Published : 17 Jun 2026, 09:37 PM
টেলিভিশনে দুটি ধারাবাহিক দেখে শিশু আলিনা ইসলাম আয়াত হত্যার আসামি অপহরণ এবং লাশ গুমের ধারণা নিয়েছিলেন তুলে ধরে আদালত বলেছে, তিনি যাদের ‘কোলে মানুষ’ হয়েছেন, তাদের সন্তানকেই হত্যা করেছেন।
চট্টগ্রামে আলোচিত এই শিশু আয়াত হত্যাকাণ্ডকে ‘পূর্ব পরিকল্পিত, নৃশংস, নির্মম ও নিষ্ঠুর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস।
বুধবার আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে পুরো রায় পড়েন বিচারক, তাতেই এসব বিষয় উঠে আসে।

নগরীর ইপিজেড থানার নয়ারহাট এলাকায় প্রায় ২১ বছর আয়াতদের বাড়িতে ভাড়া ছিল দণ্ডিত আবীরের পরিবার। সেই বাড়ির নিচতলাতেই তার বাবার ভাড়া বাসায় নিয়ে আয়াতকে খুন করেন আবীর।
এই হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিল না। কী কারণে হত্যা করা হয়েছে, তাও চূড়ান্তভাবে প্রমাণ হয়নি। তবে আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ডিএনএ পরীক্ষায় পাওয়া প্রমাণ এবং সাক্ষীদের জবানবন্দির ধারাবাহিকতাসহ পারিপার্শ্বিক প্রমাণে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, বলেন বিচারক।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক মুহাম্মদ আলী আককাস বলেন, “আসামি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে দোষ স্বীকার করেছে। জবানবন্দিতে সে বলেছে, বাবা ও মা পৃথক থাকায় এবং দুটি চাকরি হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। টেলিভিশনে ক্রাইম সিরিজ ক্রাইম পেট্রল এবং সিআইডি দেখে কীভাবে অপহরণ করে খুনের পর লাশ গুম করা যায় সেই ধারণা নিয়েছিল।
“যে বাসায় সে শৈশব থেকে ভাড়া ছিল, যাদের কোলেপিঠে মানুষ হয়েছে তাদের সন্তানকেই সে হত্যা করেছে।”
আসামির বাসা থেকে ‘বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখার’ কথা লেখা ডায়েরি পুলিশ ঘটনার পরপর উদ্ধার করেছিল বলেও বিচারক রায়ে বলেন।
আবীরের জবানবন্দি থেকে বিচারক যখন হত্যার পর আয়াতের লাশ টুকরো করে ব্যাগে ভরার বর্ণনা তুলে ধরেন, তখন এজলাসের পাশে দাঁড়ানো আয়াতের মা ঢুকরে কেঁদে ওঠেন।
‘লাশ গুম করতেই’ আয়াতের মরদেহ টুকরো টুকরো করে সাগর পারে স্লুইচ গেইট এলাকা ও বে টার্মিনাল এলাকার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ফেলে দেন আসামি।
বিচারক রায় ঘোষণার সময় বলেন, “দুটি পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হলেও কীভাবে শিশু আয়াতের মৃত্যু হয়েছিল, তা স্পষ্ট হয়নি। তবে আসামি জবানবন্দিতে জানায়, গলা টিপে সে আয়াতকে হত্যা করে।
“তারপর লাশ ব্যাগে ঢুকিয়ে বাবার বাসা থেকে আকমল আলী রোডের মায়ের বাসায় নিয়ে রাখে। সেখানে আয়াতের মরদেহ টুকরো করার সময় আবীরের মা চলে আসায় মরদেহ সানশেডে তুলে রাখে। সানশেড থেকে পাওয়া রক্তের নমুনার ডিএনএ টেস্ট করেই পুলিশ নিশ্চিত হয় মরদেহটি আয়াতের ছিল।”
ঘটনার পর মুক্তিপণ আদায়ের জন্য আয়াতকে অপহরণের কথা বলা হলেও বিচারক বলেন, “আসামি মুক্তিপণ চায়নি। তাই তার বিরুদ্ধে হত্যা ও আলামত গুমের অভিযোগে ৩০২ ও ২০১ ধারায় অভিযোগ গঠন এবং বিচার করা হয়েছে।”

রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, “হত্যাকাণ্ড একটি জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ। এটি শুধু একজন নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা নয়, হত্যার পর মৃতদেহের উপর নির্যাতন। মৃতদেহকে ছয় টুকরো করে বিকৃতি ও অবমাননা অপরাধকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে, যা মানবিক মূল্যবোধের প্রতি চরম অবজ্ঞা। যা সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী। এই অপরাধের প্রতি কোন ধরণের নমনীয়তা হলে তা হবে ন্যায় বিচারের পরিপন্থি।
“তাই আসামিকে ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হল। এছাড়া ২০১ ধারায় ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হল।”
ক্ষোভ ও কান্না
বুধবার শিশু আয়াত হত্যার রায় ঘোষণার ধার্য দিনে সকালে চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে আসামি আবীরের ফাঁসির দাবিতে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিল করে আয়াতের স্বজন ও প্রতিবেশীরা। আসামিকে আদালতে হাজির করার সময়ও তাদের ক্ষোভ জানাতে দেখা যায়।
কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আবীর আলীর মুখে ছিল মাস্ক। এসময় খুন হওয়া আয়াতের বাবা সোহেল রানা ও মা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মাস্ক খুলে ফেলতে বলেন।
আয়াতের বাবা সোহেল রানা বলেন, “মাস্ক খোল, সবাই তোর চেহারা দেখুক। মানুষ দেখুক কে আমার মেয়েকে খুন করেছে।”
আদালতে আয়াতের বাবার কোলে ছিল আড়াই বছরের শিশুপুত্র। মেয়ে আয়াতের নামের সাথে মিল রেখে বাবা-মা ছেলেটির নাম রেখেছেন আয়ান।
রায় ঘোষণার পর হত্যা মামলাটির তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা এ জেড এম ওমর ফারুক এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মনোজ কুমার দে কে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন আয়াতের বাবা সোহেল রানা।
পরে তিনি বলেন, “রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা একমাসের মধ্যে খুনির ফাঁসি কার্যকর চাই।”
২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর নগরীর ইপিজেড থানার নয়ারহাট ওয়াছমুন্সী বাড়ির বাসিন্দা সোহেল রানার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে আলিনা ইসলাম আয়াত খুন হয়। তার মরদেহ টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সারাদেশে আলোচনার জন্ম দেয়।
ঘটনার দিন বিকালে ঘরের পাশে মসজিদে আরবি পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিল আয়াত। ওই ঘটনায় আবীরকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে আবীর স্বীকার করেন, আয়াতকে খুনের পর লাশ ছয় টুকরো করে সাগরের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছেন তিনি।
আবীরকে আটকের পর ওই বছরের ২৫ নভেম্বর পিবিআই জানিয়েছিল, ‘মুক্তিপণের’ জন্য শিশু আয়াতকে অপহরণ করেন আবীর। কিন্তু কোথাও রাখার জায়গা না পেয়ে তাকে হত্যা করেন।
ওই ঘটনায় আয়াতের বাবা ইপিজেড থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পরে আবীরের বাবা, মা ও ছোট বোনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জেনেও গোপন রাখার অভিযোগে ১৭ বছর বয়সী অপর এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক মনোজ কুমার দে। সেখানে আবীরকে আসামি করে তার বাবা-মা ও বোনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
২৩ মে এ মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে বুধবার ধার্য দিনে রায় ঘোষণা করা হল।
আরও পড়ুন:
শিশু আয়াত হত্যা: আসামি আবীরের ফাঁসির রায়