Published : 04 Aug 2026, 12:26 AM
চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ আরো কমে যাওয়ায় নগরজীবনে ভোগান্তির তীব্রতাও বেড়ে গেছে।
সোমবার সকাল থেকে দিনভর বন্দর নগরীর বেশির ভাগ এলাকার বাসা বাড়িতে চুলায় গ্যাস সরবরাহ ছিল না।
যে দুয়েক জায়গায় গ্যাস ছিল, তাতে চাপ এত কম ছিল যে রান্নাবান্নার কাজ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেও গ্যাস পাননি বেশিরভাগ গাড়ির চালক।
সারাদিন সড়কে গাড়ি চলাচল ছিল তুলনামূলক কম। সন্ধ্যায় অফিস ছুটির সময় গাড়ি ছিল হাতেগোনা। বিভিন্ন মোড়ে শত শত যাত্রীকে গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
সোমবার দুপুরে নগরীর রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব সংলগ্ন কুলিয়ারচর সিএনজি স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গ্যাসের জন্য বিভিন্ন গাড়ির দীর্ঘ সারি। চালকদের কেউ কেউ গাড়িতে বসেই দুপুরের খাবার খাচ্ছেন।
বাস চালক খায়রুল বলেন, “এখানে রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত গ্যাস দিচ্ছে শুনে আসছিলাম। কিন্তু এরপর আর গ্যাস দেয়নি। সারাদিন এখানে চলে গেলে ভাড়া মারব কখন? আয় রোজগার বন্ধ হবার পথে। আমরা দিনের রোজগারে চলি। কীভাবে সংসার চালাই বলেন!”
এই স্টেশনে গাড়ির লাইন মূল সড়ক ধরে সিআরবি এলাকা পর্যন্ত চলে যায়।
বিকালে নগরীর কালুরঘাট মৌলভীবাজার এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির সারি।
এখানে অপেক্ষায় থাকা সিএনজি অটোরিকশার চালক মো. জুয়েল বলেন, “সকাল ৬টা থেকে বসে আছি। এখন বাজে সাড়ে ৪টা। এখনো লাইনে আছি। গ্যাস কখনো দিচ্ছে, আবার কখনো দিচ্ছে না। আসলে পাব কিনা, জানি না।”
সোলায়মান নামের এক গাড়ি চালক বলেন, “গ্যাসের লাইনে দিনে ৭-৮ ঘণ্টা চলে গেলে আর গাড়ি চালানোর সুযোগ থাকে না। মালিক সেটা বুঝবে না। জমা তোলাই কঠিন। সরকার বলে দিক, কয়দিন গ্যাস দেবে না। তাহলে গাড়ি বের করলাম না।
“আর যদি গ্যাসের দাম বাড়াতে চায়, সেটাও বলুক। মানুষকে এভাবে কষ্ট দিয়ে লাভ কী।”
কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মো. ইদ্রিস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার এলাকায় গ্যাস না পেয়ে গতকাল রাতে মইজ্জ্যারটেক গিয়ে গ্যাস নিছি। ৬০ টাকা ব্রিজের টোল দিছি।
“দুই ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে ২০০ ইউনিট গ্যাস পাইছি। তার আসতে-যাইতে আমার ৪০ ইউনিট গ্যাস চলে গেছে। তাইলে এবার বলেন, যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া কত নিব। আর মালিকের জমা দিয়ে আমার কাছে কত থাকবে।”
সন্ধ্যায় নগরীর বহদ্দারহাট মোড় ও দুই নম্বর গেট এলাকায় দেখা যায়, অফিস ফেরত শত শত মানুষ গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছে। দুয়েকটি গাড়ি এলে সেখানেই হুড়োহুড়ি করে ওঠার চেষ্টা করছেন অনেকে।
সড়কে তেলচালিত যেসব বাস-মিনিবাস ও টেম্পু চলেছে, সেগুলোর ভাড়াও ছিল অন্যদিনের চেয়ে বেশি।
সাইফুল আলম নামের এক যাত্রী বলেন, “সকালে ১০টাকার ভাড়া ২০ টাকা দিয়ে এসেছি। এখন তো গাড়িই পাচ্ছি না। দুয়েকটা গাড়ি আছে। সেগুলোতে ধাক্কাধাক্কি করে উঠতে গিয়ে আাবার যদি কোন দুর্ঘটনা হয়, সেই ভয়ে উঠতেও পারছি না।”
রোববারের মত সোমবারও নগরীর বাসাবাড়িতে সকাল থেকেই গ্যাস ছিল না। কোথাও কোথাও গ্যাস সরবরাহ থাকলেও তা ছিল নামমাত্র। চাপ এত কম ছিল যে, চুলা জ্বলছিল না।
চকবাজার এলাকার গৃহিনী বিলকিস ফাতেমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চুলা অল্প অল্প জ্বলছে। একটা রান্না করতে দেড় ঘণ্টা লাগছে। সকাল থেকে রান্না শুরু করে দুপুরে শেষ করেছি। প্রতিবেলা তো আর হোটেল থেকে কিনে খাওয়া যায় না।”
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) গত ২১ জুলাই কারিগরি সমস্যা শুরুর পর থেকেই চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ কম ছিল। শনিবার রাত থেকে সরবরাহ আরো কমানো হয়েছে।
এতে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। শিল্প কারখানা, সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার কারখানা এবং বাসাবাড়িতে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে মারাত্মকভাবে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন কারখানায় যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি বেড়েছে লোডশেডিং।
চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তারা বলেছেন, ঢাকা অঞ্চলে সরবরাহ বাড়াতে জাতীয় গ্রিড থেকে সেখানে বেশি পরিমাণে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। এতে চট্টগ্রামের জন্য গ্যাসের বরাদ্দ গত দুদিনে আরো কমেছে। এটাই বর্তমান সংকটের কারণ।
কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্বাভাবিক সময়ে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএসসিএফ)। ২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পরদিন চট্টগ্রামে জাতীয় গ্রিড থেকে ২৩০ এমএমসিএফ গ্যাস মিলছিল। গত শনিবার তা কমে দাঁড়ায় ২১৭ এমএমসিএফে। রোববার এটি কমে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি নামে। সবশেষ সোমবার গ্যাসের সরবরাহ ছিল ১৯৪ মিলিয়ন ঘনফুট।
জানতে চাইলে কেজিডিসিএলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা যতটুকু পাচ্ছি, ততটুকুই সরবরাহ করতে পারছি। পরিমাণ কমায় অনেক জায়গায় চাপ কমে গেছে। এতে ফিলিং স্টেশন ও বাসাবাড়িতে সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।
“এফএসআরইউ মেরামত কাজ শেষ না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আভাস মিলছে। এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না।”