটি করপোরেশন।
নগর সংস্থার প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ারউদ্দিন চৌধুরী বলেন, “ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশক নিধনের পাশাপাশি নগরীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে নালা-নর্দমা, ড্রেন, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জায়গা ও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।”
নগরবাসীর সহযোগিতা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সফলতা অর্জন সম্ভব নয় তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ বাসাবাড়ি, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশের এলাকায় পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে হবে। ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা কিংবা নির্মাণসামগ্রীতে পানি জমে থাকলে তা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।