ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদের বেতন কমছে ২৫ শতাংশ
প্রবল আর্থিক সংকটে থাকা ক্যারিবিয়ান বোর্ড গত জুলাইয়ে আইসিসির কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে।
প্রবল আর্থিক সংকটের জের ধরে আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠন করছে ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এর অংশ হিসেবে কমানো হচ্ছে ক্রিকেটারদের বেতন। চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারদের বেতন ২৫ শতাংশ কমানোর ঘোষণা দিয়েছে অনেক দিন ধরেই ধুঁকতে থাকা ক্যারিবিয়ান বোর্ড।
ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিবৃতিতে বলছে, “আর্থিকভাবে, উন্নয়নমূলকভাবে এবং প্রতিযোগিতামূলকভাবে যে সমস্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি, তার বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক পাল্টা আক্রমণ এই পদক্ষেপ।” আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাররা ১২ মাসের চুক্তিতে থাকলেও ঘরোয়া ক্রিকেটারদের চুক্তি কমিয়ে করা হবে সাত মাস।
তবে এই পদক্ষেপে বোর্ডের কিছুটা আর্থিক স্বস্তি মিললেও ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের পুরোনো একটি সংকট তীব্রতর হবে আরও। টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের জগতে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য নিজ দেশের কেন্দ্রীয় চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার যে বৈশ্বিক প্রবণতা ক্রিকেটারদের, সেখানে বরাবরই অগ্রণী ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটাররা। সেই ১৫-১৬ বছর আগে ক্রিস গেইল, ডোয়াইন ব্রাভোরা যা ধারা শুরু করেছিলেন, ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটে তা এখন প্রবলভাবেই আছে তো বটেই, বিশ্বজুড়েও ছড়িয়ে পড়েছে। এখন বোর্ডের বেতন কমানোর এই পদক্ষেপের কারণে এই প্রবণতা ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটে আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান নির্বাহী ক্রিস ডেরিং বিবৃতিতে জানালেন, ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলোচনা করেই তারা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছেন।
“ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং ক্রিকেটারদের সহযোগিতার মনোভাবের প্রশংসা করি, যারা আমাদের সকলের এই পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছেন। যদিও এটি আদর্শ নয়, তবে আর্থিক স্থিতিশীলতার দিকে এটি একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।”
ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোর পুনর্গঠনের কথাও ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাহী, যার অংশ হিসেবে এ বছরের ছেলেদের সুপার৫০ টুর্নামেন্ট এবং মেয়েদের টি-টোয়েন্টি ব্লেজ স্থগিত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে বিপুল পরিচলন ব্যয়কে উল্লেখ করেন ডেরিং।
“আমাদের ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোর ঐতিহাসিক কাঠামো এমন যে, ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছেলে ও মেয়ে উভয় বিভাগের প্রতিটি জাতীয় দল এবং টুর্নামেন্টের (সেটা বয়সভিত্তিক, ডেভেলপমমেন্ট বা সিনিয়র দল, যা-ই হোক না কেন) বেতন, ম্যাচ ফি, বিমান ভাড়া, হোটেল এবং আয়োজন খরচসহ সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করে। এই কাঠামো কোনোভাবেই টেকসই নয়। আমাদের ক্রিকেটের সরাসরি কল্যাণে ব্যবহারের পরিবর্তে, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ও আবাসনের উচ্চ ব্যয় প্রতি বছর আমাদের সীমিত সম্পদের একটি বড় অংশ শুষে নেয়।
প্রকৃতপক্ষে, গত ১৫ বছরে ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ অভ্যন্তরীণ বিমান সংস্থাগুলোয় ভ্রমণের পেছনে ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে, কিন্তু সেই সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে স্পনসরশিপের একটি ডলারও প্রতিদান হিসেবে পায়নি। বছরের পর বছর ধরে এই বোঝা বহন করার ফলে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের সংকট এবং এর ফলস্বরূপ উদ্ভূত মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মোকাবিলাও আমাদের করতে হবে।”
ডেরিং জানান, আইসিসির কাছ থেকে পাওয়া ঋণের শর্ত মেটাতেও আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনের এই উদ্যোগ নিতে হয়েছে।
“গত জুলাই মাসে ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজকে মোট ১৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি ঋণ অনুমোদন করেছে আইসিসি, যা আমাদের দীর্ঘস্থায়ী নগদ প্রবাহের সংকট থেকে সাময়িক স্বস্তি দেবে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে ৩টি কিস্তিতে পাওয়া যাবে। অন্যান্য যেকোনো ঋণদাতার মতোই, এই ঋণ পরিশোধেরও শর্তাবলী রয়েছে, যার জন্য ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজকে এই মাস থেকে তহবিল পেতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড অর্জন করতে হবে।”
সুপার৫০ টুর্নামেন্ট স্থগিত হওয়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছেলেদের ওয়ানডে দল গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আপাতত হারিয়ে যাচ্ছে। ওয়ানডেতে তাদের অবস্থা এমনিতেই নাজুক। বাছাই উতরাতে ব্যর্থ হয়ে গত বিশ্বকাপে তারা খেলতে পারেনি এবং আগামী বছরের বিশ্বকাপেও সরাসরি জায়গা করে নিতে না পারায় আবার বাছাইয়ে খেলতে হবে।
বাছাই পর্বটি হবে আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে। ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ জানিয়েছে যে, আগামী নভেম্বরে সফরকারী ইংল্যান্ড ‘এ’ দলের বিপক্ষে সাদা বলের ম্যাচের একটি সিরিজ আয়োজনের মাধ্যমে এবং এরপর একটি অনুশীলন ক্যাম্পের মাধ্যমে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের জন্য ওয়ানডে ক্রিকেটারদের প্রস্তুত করা হবে।
স্বাধীন জাতি রাষ্ট্রগুলোর একটি সম্মিলিত দল হিসেবে বিশ্ব ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবস্থান বরাবরই অনন্য। ক্রিকেটেই শুধু তারা একসঙ্গে খেলে। তবে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটের পথচলায় সামনের দুই বছরে আরও কঠিন পরীক্ষা তাদের অপেক্ষায়।
ক্যারিবিয়ার প্রতিটি দেশ আগামী বছর পেরুর লিমায় প্যান আমেরিকান গেমসে এবং ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকস গেমসে দল পাঠাবে। সুপার৫০ টুর্নামেন্টের গত আসরের শীর্ষ চারটি দলকে প্যান আমেরিকান গেমসের পুরুষ ইভেন্টের জন্য বাছাইপর্বের দল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, এটি হবে টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। গত মৌসুমে ট-টোয়েন্টি ব্লেজ টুর্নামেন্টের শীর্ষ চারটি দল অংশ নেবে নারী ক্রিকেটের ইভেন্টে।
স্থগিত হওয়া সুপার৫০ ও টি২০ ব্লেজের পরিবর্তে ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকসের পুরুষ ও মহিলা ইভেন্টের জন্য বাছাইপর্বের টুর্নামেন্ট ঘোষণা করেছে ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই টুর্নামেন্টগুলোর খরচ প্রতিটি দেশের ক্রিকেট বোর্ড বহন করবে বলে জানান ডেরিং।
“ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের তত্ত্বাবধানে অলিম্পিকসে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জনকারী ১০টি দেশকে আমন্ত্রণের ভিত্তিতে প্রতিস্থাপিত এই টুর্নামেন্টগুলো আয়োজন করা হবে। নতুন এই আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টগুলো নিয়ে আমরা উচ্ছ্বসিত, যেগুলোর তারিখ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এর গুরুত্ব ও মর্যাদা বেশি হওয়ায়, এটি প্রতিটি দেশের জন্য অলিম্পিসক গৌরব অর্জনের লক্ষ্যে জাতীয় সম্পদকে একত্রিত করার একটি সুযোগ। এতে অংশগ্রহণের দায়িত্ব ও খরচ তাদের নিজ নিজ জাতীয় ক্রিকেট ও অলিম্পিকস অ্যাসোসিয়েশন, বেসরকারি খাত, সরকার এবং জনগণের ওপর বর্তাবে, যা আশা করা যায় তাদের জাতীয় দলের অলিম্পিকস গৌরবের সন্ধানে একটি অর্থবহ অবদান রাখার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে।
এই টুর্নামেন্টগুলোর বিজয়ীরা ২০২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকসে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়ে আইসিসি অলিম্পিকস বাছাইপর্ব টুর্নামেন্টে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে।”
আগামী বছরের উইমেন’স সুপার৫০ আসরের পরিবর্তে একটি ‘বেস্ট বনাম ডেভলপমেন্ট বেস্ট’ টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। চার দিনের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট ‘দা ওয়েস্ট ইন্ডিজ চ্যাম্পিয়নশিপ’ গত মৌসুমের ১২ ম্যাচের ফরম্যাটেই চলতে থাকবে। প্রতিটি দল একটি প্রতিপক্ষের সঙ্গে তিন ম্যাচের একটি মাত্র দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলবে এবং সম্মিলিত তালিকার শীর্ষ তিনটি দল প্লে-অফে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে।
