প্রথম দিনেই চার সেঞ্চুরিতে ৫০৬, ইংল্যান্ডের অবিশ্বাস্য রেকর্ড

উইকেট ব্যাটিংবান্ধব, পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণও অনভিজ্ঞ, তবু ইংল্যান্ডের কীর্তি টেস্ট ইতিহাসে অনন্য।

স্পোর্টস ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 Dec 2022, 03:21 PM
Updated : 1 Dec 2022, 03:21 PM

২৪ ঘণ্টা আগেও অনিশ্চয়তায় ঘেরা ছিল ম্যাচের ভাগ্য। অসুস্থতার হিড়িকে একাদশ সাজানো নিয়েই অনিশ্চয়তায় পড়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। শেষ পর্যন্ত সব শঙ্কা উড়িয়ে মাঠে নেমে তারা মেতে উঠল রান উৎসবে। ব্যাটিং তাণ্ডবে পাকিস্তানের বোলিং তুলাধুনা করে রানের জোয়ার বইয়ে দিয়ে ইংলিশরা গড়ল বিশ্বরেকর্ড।   

এক দিনেই চার-চারটি সেঞ্চুরি, স্রেফ ৭৫ ওভারেই পাঁচশর বেশি রান। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ও বেন স্টোকস জমানায় আগ্রাসী টেস্ট ব্যাটিংয়ের যে ধারা শুরু করেছে ইংল্যান্ড, সেটিই এবার পৌঁছে গেল চোখধাঁধানো নতুন উচ্চতায়।

রাওয়ালপিন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নিষ্প্রাণ উইকেটে প্রথম টেস্টের প্রথম দিন পাকিস্তানের অনভিজ্ঞ বোলিং আক্রমণ গুঁড়িয়ে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের চূড়ান্ত রূপই যেন দেখাল। বৃহস্পতিবার ৭৫ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে তাদের রান ৫০৬!

ওভারপ্রতি রান তোলার হার ৬.৭৪। আলোকস্বল্পতার কারণে ১৫ ওভার খেলা হয়নি এ দিন। পুরো খেলা হলো স্কোর কোথায় গিয়ে ঠেকত, কে জানে!

পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণে সবচেয়ে বেশি ১৩ টেস্ট খেলেছেন ১৯ বছর বয়সী নাসিম শাহ। প্রথম দিন বোলিং করা বাকি পাঁচজনের মধ্যে চার জনের অভিষেক ম্যাচ এটি। উইকেটও ব্যাটিং স্বর্গ। তবু সবকিছু মাথায় রেখেও ইংল্যান্ডের এমন কীর্তি টেস্ট ইতিহাসে অনন্য।

টেস্ট ক্রিকেটের ১৪৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবার ম্যাচের প্রথম দিনে ৫০০ ছুঁতে পারল কোনো দল। সেই  ১৯১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিডনি টেস্টে প্রথম দিন ৪৯৪ রান করে অস্ট্রেলিয়া।

সব মিলিয়ে এক দিনে সর্বোচ্চ রানের তালিকায় এটি রয়েছে পাঁচ নম্বরে। ১৯৩৬ সালে ভারতের বিপক্ষে ম্যানচেস্টার টেস্টের দ্বিতীয় দিন ৫৮৮ রান করেছিল ইংল্যান্ড। এছাড়া আরও দুইবার এক দিনের পাঁচশর বেশি রান করেছে তারা। শ্রীলঙ্কা এ কৃতিত্ব দেখিয়েছে একবার।

টেস্টের প্রথম দিনে চার সেঞ্চুরির কীর্তিও ইতিহাসে প্রথম। এছাড়াও রেকর্ড হয় আরও বেশ কিছু।

উইকেটের চরিত্র ধরতে পেরে টস জিতে ব্যাটিং নিতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি স্টোকস। অভিষেক হয় উইল জ্যাকস ও লিয়াম লিভিংস্টোনের। পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় একাদশে নেই নিয়মিত কিপার-ব্যাটসম্যান বেন ফোকস। এ দায়িত্ব পালন করবেন অলি পোপ।

দিনের প্রথম ওভারেই নাসিম শাহকে তিন চারে ১৪ রান নেন ক্রলি। ওভারের দ্বিতীয় বলটি ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে স্লিপ কর্ডন দিয়ে বেরিয়ে যায়। পরের ওভারের প্রথম বলে বাউন্ডারি দিয়ে রানের খাতা খোলেন প্রায় ছয় বছর পর টেস্ট খেলতে নামা বেন ডাকেট।

শুরুর এই আগ্রাসী মানসিকতা বাকি সময়টায়ও ধরে রাখেন ইংল্যান্ডের দুই ওপেনার। লাঞ্চ বিরতির আগে ২৭ ওভারে ১৭৪ রান করে ফেলেন তারা।

টেস্টের প্রথম দিন প্রথম দিন প্রথম সেশনে এই রান ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

ক্রলি ফিফটি করেন ৩৮ বলে, ডাকেটের লাগে ঠিক ৫০ বল। অল্পের জন্য প্রথম দিনের প্রথম সেশনে সেঞ্চুরির দারুণ কীর্তি গড়া হয়নি ক্রলির। ৯১ রানে লাঞ্চে যান তিনি।

দ্বিতীয় সেশনে ফিরে দ্বিতীয় ওভারেই সেঞ্চুরি পেয়ে যান ক্রলি। ১৯ চারে ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি করতে খেলেন ৮৬ বল। ওপেন করতে নেমে ইংল্যান্ডের ইতিহাসের দ্রুততম শতরান এটি।

ডাকেট ১৪ চারে ১০৫ বলে করেন নিজের প্রথম সেঞ্চুরি। ইনিংসের ৩১তম ওভারে দুইশ পেরিয়ে যায় ইংল্যান্ড।

সেঞ্চুরির পর বেশি দূর যেতে পারেননি দুই ওপেনারের কেউই। অভিষিক্ত লেগ স্পিনার জাহিদ মাহমুদের ৩৬তম ওভারে বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন ডাকেট (১১০ বলে ১০৭)। আম্পায়ার প্রথমে আউট দেননি। রিভিউ নিয়ে ২৩৩ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙে পাকিস্তান।

পরের ওভারে হারিস রউফের বলে বোল্ড হন ক্রলি (১১১ বলে ১২২)। এরপর জো রুটের ধীরস্থির ব্যাটিংয়ে ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় রান রেট কিছুটা কমে। তৃতীয় উইকেটে অলি পোপ ও রুটের ৫১ রানের জুটি হয় ৫৫ বলে। সুইপ খেলতে গিয়ে জাহিদের দ্বিতীয় শিকার হয়ে ২৩ রান করে ফেরেন রুট।

চতুর্থ উইকেটে আবার পাকিস্তানি বোলারদের ওপর চড়াও হন পোপ ও হ্যারি ব্রুক। ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি করার পর সৌদ শাকিলের করা ৬৭তম ওভারে ছয় বলের প্রতিটিতে চার মারেন ব্রুক। এর আগেই ইনিংসের তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে তিন অঙ্ক ছুঁয়ে ফেলেন পোপ।

ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরিকে অবশ্য বড় করতে পারেননি ডানহাতি এ ব্যাটসম্যান। অভিষিক্ত মোহাম্মদ আলির বলে এলবিডব্লিউ হন পোপ (১০৪ বলে ১০৮)।

এবারও আউট দেননি আম্পায়ার। রিভিউ নিয়ে উইকেট আদায় করে নেয় পাকিস্তান। পোপের বিদায়ে ভাঙে ১৪৯ বলে ১৭৬ রানের চতুর্থ উইকেট জুটি।

এরপর উইকেটে গিয়ে টি-টোয়েন্টির ব্যাটিং শুরু করেন স্টোকস। অন্য প্রান্তে ১৪ চার ও ২ ছয়ে স্রেফ ৮০ বলে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি করেন ব্রুক। ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এর চেয়ে কম বলে সেঞ্চুরি আছে কেবল গিলবার্ট জেসপ (৭৬) ও জনি বেয়ারস্টোর (৭৭)। 

আলোকস্বল্পতার কারণে ১৫ ওভার বাকি থাকতে বন্ধ হয়ে যায় প্রথম দিনের খেলা। মোহাম্মদ আলির করা দিনের শেষ ওভারটিতে ৩ চার ও ১ ছয়ে ১৮ রান তুলে ইংল্যান্ডকে পাঁচশ পার করান স্টোকস। অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ২৫ বলে ৪৪ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিন খেলতে নামবেন স্টোকস ও ব্রুক।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

ইংল্যান্ড: ৭৫ ওভারে ৫০৬/৪ (ক্রলি ১২২, ডাকেট ১০৭, পোপ ১০৮, রুট ২৩, ব্রুক ১০১*, স্টোকস ৩৪*; নাসিম ১৫-০-৯৬-০, আলি ১৭-১-৯৬-১, হারিস ১৩-১-৭৮-১, জাহিদ ২৩-১-১৬০-২, সালমান ৫-০-৩৮-০, শাকিল ২-০-৩০-০)

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক