‘বাংলাদেশকে একদিন বিশ্বকাপ জেতানোর স্বপ্ন দেখি’

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া ইয়াসির আলি চৌধুরি কথা বললেন প্রথম বিশ্বকাপ খেলার অনুভূতি, নিজের প্রস্তুতি, প্রত্যাশা আর দায়িত্ব নিয়ে।

আরিফুল ইসলাম রনিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 Sept 2022, 03:30 PM
Updated : 15 Sept 2022, 03:30 PM

দুপুরে মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে অনুশীলন করে বিকেলে ইয়াসির আলি চৌধুরির গন্তব্য চট্টগ্রাম। সামনে দুবাইয়ে ক্যাম্প, এরপর পিঠেপিঠি নিউ জিল্যান্ড সফর ও অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্বকাপ অভিযান। লম্বা সফরের আগে পরিজনদের সঙ্গে খানিকটা সময় কাটাতে ছুটছেন তিনি নিজ শহরে। যাওয়ার আগে বিডিনিউজ টোয়েনন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া ব্যাটসম্যান শোনালেন প্রথমবার বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়ার অনুভূতি। ২৬ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান কথা বললেন নিজের প্রস্তুতি, তার কাছে দলের প্রত্যাশা, দায়িত্ব ও আরও অনেক কিছু নিয়ে। 

অভিনন্দন, প্রথমবার বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেলেন। আপনাকে দলে রাখা হবে বলে শোনা যাচ্ছিল কিছুদিন ধরেই। আপনার নিজের আশা ছিল?

ইয়াসির আলি চৌধুরি: ধন্যবাদ। সত্যি বলতে, আশা ছিল। বিশেষ করে, মুশফিক ভাই অবসর নেওয়ায় একটা জায়গা তো ফাঁকা হয়েছিল। এ কারণে আশা বেড়েছিল। আগেও তিন ফরম্যাটে ছিলাম জাতীয় দলে। টি-টোয়েন্টি খেলেছি বাংলাদেশের হয়ে। সব মিলিয়ে আশা ছিল ভালোভাবেই। টেনশনও যে ছিল না, তা নয়!

কখন জানতে পারলেন যে দলে ঠাঁই হয়েছে?

ইয়াসির: দল ঘোষণার পরই আসলে জেনেছি। তার আগে জানতে পারিনি। প্র্যাকটিস শেষে বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিয়েছিলাম। চোখের পাতা লেগে এসেছিল কিছুটা। তখন বাবার ফোন পেলাম। উনি দল ঘোষণা দেখে আমাকে ফোন করেন, “নির্বাচকরা তোর নাম বলেছে, তুই আছিস দলে…।”

ঠিক ওই সময়ের অনুভূতি কেমন ছিল?

ইয়াসির: কিছুটা ঘুমের ঘোরে ছিলাম। বললাম, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে… আলহামদুলিল্লাহ…।” খুব বেশি কিছু তখন আসলে মনে হয়নি। স্বস্তি অবশ্যই ছিল।

২০১৯ বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের স্কোয়াডে আপনি ছিলেন। প্রথম ট্রফি জয়ের অংশ হয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ দলে সেবার ছিলেন না, আয়ারল্যান্ড থেকে দেশে ফিরতে হয়েছিল। কেমন লেগেছিল তখন?

ইয়াসির: ট্রফি জিততে পারাটা অবশ্যই দারুণ ছিল। দেশের প্রথম কোনো ট্রফি জয়। তবে ফিরে আসার সময় খারাপ লাগছিল খুব… স্বাভাবিকভাবেই খারাপ লাগার কথা। মনে হচ্ছিল, যদি বিশ্বকাপে যেতে পারতাম!

বিশ্বকাপ মানে অনেক বড় অভিজ্ঞতা। দেখতে পারতাম, অনেক কিছু শিখতে পারতাম। অনেক কিছুই মনে হচ্ছিল। বিশ্বকাপের মতো একটা জায়গা… জীবনে তো সুযোগ সবসময়ই আসে না।

এবার ভিন্ন সংস্করণে হলেও বিশ্বকাপ খেলতে পারছেন অবশেষে…

ইয়াসির: ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল বিশ্বকাপ খেলার। স্বপ্ন দেখতাম, বাংলাদেশকে একসময় বিশ্বকাপ জেতাব। বিশ্বকাপ ঘিরে একটা আবেগ, চাওয়া তো সবসময়ই ছিল। দেখতাম অনেকে খেলছে… ইচ্ছা করত সবসময়ই।

বিশ্বকাপ তো খেলতে যাচ্ছেন, বিশ্বকাপ জেতানোর স্বপ্ন কবে পূরণ হবে?

ইয়াসির: ইনশাল্লাহ, যখন ভালো খেলা শুরু করব, ভালো খেলতে খেলতে হয়ে যাবে।

মাত্রই তো জটিল একটা চোট থেকে সেরে উঠলেন, কি অবস্থা শরীরের?

ইয়াসির: ইনজুরি এখন পুরোপুরি ঠিক হয়ে গেছে। ভালো আছি। কোনো অস্বস্তি বা অসুবিধা নেই। ডিস্কের ইনজুরি, একটু জটিলই। বিশ্রাম নিতে নিতে এটা ঠিক হয়। একটু অপ্রস্তুত অবস্থায় খুলনায় ম্যাচ খেলতে গিয়েই আসলে বেড়ে গিয়েছিল ব্যথা। এখন ঠিক আছে।

এই ইনজুরির ধরন এরকম যে সবসময় সতর্ক থাকতেই হবে। কারণ আবার ফিরে আসতে পারে। তবে আপাতত ভয় নেই। স্রেফ মেইনটেইন করতে হবে।

টেকনিক্যাল কনসালটেন্ট শ্রীধরন শ্রীরামের সঙ্গে কথা হয়েছে আলাদা করে কোনো?

ইয়াসির: বিশেষ কিছু হয়নি ওইভাবে। আলাদা করেও তেমন কিছু হয়নি। সেই সময় তো আসলে ছিল না। প্র্যাকটিসের মধ্যেই যতটুকু হয়েছে।

একটা কথা তিনি বলেছেন যে, ‘তোমার শক্তি আছে। তুমি শুধু মাথা ঠাণ্ডা রেখে বল দেখবে আর মারবে। বাজে শট নয়, শট সিলেকশন ঠিক করবে। আর সবসময় মাথায় রাখবে, যেটা মারবে সেটা যেন উপযুক্ত ভ্যালু পায়। ব্যস।’ এর বেশি আর তেমন কিছু বলেননি। ইতিবাচক কথাই বলেছেন।

শ্রীরাম সংবাদ সম্মেলনেও আপনার ‘পাওয়ার’-এর কথা বলেছেন আলাদা করে। বাংলাদেশে যে জায়গাটায় ঘাটতি, সেখানে আপনি কাজে লাগতে পারেন বলে তার ধারণা। নানা সময়ে আপনার হাতের জোর দেখা গেছে ঘরোয়া ক্রিকেটেও। এটা কি সহজাত নাকি কাজ করেন জোর বাড়াতে?

ইয়াসির: কিছু কাজ তো করতেই হয়। ছেলেবেলায় কিন্তু আমি ছয় মারতে পারতাম না। আস্তে আস্তে শিখেছি। কাজ করতে করতে বেড়েছে জোর। আগে খেলতাম, তখন এক ধরনের গতির বোলারদের খেলতাম। এখন তো টপ লেভেলের বোলারদের খেলতে হয়। ওদের জন্য কিছু কাজ করতেই হয়।

বড় শটের জন্য ব্যাটিংয়ের বেইজ ও ব্যালান্স তো খুবই গুরুত্বর্পূ। শট খেলার সময় শরীরের শেইপ যাতে ঠিক থাকে, এটা নিয়ে বিশেষ কোনো কাজ করেন?

ইয়াসির: আমি জানি যে, যদি বেইজ ও ব্যালান্স ঠিক রাখতে পারি, আমি মারলে সেটা ছয় হবেই। আমি এটাকে সিম্পল হিসেবেই দেখি, বেইজটা ঠিক রেখে মেরে দাও!

তবে এই সিম্পল জিনিসটা আয়ত্ত করা সহজ নয়। এটাই অনেক অনুশীলন করতে হয়।

শ্রীরাম সংবাদ সম্মেলনে বলছিলেন, মাহমুদউল্লাহর বিকল্প হিসেবে যে দু-একজনকে তিনি ভাবছেন, তার মধ্যে আপনিও আছেন। আলাদা করে আপনার কথা বলেছেন তিনি। দলে সুযোগ পাওয়া যেমন বড় ব্যাপার, এই দায়িত্বটা তো একটা চাপও। মাহমুদউল্লাহর জায়গায় আপনি কেমন করেন, সবাই তাকিয়ে থাকবে তা দেখার জন্য!

ইয়াসির: অবশ্যই এটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। কারণ, রিয়াদ ভাইয়ের জায়গা নেওয়া… সবাই জানে, উনি কী করেছেন দেশের জন্য। উনার জায়গাটা পূরণ করা অবশ্যই বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সহজ নয় মোটেও। উনি যে স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে দিয়ে গেছেন, ওটা আমাকে ধরে রাখতে হবে এবং আরও ভালো করতে হবে, নতুন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।

এটা আমার মাথায়ও আছে। কঠিন অবশ্যই। তবে চাপ বলে মনে করি না। দেশের হয়ে ক্রিকেট খেললে এসব চ্যালেঞ্জ নিয়েই খেলতে হবে।

এই চ্যালেঞ্জ সামলানোর স্কিলের দিক তো আছেই। মানসিকভাবে আপনি কতটা তৈরি?

ইয়াসির: মানসিকভাবে তৈরি থাকা তো একটা চলমান ব্যাপার। আমার ক্ষেত্রে ইনজুরিটার সময় একটা পজিটিভ ব্যাপার হয়েছে যে মেন্টাল স্কিল নিয়ে কাজ করতে পেরেছি। নিজের কাছে মনে হচ্ছে, খুব ভালো অবস্থায় আছি আমি।

মেন্টাল স্কিল নিয়ে কাজ করেছেন কি কোনো বিশেষজ্ঞের সঙ্গে নাকি নিজের মতো করে?

ইয়াসির: নিজেই নিজেই করেছি…। খুব বিশেষ কিছু না। নিজের মতো করে ভাবা, একটু বোঝাপড়া। প্রচুর খেলা দেখেছি, বোঝার চেষ্টা করেছি। এই তো… এশিয়া কাপের খেলা, কত কত ক্রিকেট হচ্ছে, টি-টায়েন্টি হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়া-নিউ জিল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজ হলো, চেষ্টা করেছি ওসব দেখে নিজেকে তৈরি করার। কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হয় না করতে হয়, এসব নিয়ে ভাবা আর কী…।

অনেক বড় দায়িত্ব হয়তো আপনার ওপর পড়ছে, কঠিন জায়গায় ব্যাট করতে হবে, কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। কিন্তু আপনার অভিজ্ঞতা স্রেফ ১টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির। অভিজ্ঞতার ঘাটতি একটা বড় ব্যাপার। আপনি কীভাবে পুষিয়ে দিতে চান?

ইয়াসির: অবশ্যই অভিজ্ঞতা একটা বড় ব্যাপার। আমার ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার ভালো যে, আমি বিপিএলে অনেক ম্যাচ খেলেছি, পারফর্ম করেছি। আমার আত্মবিশ্বাস তাই আছে যে এই পজিশনে ও নানা পরিস্থিতিতে কীভাবে কি করতে হবে। আশা করি তা কাজে লাগাতে পারব। আর প্রতিটি ম্যাচেই তো শিখব অনেক। সেসবও কাজে লাগানোর চেষ্টা করব।

বিপিএলে আপনার গড়, স্ট্রাইক রেট, ধারাবাহিকতা, বাংলাদেশের বাস্তবতায় বলতে হবে দারুণ। বিপিএল থেকে আপনি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন বা শিখেছেন কোন দিকটা?

ইয়াসির: অনেক কিছুই শিখেছি। তবে একটা কথা বলতে পারি, যখন মুশি ভাইয়ের (মুশফিকুর রহিম) সঙ্গে খেলতাম, ব্যাটিংয়ের সময় তিনি কাজটা অনেক সহজ করে দিতেন। বুঝিয়ে দিতে অনেক কিছু। খেলার সময়ও অনেক কিছু শিখতাম তার কাছ থেকে।

বিপিএলে তিন মৌসুমে উনার দলে খেলেছি। ব্যাটিং পজিশনের কারণে জুটি হয়েছে বেশ কিছু। উনার সঙ্গে ব্যাটিং করতে করতে আমি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অনেক কিছু শিখেছি।

জাতীয় দলে আসার আগে আপনি বাংলাদেশ ইমার্জিং দলে, ‘এ’ দলে বেশ কিছু ম্যাচ খেলেছেন। পারফর্মও করেছেন। বাইরের এই ম্যাচগুলি এত খেলে জাতীয় দলের আসার ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেটে খুব বেশি হয়নি। আপনাকে এটা কতটা সহায়তা করেছে বা করছে?

ইয়াসির: ‘এ’ দলে যখন খেলেছি, অনেকটা আন্তর্জাতিক পর্যায়েরই ক্রিকেট হয়। বেশ কাছাকাছি মানেরই থাকে। একটা ‘এ’ দলের একাদশে ৫-৬-৭ জন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার থাকেন। ওদের সঙ্গে ড্রেসিং রুমে থাকা, তাদের বিপক্ষে খেলা, ওই আবহে থাকা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ফ্লেভারটা বোঝা যায়।

সবচেয়ে ভালো হলো, স্ট্যান্ডার্ডটা বোঝা যায় যে, আমি কোন পর্যায়ে আছি এবং কোথায় কাজ করতে হবে।

এছাড়াও যে প্রায় এক-দেড় বছর জাতীয় দলের সঙ্গে ছিলাম, কিন্তু খেলতে পারিনি, ওই সময়টাও কাজে লেগেছে। মাঠে গিয়েছি, কাজ করেছি, ফিল্ডিং করেছি কখনও কখনও, তখন অন্তত মাঠের ভেতরে কী হয়, কেমন আবহ থাকে, কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে সাড়া দিতে হয়, চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছি, যা এখন আমাকে সহায়তা করছে।

সুযোগ পেতে অনেক অপেক্ষার কথা বললেন। এখন আবার উল্টো চিত্র। খুব বেশি ম্যাচ আপনি খেলেননি, ৫ টেস্ট, ৬ ওয়ানডে আর ১ টি-টোয়েন্টি মোটে। কিন্তু সব সংস্করণেই আপনার ওপর অনেক ভরসা রাখা হচ্ছে। ওয়ানডেতে তো বটেই, টি-টোয়েন্টিতেও বড় দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। আপনি এটা কীভাবে নিচ্ছেন?

ইয়াসির: একটা কথা আছে না, স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে রক্ষা করা কঠিন! আমি এভাবেই দেখছি, জায়গা ধরে রাখা অনেক বেশি কঠিন। সেটির জন্যই প্রস্তুত হচ্ছি। আমার ওপর যেহেতু আস্থা রাখা হচ্ছে, এটা একটা বড় দায়িত্বেরও ব্যাপার। সবার আস্থার প্রতিদান দেওয়াটা আমার দায়িত্ব।

এটা একটা চাপ আছে বটে। তবে সেই চাপকে উপভোগ করতে চাই। আমার ওপর দলের যেহেতু ভরসা আছে, এখন স্রেফ মন খুলে খেলতে চাই।

এবার বিশ্বকাপে লক্ষ্য কি থাকবে?

ইয়াসির: বড় কোনো লক্ষ্য ঠিক করছি না। ম্যাচ বাই ম্যাচ এগোতে চাই, পরিস্থিতির দাবি যেমন থাকবে, সেরকম খেলতে পারলেই আমি খুশি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক