Published : 25 Sep 2025, 06:43 PM
এক পাশে দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে দলকে লড়াইয়ে রাখছিলেন সাইফ হাসান। আরেকপাশে একটু একটু করে সম্ভাবনার মৃত্যু হচ্ছিল একের পর এক বিদায়ে। আগের ম্যাচে জয়ের নায়ক এবারও লড়ে গেলেন বুক চিতিয়ে। কিন্তু সঙ্গী পেলেন না একজনও। দুর্দান্ত-বোলিং ফিল্ডিংয়ে ভারতকে বাগে পেয়েও ব্যাটিং ব্যর্থতায় শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধানেই হেরে গেল বাংলাদেশ।
এশিয়া কাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বাংলাদেশকে ৪১ রানে হারাল ভারত। সুপার ফোর পর্বে টানা দুই জয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা পৌঁছে গেল টুর্নামেন্টের ফাইনালে।
ভারতের জয়ে নিশ্চিত হয়ে গেল শ্রীলঙ্কার বিদায়। বাংলাদেশ বৃহস্পতিবারই মুখোমুখি হবে পাকিস্তানের। দুবাইয়ে ম্যাচটি কার্যত সেমি-ফাইনাল। এই ম্যাচে জয়ী দল জায়গা করে নেবে ট্রফির লড়াইয়ে।
দুবাইয়ে বুধবার চোটের কারণে খেলতে পারেননি অধিনায়ক লিটন কুমার দাস। টানা দুই দিন খেলা থাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচকেই আসল লড়াই ধরে হয়তো এ দিন একাদশে মোট চারটি পরিবর্তন আনে বাংলাদেশ। নেতৃত্বের অভিষেকে টস জিতে বোলিং নেন জাকের আলি।
ভারতের ইনিংসে ছিল দুটি অধ্যায়। আভিশেক শার্মার আরেকটি বিধ্বংসী ব্যাটিং প্রদর্শনীতে প্রথম ১১ ওভারে তারা তোলে ১১২ রান। ৬ চার ও ৫ ছক্কায় ৩৭ বলে ৭৫ রানের ইনিংস খেলেন আভিশেক।
তবে শেষ ৯ ওভারে ভারত করতে পারে স্রেফ ৫৬ রান।
বোলারদের দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সেই লড়াইকে ধারণ করতে পারেননি সাইফ ছাড়া বাংলাদেশের অন্য ব্যাটসম্যানরা। ১৬৯ রান তাড়ায় তাদের ইনিংস শেষ হয় ১২৭ রানেই।
আগের ম্যাচে ৬১ রান করা সাইফ এবার ৫ ছক্কায় করেন ৫১ বলে ৬৯।
তিনি আর পারভেজ হোসেন ইমন (২১) ছাড়া দলের আর কোনো ব্যাটসম্যান স্পর্শ করতে পারেননি দুঅঙ্ক।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা ভারতের পাওয়ার প্লেতে পরিস্কার ছিল দুটি ভাগ। প্রথম তিন ওভারে বাউন্ডারি আসে মোটে একটি, রান ওঠে কেবল ১৭। পরের তিন ওভারে রান আসে ৫৫!
নাসুম আহমেদের বলে শুবমান গিলের চার ও ছক্কায় ভারতের আগ্রাসনের শুরু। অভিশেকের রান তখনও স্রেফ আট বলে আট। নাসুমের ওই ওভারেই ছক্কা মেরে জেগে ওঠেন তিনিও। বাঁহাতি ওপেনার পরের ওভারে দুটি ছক্কায় উড়িয়ে দেন মুস্তাফিজুর রহমানকে, চারটি চার মারেন সাইফ উদ্দিনের এক ওভারে।
পাওয়ার প্লে শেষে রিশাদ হোসেনকে বাউন্ডারিতে স্বাগত জানান গিল। তবে ওই ওভারেই তাকে (১৯ বলে ২৯) ফিরিয়ে বাংলাদেশকে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন এই লেগ স্পিনারই।
রিশাদ পরের ওভারে ফিরিয়ে দেন তিনে প্রমোশন পাওয়া শিভাম দুবেকে (৩ বলে ২)। আরেকপ্রান্ত থেকে আঁটসাঁট দুই ওভারে সাইফ হাসান দেন মাত্র সাত রান।
তবে আভিষেক ছুটছিলেন আপন গতিতে। রিশাদকে ছক্কার পর সাইফ উদ্দিনকে তার ছক্কা ও চারে ১১ ওভার শেষে ১১২ রান হয়ে যায় ভারতের।
এরপরই ইনিংসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। পয়েন্টে রিশাদের অসাধারণ ফিল্ডিং ও দুর্দান্ত থ্রোয়ে রান আউট হন অভিশেক।
এরপর ভারতকে প্রবলভাবেই চেপে ধরে বাংলাদেশ। মুস্তাফিজের ওই ওভারেই উইকেটের পেছনে ধরা পড়েন ভারতীয় অধিনায়ক সুরিয়াকুমার ইয়াদাভ। এই উইকেটে সাকিব আল হাসানকে (১৪৯) ছাড়িয়ে এই সংস্করণে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হয়ে যান অভিজ্ঞ পেসার (১৫০)।
প্রথম স্পেলে দারুণ বোলিং করেও উইকেটশূন্য থাকা তানজিম হাসান দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে বিদায় করেন তিলাক ভার্মাকে (৭ বলে ৫)।
ডানহাতি-বাঁহাতি ভারসাম্য ভাবনায় রেখেই হয়তো তখনও সাঞ্জু স্যামসনকে না নামিয়ে আকসার প্যাটেলকে ক্রিজে পাঠায় ভারত। তবে সেখান থেকে শেষ বলের আগে কোনো উইকেট না হারিয়েও প্রত্যাশিত ঝড় তুলতে পারেনি তারা। নিয়ন্ত্রিত বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে হার্দিক পান্ডিয়া ও আকসার অনেকটাই দমিয়ে রাখে বাংলাদেশ।
শেষ পাঁচ ওভারে মাত্র ৩৬ রান তুলতে পারে ভারত।
রান যতটুকু উঠেছে, মূলত পান্ডিয়ার ব্যাটেই। শেষ বলে সীমানায় ধরা পড়া অলরাউন্ডার করেন ২৯ বলে ৩৮। ১৫ বল খেলে মাত্র ১০ রানে অপরাজিত থাকেন আকসার।
বড় পুঁজি গড়তে না পারা ভারতকে শুরুতে উইকেট এনে দেন জাসপ্রিত বুমরাহ। আগের ম্যাচে খরুচে বোলিং করে তেতে থাকা পেসার দ্রুতই ফিরিয়ে দেন তানজিদ হাসানকে (১)।
লিটনের বদলে একাদশে ফিরে তিনে নামা পারভেজ হোসেন ইমন শুরুতে বুমরাহ সুইঙ্গিং ডেলিভারিগুলোয় ব্যাট ছোঁয়াতেই পারছিলেন না। প্রথম রানের দেখা পান তিনি অষ্টম বলে। পরে অবশ্য বুমরাহর একটি লেংথ বল পেয়ে তিনি দারুণ শটে উড়িয়ে দেন গ্যালারিতে।
সাইফও ততক্ষণে ছন্দ পেতে শুরু করেছেন। ভারুন চক্রবর্তীর ওভারে দুজন মিলে মারেন তিনটি বাউন্ডারি। ৬ ওভারে ৪৪ রান তোলে বাংলাদেশ।
পাওয়ার প্লে শেষে আক্রমণে এসে পারভেজকে (১৯ বলে ২১) বিদায় করেন কুলদিপ।
৪২ রানের এই বন্ধন ভাঙার পর আর কোনো ভালো জুটি পায়নি বাংলাদেশ। আর কোনো ব্যাটসম্যান পারেননি দু অঙ্ক ছুঁতে।
আকসারকে উড়িয়ে সীমানায় ধরা পড়েন হৃদয়। ভারুনকে জায়গা বানিয়ে খেলার চেষ্টায় শূন্যতেই বোল্ড শামীম হোসেন। প্রতিপক্ষ অধিনায়কের সরাসরি থ্রোয়ে রান আউট হয়ে যান বাংলাদেশ অধিনায়ক জাকের।
কাদশে সুযোগ পেয়ে কাজে লাগাতে পারেননি মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন। কুলদিপ ইয়াদাভের টানা দুই বলে বিদায় নেন রিশাদ হোসেন ও তানজিম হাসান।
সাইফ একপাশ থেকে চেষ্টা করে যান। চারটি ছক্কা মারেন তিন আকসারকে, একটি ভারুনকে। ৪০ রানে আকসারকেই ফিরতি ক্যাচ দিয়ে রক্ষা পেয়ে ফিফটি করেন ৩৬ বলে।
পরে জীবন পান তিনি ৬৫, ৬৬ ও ৬৭ রানেও। শেষ পর্যন্ত আকসারের দারুণ ক্যাচে ৬৯ রানে থামে তার লড়াই। নিশ্চিত হয়ে যায় দলের বড় হার।
এই ম্যাচের পর ফিরে আসছে সংযুক্ত আরব আমিরাতেই ২০১৮ এশিয়া কাপের স্মৃতি। সেবারও ভারত আগেই নিশ্চিত করে ফেলেছিল ফাইনাল। সুপার ফোর পর্বে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ম্যাচ কার্যত হয়ে গিয়েছিল সেমি-ফাইনাল। সেই লড়াইয়ে জিতে ফাইনালে পা রেখেছিল মাশরাফি বিন মুর্তজার দল। পুনরাবৃত্তির অপেক্ষায় এবার লিটনের দল।
স্কোর:
ভারত: ২০ ওভারে ১৬৮/৬ (আভিশেক ৭৫, গিল ২৯, দুবে ২, সুরিয়াকুমার ৫, পান্ডিয়া ৩৮, তিলাক ৫, আকসার ১০*; তানজিম ৪-০-২৯-১, নাসুম ৪-০-৩৪-০, মুস্তাফিজ ৪-০-৩৩-১, সাইফ উদ্দিন ৩-০-৩৭-১, রিশাদ ৩-০-২৭-২, সাইফ হাসান ২-০-৭-০)।
বাংলাদেশ: ১৯.৩ ওভারে ১২৭ (সাইফ হাসান ৬৯, তানজিদ ১, পারভেজ ২১, হৃদয় ৭, শামীম ০, জাকের ৪, সাইফ উদ্দিন ৪, রিশাদ ২, তানজিম ০, নাসুম ৪*, মুস্তাফিজ ৬; পান্ডিয়া ২-০-১৪-০, বুমরাহ ৪-০-১৮-২, ভারুন ৪-০-২৯-২, কুলদিপ ৪-০-১৮-৩, আকসার ৪-০-৩৭-১ দুবে ১-০-১০-০, তিলাক ০.৩-০-১-১ )
ফল: ভারত ৪১ রানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: আভিশেক শার্মা।