হোবার্ট-সিডনি-ব্রিজবেনে স্পিনের ছবি আঁকার আশায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচের ভেন্যু হোবার্টে স্পিনারদের পারফরম্যান্স দারুণ, অন্য ভেন্যুগুলোতেও স্পিনে সহায়তা মিলবে বলে ধারণা শ্রীরামের।
অ্যালান বোর্ডার মাঠে শুক্রবার দুপুরে অনুশীলন করার কথা ছিল বাংলাদেশ দলের। কিন্তু প্রকৃতির বাগড়ায় ভেস্তে গেছে সেই পরিকল্পনা। বৃষ্টিবন্দি দুপুরে শ্রীধরন শ্রীরাম টিভি পর্দায় চোখ রেখেছিলেন কিনা, কে জানে। তবে আয়ারল্যান্ডের জয় তিনি না দেখে থাকলেও স্কোরবোর্ড দেখে খুশি হয়ে যাবেন নিশ্চিতভাবেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বিদায় করে দেওয়া জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছেন যে একজন স্পিনার!
১৬ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা গ্যারেথ ডেলানি। তার প্রতি শ্রীরামের বাড়তি কোনো টান থাকার কারণ নেই। বাংলাদেশের টেকনিক্যাল কনসালটেন্টের মনের স্বস্তির দোলা ম্যাচের ভেন্যুর কারণে। হোবার্টের এই বেলেরিভ ওভালেই সোমবার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ।
ডেলানির এই পারফরম্যান্সের আগের দিনই ব্রিজবেনে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শ্রীরাম বলে গেছেন, হোবার্টের উইকেটে স্পিনারদের সহায়তা মিলবে কিছুটা হলেও। আগের ম্যাচগুলি দেখেই ধারণা পেয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি আরেকটি ভাবনাও ছিল তার। বাংলাদেশের ম্যাচের আগেই প্রাথমিক পর্বের ৬টি ম্যাচ এখানে হয়ে যাবে। ব্যবহৃত উইকেট একটু মন্থর হওয়ার কথা স্বাভাবিক নিয়মে। উইকেটে ক্ষত হওয়া মানেই তো স্পিনারদের মুখে হাসি!
প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হওয়ার কাছাকাছি ছিল শ্রীলঙ্কা। সেটা হলে স্পিন সহায়ক উইকেটে বাড়তি ফায়দা থাকত না বাংলাদেশের জন্য, বরং শঙ্কার কারণ ছিল যথেষ্ট। কিন্তু প্রতিপক্ষ এখন নেদারল্যান্ডস, স্পিনে তাদের দক্ষতা নিশ্চিতভাবেই লঙ্কানদের চেয়ে কম। সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে স্পিন আক্রমণ তাই ছোবল দেওয়ার অপেক্ষায় থাকতেই পারে।
বেলেরিভ ওভালে এবার স্পিনারদের প্রভাব দেখা গেছে প্রথম ম্যাচ থেকেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে স্কটল্যান্ডের স্মরণীয় জয়ে বাঁহাতি স্পিনার মার্ক ওয়াট ৪ ওভারে স্রেফ ১২ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট। আরেক স্পিনার মাইকেল লিস্ক ২ উইকেট নেন ৪ ওভারে ১৫ রান দিয়ে।
দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে আইরিশ স্পিনার সিমি সিং নেন দুটি উইকেট। তিনি অবশ্য কিছুটা খরুচে ছিলেন। তবে ম্যাচের পরের ভাগে জিম্বাবুয়ের দুই স্পিনার সিকান্দার রাজা ও শন উইলিয়ামস বেশ আঁটসাঁট বোলিং করেন।
সময় গড়ানোর সঙ্গে ক্রমে স্পিন বেশি কার্যকর হওয়ার প্রমাণ মিলেছে এখানে পরের ম্যাচগুলিতে। দ্বিতীয় ম্যাচ ডে-তে প্রথম ম্যাচে স্পিনাররা খুব একটা ভালো করতে পারেননি। তবে পরের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের সিকান্দার রাজা দারুণ বোলিংয়ে ১৯ রানে নেন ৩ উইকেট। শন উইলিয়ামসও যথারীতি ভালো করেন সেদিনও, ক্যারিবিয়ানদের জয়ে অবদান রাখেন বাঁহাতি স্পিনার আকিল হোসেন।
এরপর তো শুক্রবার ডেলানির এই পারফরম্যান্স। দুই ওভার হাত ঘুরিয়ে আইরিশদের জয়ে অবদান রাখেন সিমিও।
সব মিলিয়ে শ্রীরামের ধারণা সত্যি হওয়ার প্রমাণ মিলছে যথেষ্টই। যদিও মূল পর্বে বেলেরিভ ওভালে ভিন্ন ও তরতাজা উইকেটও দেওয়া হতে পারে।
তবে বাংলাদেশ দলের টেকনিক্যাল কনসালটেন্ট কিন্তু শুধু হোবার্ট নিয়েই আশায় বুক বাঁধছেন না। তার দেশ ভারত হলেও কোচিং স্বত্ত্বা নতুন উচ্চতা স্পর্শ করেছে অস্ট্রেলিয়ায়। এই দেশের ক্রিকেট, এখানকার ভেন্যুগুলো সম্পর্কে ধারণা তার যথেষ্টই আছে। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বৈতরণী স্পিনের ভেলায় পার হওয়ার আশা করছেন তিনি অন্যান্য ভেন্যুতেও।
“হোবার্টে মনে হয়, কিছুটা স্পিন ধরবে। কারণ ওখানে এর মধ্যেই বেশ কিছু ম্যাচ হয়ে গেছে। ওখানে গিয়ে আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে। তবে টিভিতে দেখে মনে হচ্ছে, স্পিনে কিছু সহায়তা সেখানে আছে। সিডনি তো ঐতিহ্যগতভাবেই স্পিনারদের কিছুটা সহায়তা করে। আমরা যা শুনতে পাচ্ছি, এক প্রান্তের সীমানা সেখানে বড় থাকবে, আরেকপ্রান্তে তুলনামূলক ছোট। সেখানে গিয়ে বোঝা যাবে আরও ভালো।”
“ব্রিজবেন ঐতিহ্যগতভাবে ব্যাটিংয়ে জন্য ভালো। কিছুটা বাড়তি গতি ও বাউন্স অবশ্য এখানে থাকে। তবে স্কয়ার বাউন্ডারি এখানে বড়, কাজেই স্পিনারদের জন্য তা ভালো। যদি ব্যাক অব লেংথে তারা বল করতে পারে, স্পিনারদের ভূমিকা থাকবে এখানেও।”
গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ এক ভেন্যুতে দুটি ম্যাচ খেলবে কেবল অ্যাডিলেইডে। সেই দুই ম্যাচে প্রতিপক্ষ উপমহাদেশের দুই দল ভারত ও পাকিস্তান। স্পিনে কার্যকারিতার ক্ষেত্রে কেবল তাদের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়েই কিছুটা সংশয়ে শ্রীরাম।
“অ্যাডিলেইডে সোজা বাউন্ডারি অনেকড় বড়, স্কয়ার বাউন্ডারি ছোট। সেখানেও ঐতিহ্যগতভাবে বছরের এই সময়টায় বল একটু গ্রিপ করতে পারে। সেখানে ভারত-পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলা, স্পিনে যারা ভালো দল। সেখানে গিয়ে কন্ডিশন পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।”
শেষ পর্যন্ত উইকেটে স্পিনারদের সহায়তা কতটা থাকবে, তা বোঝা যাবে সময়েই। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ব্যাটিং উইকেটে, এমনকি পেস সহায়ক উইকেটেও স্পিনারদের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা থাকে অনেক সময়ই। উইকেট ও প্রতিপক্ষ অনুযায়ী স্পিনারদের যদি ঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তারা নিজেরা যদি পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে ভূমিকাটুকু ঠিকঠাক পালন করতে পারে, এই সংস্করণে তারা ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন যে কোনো উইকেটেই।
বাংলাদেশের জন্য তাই ক্যানভাস প্রস্তুতই আছে। অপেক্ষা সেখানে কেবল কার্যকারিতার চিত্র ফুটিয়ে তোলার।
