‘সুপার হিরো’ নাওয়াজের দুর্দান্ত ইনিংসের পরও সোনার পদক ভারতের
এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের ফাইনালে অসাধারণ ইনিংস খেলেও পাকিস্তানকে জেতাতে পারলেন না হাসান নাওয়াজ, সোনার পদক ধরে রাখল ভারত।
ম্যাচের ভাগ্য ততক্ষণে নির্ধারিত হয়েই গেছে। ৩ বলে ২৮ রান করা তো আর সম্ভব নয়! তার পরও হাসান নাওয়াজের ব্যাটে একটি ছক্কা দেখে ধারাভাষ্যে সাঞ্জায় মাঞ্জরেকার বললেন, “আজকে সে সুপার হিরোর মতো ব্যাট করেছে।” খেলা দেখে থাকলে মাঞ্জরেকারের কথার সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ নেই। তবে রূপালি পর্দায় সুপার হিরোরা একই সব করে ফেললেও ক্রিকেটের মাঠে তো সঙ্গীদের কিছু অবদান লাগে! সেখানেই গড়ে উঠল ব্যবধান। একার লড়াইয়ে পেরে উঠলেন না নাওয়াজ। ভারত জিতে গেল পরিষ্কার ব্যবধানেই।
এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের ফাইনালে পাকিস্তানকে ১৯ রানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার সোনার পদক জিতে নিল ভারত।
জাপানের আইচির নিশিনে শনিবার ভারত ২০ ওভারে তোলে ২১১ রান। পাকিস্তানের শুরুটা ভালো না হলেও হাসানের অসাধারণ ইনিংসে অভাবনীয় জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে শেষ পর্যন্ত আটকে যায় ১৯২ রানে।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এই ব্যবধানকে যথেষ্টই বড় বলা যায়। তবে একটা সময় পাকিস্তানের সম্ভাবনাও ছিল প্রবল। ১৬ ওভার শেষে ভারতের রান ছিল ৫ উইকেটে ১৪২, পাকিস্তানের ৪ উইকেটে ১৪৪। ভারতীয় ইনিংসে শেষের সময়টায় বিধ্বংসী হয়ে ওঠেন তিলাক ভার্মা ও শিভাম দুবে। পাকিস্তানের ছিল কেবল নাওয়াজ। তাতে ম্যাচ জমে উঠলেও কাজের কাজ হয়নি।
সাত ছক্কায় ৫১ বলে ৯৬ করে নাওয়াজ আউট হন ম্যাচের শেষ ওভারে।
ভারতের জয়ের ভিত গড়া হয় আভিশেক শার্মার ব্যাটে। সাত ছক্কায় ২৮ বলে ৬১ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। শেষদিকে তিলাক অপরাজিত থাকে ২২ বলে ৫১ রান করে।
এই নিয়ে টি-টোয়েন্টিতে টানা সাত ম্যাচে পাকিস্তানকে হারাল ভারত। এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটের ডাবলও জিতে নিল তারা। নারী ক্রিকেটেও সোনার পদক জিতেছিল ভারত।
টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা ভারতের ঝড়ের শুরু দ্বিতীয় ওভার থেকে। লেগ স্পিনার সাদ মাসুদকে দুটি ছক্কা মারেন বৈভাব সুরিয়াভানশি, ছক্কা ও চার মারেন আভিশেক। ওভার থেকে আসে ২৪ রান।
পরের ওভারের প্রথম বলে সুরিভানশি (৯ বলে ১৫) আউট হয়ে যান সাইম আইয়ুবকে রিভার্স সুইপ করার চেষ্টায়। তিনে নেমে টিকতে পারেননি সাঞ্জু স্যামসনও। তবে আভিশেকের তাণ্ডব চলতে থাকে।
৩.২ ওভারেই ভারত পৌঁছে যায় পঞ্চাশে।
পাওয়ার প্লের শেষ বলে ছক্কায় পঞ্চাশ করে ফেলেন আভিশেকও। ২০ বলে আসে তার ফিফটি।
এই নিয়ে ছয়বার টি-টোয়েন্টিতে পাওয়ার প্লের ভেতরই ফিফটি করলেন তিনি। দুবারের বেশি পারেননি আর কেউ।
আভিশেকের হাত থেকে ভারতের মুক্তি মেলে অষ্টম ওভারে। আরাফাত মিনহাসকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে ছক্কা মারার পর পুনরাবৃত্তির চেষ্টায় স্টাম্পড হয়ে যান তিনি।
ভারত একশ পেরিয়ে যায় ৯ ওভারে।
তবে আভিশেক আউট হওয়ার পর কিছুটা বোঝা যেতে থাকে, উইকেট আসলে এতটা ব্যাটিং স্বর্গ নয়। ২০ রান করতে ১৮ বল খেলেন ইশান কিশান। ভারতীয় অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ার করেন ২৪ বলে ২১।
১১ থেকে ১৬, এই ছয় ওভারে রান আসে মোটে ২৮।
২০০ তো বটেই, ১৮০ রানও তখন মনে হচ্ছিল বেশ দূরের পথ। কিন্তু শেষের টর্নেডোয় আবার চিত্র বদলে দেন তিলাক ভার্মা ও শিভাম দুবে।
চার-ছক্কার স্রোতে শেষ চার ওভারে রান ওঠে ৬৯।
১৫ বলে ২৭ রানে আউট হন দুবে। তিলাক অপরাজিত থাকেন ২২ বলে ৫১ রান করে।
টুর্নামেন্টের আগের ম্যাচগুলোর বাস্তবতা ভাবনায় রাখলে ভারতের ইনিংস শেষেই আসলে খেলার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। পাকিস্তানের ইনিংসের প্রথম ভাগটায়ও সেটিই মনে হচ্ছিল অবধারিত।
অধিনায়ক সাহিবজাদা ফারহান (১১ বলে ১০) পারেননি দলকে ভালো শুরু এনে দিতে। তিনে নেমে টেকেননি উসমান খানও। পাওয়ার প্লে শেষ হতেই বিদায় নেন মাজ সাদাকাত (১৮ বলে ২৩)।
৭ ওভার শেষে পাকিস্তানের রান ৩ উইকেটে ৪২।
সেই অবস্থা আরও নাজুক হতে পারত, যদি আভিশেকের বলে নাওয়াজের ক্যাচ নিতে পারতে সুরিয়াভানশি। জীবন পাওয়ার আগে তার রান ছিল ১০ বলে ৪। কিন্তু বেঁচে যাওয়ার পরের বলেই ছক্কা মেরে পুরো যেন নতুন দম পেয়ে যান ২৪ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান। পরের সময়টায় পুরো উল্টো রূপে আবির্ভুত হন তিনি। তাকে সঙ্গ দেন সাইম আইয়ুব।
ছক্কা ও চার আসতে থাকে প্রতি ওভারেই। ২৮ বলে ফিফটিতে পৌঁছে যান নাওয়াজ।
১৫তম ওভারে আক্রমণে এসে প্রথম বলেই জুটি ভাঙেন দুবে। সাইম আউট হন ২২ বলে ২৯ করে। জুটি থামে ৪৮ বলে ৮৭ করে।
তবে হাসানের ব্যাটে জিইয়ে থাকে পাকিস্তানের আশা। প্রয়োজন ছিল আরেকপ্রান্তেও একজনের ক্যামিও ইনিংস। কিন্তু আব্দুল সামাদ ৯ বলে করতে পারেন স্রেফ ৯। তাতে সমীকরণ হয়ে ওঠে কঠিন। শেষ দিকে সাদ মাসুদ দুটি ছক্কা মারলেও লাভ হয়নি খুব একটা।
হাসানের সামনে হাতছানি ছিল শতরানের। শেষ ওভারে একটি ছক্কা মারলেও শেষ বলে তিনি আউট হয়ে যান। দুর্দান্ত ইনিংসের পরও হতাশায় ব্যাট ছুড়ে ফেলে মাঠ ছাড়েন তিনি। গোটা দল নিয়ে ‘ভিক্টরি ল্যাপ’ দেয় ভারত।
দিনের আগের ম্যাচে বাংলাদেশকে ৬৩ রানে উড়িয়ে ব্রোঞ্জ জিতে নেয় শ্রীলঙ্কা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ভারত: ২০ ওভারে ২১১/৫ (সুরিয়াভানশি ১৫, আভিশেক ৬২, স্যামসন ২, শ্রেয়াস ২১, কিষান ২০, তিলাক ৫১*, দুবে ২৭, আকসার ১*; সাইম ৪-০-৪৭-১, মাসুদ ৩-০-৩৩-০, দানিয়াল ৩-০-৪৩-২, মিনহাস ৩-০-২৫-২, আবরার ৪-০-২৯-১, মকিম ৩-০-৩৩-০)।
পাকিস্তান: ২০ ওভারে ১৯২/৬ (সাহিবজাদা ১০, সাদাকাত ১৮, উসমান ৩, হাসান ৯৬, সাইম ২৯, সামাদ ৯, মাসুদ ১২*; বুমরাহ ৪-০-৩৩-০, আকসার ৪-০-২৯-২, ওয়াশিংটন ৪-০-২৯-২, বিষ্ণই ৩-০-৪৪-০, আভিশেক ২-০-২৩-০, দুবে ৩-০-৩৩-২ )।
