ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৪৯ রানে আটকে রাখল বাংলাদেশ
পছন্দের সংস্করণ আসতেই যেন বদলে গেল গোটা দল। টেস্ট-টি-টোয়েন্টিতে ম্রিয়মান বাংলাদেশ ওয়ানডে আসতেই টগবগ। মাঠে নিজেদের মেলে ধরার তাগিদ, প্রতিপক্ষকে চেপে ধরার তাড়না আর শরীরী ভাষায় আগুন। শরিফুল ইসলাম, নাসুম আহমেদ, মেহেদী হাসান মিরাজদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ করতে পারল না দেড়শ রানও।
তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ করতে পেরেছে ৯ উইকেটে ১৪৯ রান।
বৃষ্টিতে সোয়া দুই ঘণ্টা দেরিতে সকালের বৃষ্টিতে মাঠ ভেজা থাকায় সোয়া দুই ঘণ্টা দেরিতে শুরু হওয়া ম্যাচ নেমে আসে ৪১ ওভারে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ নবম উইকেট হারায় ৩৪তম ওভারেই। শেষ জুটির সৌজন্যে তারা খেলতে পারে শেষ পর্যন্ত। ৩৯ রানের মূল্যবান জুটিতে দলকে কিছুটা লড়ার রানও এনে দেয় এই জুটি।
উইকেট বেশ মন্থর। বল গ্রিপ করেছে উইকেটে, ব্যাটে এসেছে ধীরে। বাউন্সও ছিল একটু অসমান। তা কাজে লাগান বাংলাদেশের বোলাররা।
দলের সফলতম বোলার শরিফুল ইসলাম। ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে তরুণ বাঁহাতি পেসার নেন ৩৪ রানে ৪ উইকেট। বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ে মিরাজ নেন ৩ উইকেট।
তবে আলাদা করে বলতে হবে নাসুমের কথা। অভিষেকে উইকেট পাননি তিনি। তবে ৮ ওভার বোলিংয়ে রান দিয়েছেন স্রেফ ১৬টি।
টস জিতে বোলিংয়ে নেমে অভিষিক্ত নাসুমকে দিয়েই বোলিং শুরু করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক তামিম ইকবাল। বাংলাদেশের হয়ে এই প্রথম অভিষিক্ত কোনো স্পিনার করলেন ইনিংসের প্রথম ওভার। বিশ্ব ক্রিকেটেই এই নজির আছে আর কেবল দুটি।
গায়ানায় কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে উইকেট ছিল ঢাকা। আর্দ্রতা থাকা উইকেটে দারুণ শুরু করেন বাংলাদেশের বোলাররা। নাসুমের আঁটসাঁট প্রথম ওভারের পর দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই বড় সাফল্য। মুস্তাফিজুর রহমানের ভেতরে ঢোকা বলে বোল্ড শেই হোপ!
বাংলদেশের বিপক্ষে সবশেষ ৬টি ওয়ানডেতে হোপের ছিল টানা তিন সেঞ্চুরি ও তিনটি ৭০ ছোঁয়া ইনিংস। সেই হোপ এবার ‘গোল্ডেন ডাক।’
পরের ওভারে উইকেট পেতে পারতেন নাসুমও। তার বলে শামার ব্রুকসকে এলবিডব্লিউ দেন আম্পায়ার। ব্রুকস নেন রিভিউ। আল্ট্রা এজ-এ প্রজুর স্পাইক ধরা পড়ে, মূলত ব্যাট ব্যাটসম্যানের প্যাডে লাগায়। বল ব্যাটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ই স্পাইক ফুটে ওঠে। তবে সেটা বল ব্যাটে লাগার নাকি ব্যাট প্যাডে লাগার, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না খালি চোখে। তৃতীয় আম্পায়ার অবশ্য নিশ্চিত ছিলেন, তিনি ‘নট আউট’ ঘোষণা করে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের তাতে বিস্মিত দেখা যায়, অধিনায়ক তামিম বেশ উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা বলেন দুই আম্পায়ারের সঙ্গে।
ব্রুকস তখন টিকে যান। কিন্তু আরেক পাশে কাইল মেয়ার্সকে দারুণ এক ডেলিভারিতে বোল্ড করে দেন মিরাজ। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশকে ভোগানো মেয়ার্স এখানে করতে পারেন ২৭ বলে ১০।
এই নিয়ে মুখোমুখি ৮ লড়াইয়ে ৫ বারই মেয়ার্সকে আউট করলেন মিরাজ।
আরেক প্রান্তে নাসুমের প্রায় নিখুঁত লাইন-লেংথে রান তোলার সুযোগই পায়নি ক্যারিবিয়ানরা। প্রথম দুই স্পেল শেষে তার বোলিং ফিগার ছিল অবিশ্বাস্য, ৬-৩-৪-০!
৩২ রানে ২ উইকেট হারানো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন ব্রুকস ও ব্র্যান্ডন কিং। ১৯তম ওভারে দলের রান স্পর্শ করে পঞ্চাশ।
স্পিনারদের তৈরি করা চাপের সুফল পান পেসার শরিফুল। রানের জন্য হাঁসফাঁস করে উড়িয়ে মারার চেষ্টায় আউট হন কিং। ৩১ বল খেলে তিনি করতে পারেন মোটে ৮ রান।
পরের বলে আগ্রাসী শট খেলার চেষ্টায় বিদায় নেন ব্রুকসও। বেশ বাইরের বলে ব্যাট চালিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন লম্বা সময় উইকেটে থাকা ব্যাটসম্যান। ৩৩ রান করতে তিনি বল খেলেন ৬৬টি।
এই সময়টায় রানের গতিও থমকে যায় অনেকটা। ষষ্ঠ ওভারের পর আরেকটি বাউন্ডারি আসে ২৪তম ওভারে! মিরাজকে রিভার্স সুইপে বাউন্ডারি মারেন নিকোলাস পুরান। পরে নাসুমকে দুটি বাউন্ডারি মেরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক আভাস দেন পাল্টা আক্রমণের। তবে তাকে জমে উঠতে দেননি মিরাজ। জোরের ওপর করা ডেলিভারিতে স্টাম্প ছেড়ে খেলতে গিয়ে পুরান বোল্ড ১৮ রানে।
মিরাজ এর আগেই ফিরিয়ে দেন বিপজ্জনক রভমান পাওয়েলকে। এরপর রোমারিও শেফার্ড, আকিল হোসেনরা ছিলেন, যাদের সামর্থ্য ছিল দ্রুত রান তোলার। কিন্তু এ দিন তাদেরকেও দাঁড়াতে দেয়নি বাংলাদেশ।
মিরাজের সরাসরি থ্রো থামায় আকিল হোসেনকে। শরিফুল এক ওভারেই ফেরান শেফার্ড ও গুডাকেশ মোটিকে।
এরপর একটু এলোমেলো দেখা যায় বাংলাদেশকে। এই সুযোগে কিছু রান যোগ করে ক্যারিবিয়ানদের শেষ জুটি। মুস্তাফিজ ক্যাচ ছাড়েন নিজের বলে। পরে মুস্তাফিজের বলে ক্যাচ ছাড়েন আফিফ হোসেন। শরিফুলের ৫ উইকেট ফসকে যায় মাহমুদউল্লাহ ক্যাচ ছাড়ায়। এমনকি রান আউটের সুযোগও হাতছাড়া নয়।
দশে নামা অ্যান্ডারসন ফিলিপ শেষ ওভারে একটি ছক্কাসহ অপরাজিত থাকেন ২১ রান করে। তার লিস্ট ‘এ’ ক্যারিয়ারে যা সর্বোচ্চ। জেডেন সিলসের (১৬*) সঙ্গে তার ৩৯ রানের জুটিই দলের সর্বোচ্চ জুটি!
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৪১ ওভারে ১৪৯/৯ (হোপ ০, মেয়ার্স ১০, ব্রুকস ৩৩, কিং ৮, পুরান ১৮, পাওয়েল ৯, শেফার্ড ১৫, আকিল ৩, মোটি ৭, ফিলিপ ১৯*, সিলস ১৬*; নাসুম ৮-৩-১৬-০, মুস্তাফিজ ৮-০-৩৪-১, মিরাজ ৯-২-৩৬-৩, তাসকিন ৮-০-২৬-০, শরিফুল ৮-১-৩৪-৪)।
