এই ৫ উইকেট হাসানের কাছে যে কারণে ‘খুব স্পেশাল’
ব্যাটিংয়ের জন্য সহজ হয়ে ওঠা উইকেটেও রেকর্ড গড়া বোলিংয়ের সাফল্যের গল্প শোনালেন হাসান মাহমুদ।
২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডি ও চেন্নাই। এরপর চলতি বছর ডারউইন ও আবু ধাবি। বিদেশের মাঠে চারবার ৫ উইকেট নিলেও দেশে এই স্বাদ পাওয়া হচ্ছিল না হাসান মাহমুদের। অবশেষে সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে ফুরিয়েছে সেই অপেক্ষা। ঘরের মাঠে এই ৫ উইকেট হাসানের কাছে বিশেষ অর্জন।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৯০ রানে ৬ উইকেট নেন হাসান। ১৯ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তার পঞ্চম ৫ উইকেট। বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ ৫ উইকেটের কীর্তি।
ঘরের মাঠে খেলা আগের সাত ম্যাচে হাসানের রেকর্ড ছিল বড্ড বিবর্ণ। ১৩ ইনিংসে তার শিকার ছিল স্রেফ ১৪ উইকেট। সবশেষ ১০ ইনিংসে উইকেট ছিল মোটে ৫টি। অষ্টম ম্যাচে এসে তিনি খুঁজে পেলেন ছন্দ। নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ, ক্রিজের ব্যবহার আর মুভমেন্ট আদায়র করার পুরস্কার হিসেবে পেলেন দেশে প্রথম ৫ উইকেটের স্বাদ।
দিনের খেলা শেষ সংবাদ সম্মেলনে হাসান তুলে ধরলেন নিজের কাছে এই অর্জনের ওজন।
“ঘরের মাঠে ৫ উইকেট পাওয়া সবসময়ই আমার জন্য খুব স্পেশাল। নিজেদের মাঠে ভালো একটা সুযোগ ছিল, তাই এটা অনেক আনন্দের।”
ম্যাচের প্রথম দিন ২ উইকেটের সঙ্গে দ্বিতীয় দিন আরও ৪টি যোগ করেন হাসান। নতুন বলে পিচ থেকে কিছুটা মুভমেন্ট পেলেও সময়ের সঙ্গে সহজ হয়ে যায় ব্যাটিং। এর মাঝেও ধৈর্য না হারিয়ে বরং লাইন-লেংথে জোর দেওয়ার পুরস্কার পাওয়ার কথাই বললেন হাসান।
“সিলেটের উইকেটে আমরা যখন খেলেছি, মুভমেন্ট থাকে, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে। বেশিরভাগ সময় বোলারদের পক্ষে থাকে উইকেটটা। তবে এই উইকেটটা সম্ভবত খুবই ফ্ল্যাট হয়ে গিয়েছিল প্রথম ১-২ ঘণ্টা পরে। ব্যাটিং সহায়ক ছিল আর কী। তবে আমরা ফাস্ট বোলাররা, লাইন নিয়ন্ত্রণে রেখে ও ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বোলিংয়ের চেষ্টা করেছি।”
দ্বিতীয় নতুন বল নেওয়ার পর চতুর্থ বলেই সেঞ্চুরিয়ান আমির জাঙ্গুকে ফিরিয়ে দেন হাসান। রাউন্ড দা উইকেটে গিয়ে ক্রিজের চমৎকার ব্যবহারে অ্যাঙ্গল তৈরি করে বল ভেতরে ঢোকান ২৭ বছর বয়সী পেসার। তাতেই বিভ্রান্ত হন লম্বা সময় ক্রিজে থাকা জাঙ্গু। বল ছেড়ে দিয়ে অফ স্টাম্প এলোমেলো হতে দেখেন ১৩৩ রান করা ব্যাটসম্যান।
পরের বলে ওভার দা উইকেটে ফিরে তীক্ষ্ণভাবে বল ভেতরে ঢোকান হাসান। এবার সোজা ব্যাটে ডিফেন্ড করার চেষ্টায় পুরোপুরি পরাস্ত রস্টন চেইস। ব্যাটের ভেতরের কানা ছুঁয়ে বল জমা পড়ে লিটন কুমার দাসের গ্লাভসে।
ব্যাটিংয়ের জন্য তুলনামূলক সহজ উইকেটে ভিন্ন কিছু করার পরিকল্পনায় সফল হন হাসান।
“টেস্ট ক্রিকেটে ৫ উইকেট পাওয়া সবগুলোই স্পেশাল। তবে অবশ্যই সব জায়গায় চেষ্টা করি নিজের সেরাটা দেওয়ার এবং দলের জন্য অবদান রাখার। এখানে যে কন্ডিশন ছিল ফাস্ট বোলারদের জন্য শুরুর ১-২ ঘণ্টা খুবই সুবিধা ছিল। সিম মুভমেন্ট ছিল, বলের সুইং ছিল।
“তবে ২ ঘণ্টা পর উইকেট ফ্ল্যাট হয়ে যায়, ব্যাটিং সহায়ক হয়ে যায়। তারপরও আমরা আলাপ করি যে, আমাদের পরিকল্পনা কী থাকবে, প্রক্রিয়া কেমন থাকবে। প্রত্যেকটা বোলারই তাদের সেরাটা দিয়ে দলের জন্য অবদান রাখান চেষ্টা করেছে।”
ভিন্ন কিছু করে উইকেট আদায় করে নেওয়ার কৃতিত্ব ম্যাচের প্রথম দিনও দেখান হাসান। শুরুর ধাক্কা সামলে ততক্ষণে উইকেটে থিতু কেভিন উইকহ্যাম। চমৎকার ব্যাটিংয়ে ফিফটি পূর্ণ করে বড় ইনিংসের সম্ভাবনা জাগান অভিষিক্ত ব্যাটসম্যান।
বল পুরোনো হওয়ার পর তেমন সুবিধা করতে পারছিলেন না বোলাররা। তখন ভিন্ন পথ ধরেন হাসান। টানা কয়েকটি শর্ট বল করে উইকহ্যামকে পেছনের পায়ে ঠেলে দেন তিনি। এরপর হুট করেই ভেতরে ঢোকা একটি লেংথ ডেলিভারিতে বোকা বনে যান তরুণ ব্যাটসম্যান। তাকে বোল্ড করে ১৩১ রানের জুটি ভেঙে দেন হাসান।
এভাবে ব্যাটসম্যানকে সেট-আপ করে উইকেট নেওয়ার তৃপ্তিই শোনা গেল হাসানের কণ্ঠে।
“ছয়টা বলের মধ্যে আমরা চেষ্টা করি যে, ২-৩টা বল করে ব্যাটসম্যান হয়তো চিন্তা করে যে, এই বলটাই আসবে। সেভাবে বোলিং করা হয় এবং যেটা উইকেট টেকিং ডেলিভারি, সেটা একটু ভিন্নভাবে ভিন্ন পরিকল্পনায় বোলিং করা হয়।
“তখন হয়তো ব্যাটসম্যান চিন্তা করে যে, এই বলটা আসবে না বা একটু ফুল লেংথে বল আসবে, খেলতে যাবে এরকম একটা ভাবনা থাকে। হয়তো আউট অফ দা বক্স এটা ব্যাটসম্যান চিন্তা করে না মাঝে মাঝে। ওটা যদি ভালো এক্সিকিউশন হয়, ভালো জায়গায় বল করতে পারি, তখন উইকেট পাওয়া যায়।”
হাসানের রেকর্ড গড়া পঞ্চম উইকেটে বড় কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন লিটন। জাঙ্গু ও সেইসের বিদায়ের পর ক্রিজে গিয়ে হাত খুলে খেলতে শুরু করেন জশুয়া বিশপ। তাকে থামানোর জন্য হাসানের বলে স্টাম্প ঘেঁষে কিপিং শুরু করেন অভিজ্ঞ উইকেটকিপার।
সাফল্য ধরা দেয় দ্রুতই। হাসানের অফ স্টাম্পের বাইরে করা লেংথ ডেলিভারি ড্রাইভ করার চেষ্টায় ব্যাটে লাগাতে পারেননি বিশপ। ভারসাম্যা হারিয়ে উল্টো উঠে যায় তার পেছনের পা। তখন দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় বেলস ফেলে দেন লিটন। বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে স্টাম্পিংয়ে উইকেট পেয়ে যান হাসান।
সেই আউটের পেছনে দলীয় পরিকল্পনার কথাও শোনান হাসান।
“ওই সময় ব্যাটসম্যানটা একটু স্টেপ আউট করে খেলছিল। (লিটন) দাদা আর শান্ত ভাই বলছিল যে, ‘যদি ওপরে কিপিং করে, তাহলে হয়তো ফিট মুভমেন্ট করবে না বা ওর শট খেলা একটু কমে যাবে।’ আমি বলছি যে, ‘দাদা আপনি স্বাচ্ছন্দ্য থাকলে অবশ্যই আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী যাব।’ পরে উনি করেছেন এবং ভালো একটা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়েছে।”
