দুটি ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্ত, ইংল্যান্ডকে বাগে পেয়েও পারল না বাংলাদেশ
ছোট পুঁজি নিয়ে দারুণ বোলিংয়ে সম্ভাবনা জাগাল বাংলাদেশ, কিন্তু টিভি আম্পায়ারের দুটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পক্ষে না পাওয়া এবং পরের দিকের আলগা বোলিংয়ে হেরে গেল তারা।
ইংল্যান্ডের ষষ্ঠ উইকেটের পতন হলো যখন, তখনও প্রয়োজন ৭৬ রান। ম্যাচ অনেকটাই হেলে বাংলাদেশের দিকে। তবে পরের সময়টায় তাদের আলগা বোলিংয়ে মুঠো থেকে ছুটে গেল লাগাম। টিভি আম্পায়ারের দুটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তে দুইবার বেঁচে গিয়ে ইংল্যান্ডকে জেতালেন হিদার নাইট।
উইমেন’স ওয়ানডে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিতেছে ৪ উইকেটে।
গুয়াহাটিতে মঙ্গলবার স্রেফ ১৭৮ রানের পুঁজি নিয়ে শুরু থেকে দারুণ বোলিংয়ে সম্ভাবনা জাগায় বাংলাদেশ। ৩০তম ওভারে ইংল্যান্ডের রান ছিল ৬ উইকেটে ১৩০। এরপর আর পেরে ওঠেনি বাংলাদেশ। সপ্তম উইকেটে নাইট ও চার্লি ডিনের অবিচ্ছিন্ন ৭৯ রানের পুঁজিতে ইংল্যান্ড জিতে যায় ২৩ বল বাকি থাকতে।
১০১ বলে অপরাজিত ৭৯ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচ-সেরার স্বীকৃতি পান নাইট।
সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনায় টিভি আম্পায়ারের দুটি সিদ্ধান্ত। শূন্য রানে নাইটকে কট বিহাইন্ডের আবেদনে আউট দিয়েছিলেন মাঠের আম্পায়ার। তৃতীয় আম্পায়ার সেই সিদ্ধান্ত বদলে দেন যথেষ্ট প্রমাণ না পাওয়ায়। আরেবার ১৩ রানে থাকা নাইটের ক্যাচ দারুণ ক্ষিপ্রতায় মুঠোয় জমিয়েছিলেন ফিল্ডার স্বর্ণা আক্তার। আগেরবারের মতো এবারও একই কারণে ‘নট আউট’ ঘোষণা করেন টিভি আম্পায়ার ভারতের গায়াত্রী ভেনুগোপালান।
উইকেট ছিল এদিন কিছুটা মন্থর। ব্যাটিং করা খুব একটা সহজ ছিল না। সোবহানা মোস্তারির পঞ্চাশোর্ধ ইনিংস (১০৮ বলে ৬০) ও রাবেয়া খানের ক্যামিওতে (২৭ বলে ৪৩) লড়ার মতো পুঁজি পায় বাংলাদেশ।
পাকিস্তানকে ৭ উইকেটে হারিয়ে আসর শুরু করা ম্যাচে প্রথম ওভারে দুর্দান্ত দুটি ডেলিভারিতে দুই উইকেট নেওয়া মারুফা আক্তার এবারও আঘাত হানেন প্রথম ওভারেই। এই পেসার আবারও চমৎকার ইনসুইঙ্গারে এলবিডব্লিউ করে ফেরান অ্যামি জোন্সকে।
দ্বিতীয় ওভারে ফিরতে পারতেন আরেক ওপেনার ট্যামি বাউমন্টও, কিন্তু নাহিদা আক্তারের বলে তুলনামূলক সহজ ক্যাচ ফেলেন মারুফা।
মারুফার পরের ওভারে নাইটকে কট বিহাইন্ডের আবেদনে আঙুল তুলে দেন আম্পায়ার। ব্যাটার রিভিউ নেওয়ার পর দেখা যায়, বল আগে তার প্যাডে লেগেছিল, তবে এরপর আবার ব্যাটে লেগেছিল কি না, তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না। ‘ইনকনক্লুসিভ’ বলে মাঠের আম্পায়ারকে সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বলেন টিভি আম্পায়ার। অসন্তুষ্ট বাংলাদেশ অধিনায়ক নিগার সুলতানাকে কথা বলতে দেখা যায় আম্পায়ারদের সঙ্গে।
বাউমন্ট বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। মারুফা নিজের চতুর্থ ওভারে আরেকটি দারুণ ইনসুইঙ্গারে এলবিডব্লিউ করে দেন এই ব্যাটারকে।
এই মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৬৯ রানে গুটিয়ে ১০ উইকেটের জয়ে আসর শুরু করা ইংল্যান্ড এবার ২৯ রানের মধ্যে হারিয়ে ফেলে দুই ওপেনারকে।
সেই স্কোর হয়ে যেতে পারত ৩ উইকেটে ৩০। মারুফার ওই ওভারে নাইটকে এলবিডব্লিউ দিয়েছিলেন আম্পায়ার। তবে ব্যাটার রিভিউ নেওয়ার পর দেখা যায়, বল স্টাম্প মিস করে যেত। নাইট ও ন্যাট সিভার-ব্রান্ট এরপর এগিয়ে নেন দলকে।
পঞ্চদশ ওভারে আসে আরেকটি বিতর্কিত মুহূর্ত। স্পিনার ফাহিমা খাতুনের বল এক্সট্রা কাভারে খেলেন নাইট, ক্ষিপ্রতায় ছুটে এসে নিচু ক্যাচ মুঠোয় জমান স্বর্ণা আক্তার। ড্রেসিংরুমের পথে অনেকটা হেঁটে চলে যান নাইট। নতুন ব্যাটারও চলে আসেন মাঠে।
কিন্তু টিভি আম্পায়ার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে বেশ কয়েকবার রিপ্লে দেখে, যথেষ্ট প্রমাণ না পাওয়ায় আউট দেননি। এবার আরও বেশি হতাশ দেখা যায় নিগারকে, আবারও তাকে আলোচনা করতে দেখা যায় আম্পায়ারদের সঙ্গে।
একটু পর ফাহিমা একই ওভারে ফিরিয়ে দেন সিভার-ব্রান্ট ও সোফিয়া ডাঙ্কলিকে। খানিক পর তিনি এমা ল্যাম্বকেও বিদায় করে দিলে ইংল্যান্ডের স্কোর হয়ে যায় ৫ উইকেটে ৭৮।
অ্যালিস ক্যাপসিকে নিয়ে দলের একশ পার করেন নাইট। আসরে প্রথম সুযোগ পাওয়া বাঁহাতি স্পিনার সানজিদা আক্তার মেঘলার বলে ক্যাপসি এলবিডব্লিউ হলে ম্যাচ চলে যায় বাংলাদেশের মুঠোয়।
কিন্তু ইংল্যান্ডের ওপর চাপটা ধরে রাখতে পারেননি বাংলাদেশের বোলাররা। নাইট ফিফটি করেন ৮৬ বলে। শেষ পর্যন্ত দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নেমেছিল টস হেরে। তৃতীয় ওভারে লরেন বেলকে তিনটি চার মারেন শারমিন আক্তার। প্রথম ম্যাচে অভিষেকে অপরাজিত ফিফটিতে দলকে জেতানো রুবাইয়া হায়দার এবার টিকতে পারেননি। বেলকে বেরিয়ে এসে খেলার চেষ্টায় সহজ ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি পঞ্চম ওভারে। অধিনায়ক নিগার পরের ওভারে সহজ ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন শূন্য রানে।
থিতু হয়ে ইনিংস বড় করতে পারেননি শারমিন। ৩০ রান করতে তিনি খেলেন ৫২ বল। এরপর নিয়মিত উইকেট হারাতে থাকে বাংলাদেশ। স্বর্ণা, রিতু মনি, ফাহিমা, নাহিদা কেউ ভালো করতে পারেননি।
আরেক প্রান্ত আগলে রেখে দলকে টানেন সোবহানা। ৩১তম ওভারে সোবহানার পরপর দুটি চারের আগে টানা ৬১ বলে কোনো বাউন্ডারি পায়নি বাংলাদেশ।
সোবহানা ফিফটি করেন ৯২ বলে। বিশ্বকাপে পঞ্চাশ ছোঁয়া ইনিংস খেলা বাংলাদেশের চতুর্থ ব্যাটার তিনি। ৪৩ ওভারে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭ উইকেটে ১৩০।
রানের গতি বাড়ে মূলত রাবেয়া ব্যাটিংয়ে নামার পর। প্রথম বলে চার মেরে শুরু করেন তিনি, এক বল পর আরেকটি। এরপর দুটি চার মারেন লিন্সে স্মিথের তিন বলের মধ্যে।
৪৭তম ওভারে শেষ হয় সোবহানার ৬০ রানের ইনিংস। শেষ ওভারে রাবেয়ার চার ও ছক্কায় ১৭৮ পর্যন্ত যেতে পারে বাংলাদেশ।
ইংল্যান্ডের চার স্পিনার মিলে নেন ৯ উইকেট।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এর আগে একটি ওয়ানডে ও চারটি টি-টোয়েন্টি খেলে সবকটিতে হেরেছিল বাংলাদেশ। এবার জয়ের দারুণ সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত পারল না তারা, সঙ্গী হলো আরেকটি পরাজয়।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ: ৪৯.৪ ওভারে ১৭৮ (রুবাইয়া ৪, শারমিন ৩০, নিগার ০, সোবহানা ৬০, স্বর্ণা ১০, রিতু ৫, ফাহিমা ৭, নাহিদা ১, রাবেয়া ৪৩*, সানজিদা ১; বেল ৭-১-২৮-১, স্মিথ ৯.৪-১-৩৩-২, সিভার-ব্রান্ট ৫-০-৩২-০, ডিন ১০-২-২৮-২, ক্যাপসি ৮-১-৩১-২)
ইংল্যান্ড: ৪৬.১ ওভারে ১৮২/৬ (বাউমন্ট ১৩, জোন্স ১, নাইট ৭৯*, সিভার-ব্রান্ট ৩২, ডাঙ্কলি ০, ল্যাম্প ১, ক্যাপসি ২০, ডিন ২৭*; মারুফা ৫-০-২৮-২, নাহিদা ৮-১-৩৪-০, সানজিদা ৭-০-২৪-১, রাবেয়া ৭-১-৩৯-০, ফাহিমা ১০-২-১৬-৩, স্বর্ণা ৭-০-৩৩-০, রিতু ২-১-৩-০, সোবহানা ০.১-৪-০)
ফল: ইংল্যান্ড ৪ উইকেটে জয়ী
প্লেয়ার অব দা ম্যাচ: হিদার নাইট
