এত সাহস কী করে হয়! জুলাই অভ্যুত্থানে উত্তর পেয়েছেন আসিফ নজরুল
"আমি এ সমস্ত মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষকে দেখতাম আর ভাবতাম, মানুষের এত সাহস কীভাবে হয়? মরে যাব–এটা জেনে মানুষ কীভাবে যায়?
মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস নিয়ে মনে উঁকি দেওয়া প্রশ্নের উত্তর জুলাই অভ্যুত্থানে খুঁজে পাওয়ার কথা বলেছেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
তিনি বলেছেন, অভ্যুত্থানে তরুণরা ‘মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও’ অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়ার সংকল্প নিয়ে ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের পতন ঘটিয়েছে।
বুধবার রাজধানীর বসুন্ধরায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক সংলাপ অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের এই অধ্যাপক।
জুলাই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এনএসইউর সেন্টার ফর পিস স্টাডিস এবং জার্মানির আর্নল্ড বের্গস্ট্রেসার ইনস্টিটিউট (এবিআই) আয়োজিত এ সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে অংশ নেন আইন উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, "আমি যখন স্টুডেন্ট ছিলাম, আমি সাপ্তাহিক বিচিত্রার রিপোর্টার ছিলাম, ফুল টাইম সাংবাদিক। আমার কাছে অনেক মুক্তিযোদ্ধারা আসতেন। তারা গল্প বলতেন, আমি খুব মুগ্ধ হয়ে তাদের গল্প শুনতাম। একটা যুদ্ধ করতে যাচ্ছে, পাকিস্তানি একটা ক্যাম্পে আক্রমণ করবে, তাদের কাছে মান্ধাতার আমলের অস্ত্র। তাদের ভালো অস্ত্র দেওয়া হয়নি। আর পাকিস্তানেরদের কাছে সর্বাধুনিক অস্ত্র। বাট তারা উঁচু জায়গাতে, আর তারা নিচু জায়গাতে।
“তারা গেল, সেখানে যাওয়ার পরে যখন আসছে তখন চারজন বন্ধুর লাশ নিয়ে ফেরত আসছে। আমার খুব অবাক লাগত, এত সাহস কীভাবে হয়?”
আসিফ নজরুল বলেন, "তারপর ফারুকী আজম ভাই, তিনি আমাদের এখন মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী, তিনি কিন্তু বীরবিক্রম। উনাদের একটা অপারেশন ছিল 'অপারেশন জ্যাকপট'। একটা অবিশ্বাস্য অভিযান। আপনারা এই বইটা পইড়েন অপারেশন জ্যাকপট–একটা বই আছে। উনারা ছিল নৌবাহিনীর সদস্য, উনারা কোনো ডুবুরি ছিল না; কোনো ইকুইপমেন্ট ছিল না। চিত সাঁতার কেটে বুকে মাইন বেঁধে পাকিস্তানিদের জাহাজে সেই মাইন বসিয়ে দিয়ে আসত।
“পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম নৌযোদ্ধা আছে কিনা আমার সন্দেহ আছে, আমি কোথাও পড়ি নাই, শুনি নাই। আমি ফারুকী আযম ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই আপনাদের কোনো ভয় ছিল না? বলে, হ্যাঁ আমরা যে কোনো সময় মরে যেতে পারি, মাইন বিস্ফোরোণে মরে যেতে পারি, ডুবে মরে যেতে পারি, আমাদের দেখলেই মেরে ফেলবে।”
তখনকার ভাবনা তুলে ধরে আইন উপদেষ্টা বলেন, "আমি এ সমস্ত মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষকে দেখতাম আর ভাবতাম, মানুষের এত সাহস কীভাবে হয়? মরে যাব–এটা জেনে মানুষ কীভাবে যায়?
“সেটার কিছুটা অ্যান্সার আমি দেখলাম, অনেকটা দেখলাম আমি জুলাই অভ্যুত্থানকালে। আমাদের যে ইয়াং জেনারেশন আছে, তারা মৃত্যু নিশ্চিত জেনে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়ার সংকল্প নিয়ে কীভাবে একজন ফ্যাসিস্ট শাসকের পতন ঘটিয়েছে এবং তাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে।"
সেই অকুতোভয় তরুণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, "আমাদের যে জেনারেশন জি আছে, ইয়াং জেনারেশন যারা আছে, তাদের শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি। আমি সব সময় বলি আমরা বৃদ্ধরা ব্যর্থ হয়েছি, তারা আমাদের জন্য একটা বিজয় নিয়ে এসেছে। এটা কতবড় বীরত্ব!”
রংপুরের শহীদ আবু সাঈদ ‘মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও’ পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল মন্তব্য করে উপদেষ্টা বলেন, "আমরা যখন রংপুরে গেলাম, আবু সাঈদের যে ফুটেজটা আছে, আমাদের শহিদুল আলম ভাই আছে এখানে। তিনি আবু সাঈদকে কীভাবে মারা হয়েছে, প্রত্যেকটা গ্রাফিক ডিটেইল দেখিয়েছে। এবং আপনারা ওটা দেখলে নিশ্চিত হবেন যে আবু সাঈদ জানত সে মারা যেতে পারে। কারণ সে প্রস্তুত ছিল। সে জোহা স্যারের স্ট্যাটাস শেয়ার করত, সে আন্দোলনে প্রথম থেকেই ছিল। এবং রেডি ছিল, কোনোরকম অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ না, একদম রেডি ছিল।”
আবু সাঈদ মানুষকে ‘প্রেরণা দিতেই’ বুক পেতে মৃত্যুকে বরণ করেছেন মন্তব্য করে আসিফ নজরুল বলেন, “এই ভিডিও ফুটেজ দেখে এর কিছুক্ষণ পর শহীদ ওয়াসিমরা শহীদ হয়েছে। তারপর বাংলাদেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্ররা ব্রুটালিটির ফুটেজ প্রতিদিন রাতে দেখত, কীভাবে হত্যা করছে, তারপরও যেত।
“মাকে চিঠি লিখে গেছে, যাচ্ছি প্রাণ দিতে, নিশ্চয় মনে আছে আপনাদের। বন্ধুর ডেড বডি পড়ে আছে, জানছে, সে তারপরও যুদ্ধ করছে। আপনাদের আর কোনো কিছু দরকার নাই, পুলিশের কমেন্টটা মনে আছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলছে, ‘গুলি করি, একটা মরে, বাকিরা সরে না।’ কত বড় সাহস, মৃত্যু নিশ্চিত জেনে প্রতিবাদ করে!”
উপদেষ্টা বলেন, “আমার তখন মনে হয়, যখন চিন্তা করি যে এত সাহস মানুষ কখন পায়? যখন একটা দেশে চরম চরম চরমতম অন্যায় হয়। তখন মনে হয়, মানুষ হিসাবে এই শাসকের আমলে আমার বেঁচে থাকার কোনো দরকার নাই। তখন মৃত্যু ভয়কে জয় করে আমরা তাকে হটানোর চেষ্টা করি। এত ক্ষুব্ধ, এত ক্ষুব্ধ, এত ডেসপারেট, এত মরিয়া হয়ে যায়।"
শেখ হাসিনা ‘লুটপাট, খুন, গুম ও ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েম করার পাশাপাশি সামাজিক সম্পর্কগুলো ‘নষ্ট করে দিয়েছিলেন’ বলে অভিযোগ করেন আসিফ নজরুল।
তিনি বলেন, "আমার ছোটবেলার বন্ধু, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব হওয়ার পর আমাকে ফোন করে বলেছে, তুই আর আমার এই ফোনে ফোন করিস না, খুব বেশি দরকার হলে তোর ভাবির ফোনে ফোন করিস। আমাকে তার মেয়ের বিয়েতে দাওয়াত দেয়নি, আমি ছোটবেলায় কোলে নিয়ে আদর করতাম। আমাদের সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করে দিয়েছে। কত বড় দুশ্চরিত্র শাসক, কত বড় ভয়াবহ শাসক। তার ভয়ে বন্ধু বন্ধুকে ভুলে গেছে, পরিবার পরিবারকে দাওয়াত দিতে ভয় পেত। বন্ধু বন্ধুর সাথে সম্পর্ক রাখত না।"
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ের প্রতি গত সরকারের আচরণের কথা মনে করিয়ে দিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, "আরেকটা সর্বনাশ করেছে, আমাদের পুরো জাতির মূল্যবোধে প্রচণ্ড আঘাত করেছে। আপনি চিন্তা করতে পারেন? বেগম খালেদা জিয়া এত বড় একজন রেস্পেক্টেড লিডার, উনি মারা যাবেন এরকম একটা অবস্থা, আমরা যে কোনোদিন শুনব উনি মারা যাবেন–এরকম কয়েকবার হয়েছে। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, তার চেয়ে বয়সেও বড়, বলে, ‘এইতো শুনি মরে মরে, মরে তো না।’
"সেটা শুনে আবার যারা অডিয়েন্স, তারা হাততালিও দেয়। কী ধরনের একটা অমানুষ প্রজন্ম সে তৈরি করেছিল, সোশ্যাল নর্মস ভেঙে দিয়েছিল। এ কথা সোনার পর ধিক্কার দেওয়ার বদলে মানুষ হাততালি দেয়। এই সর্বনাশগুলি আমরা চোখে দেখি না৷"
আওয়ামী লীগ সরকার পনেরো বছরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ‘সর্বনাশ করেছে’ বলে অভিযোগ করেন আসিফ নজরুল।
তিনি বলেন, “একটাতে পেল ফোর পয়েন্ট সেভেন, একটাতে পেল ফোর পয়েন্ট থ্রি। আমি বলি, তুমি পাস করলা কেমনে সেটাই তো বুঝতাছি না। সে কানতে কানতে বলে, আমিতো এভাবেই পড়ে এসছি। তার মানে সে মেট্রিক ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছে সেভাবে।
"কত বড় বদমাইশ মহিলা, নিজের জেনারেশনে যত মানুষ আছে, সবাইকে বিদেশে পড়াইছে, বিদেশে বিয়ে দিছে, বিদেশে সেটেল করাইছে। আর বাংলাদেশের মানুষ যেন পড়াশোনা করতে না পারে, বোর্ড অফিসগুলোকে ইন্সট্রাকশন দিয়ে দিত সবাইকে পাস করাতে হবে। সবাইকে মিনিমাম এই রেজাল্ট দিতে হবে, যারা ভালো করে খাতা দেখত, তাদের চাকরি খাওয়া হয়েছে৷ কেন করেছে এটা বলেন আপনারা? তাদের মধ্যবিত্তের সন্তানরা আমাদের নিম্নবিত্তের সন্তানরা যেন পড়াশুনা বলে কিছু না জানে। একটা জাতিকে শেষ করার জন্য তার এডুকেশন সিস্টেম শেষ করে দিয়েছে।"
এনএসইউ উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হান্নান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে এনএসইউর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের প্রতিষ্ঠাতা আজীবন সদস্য এ কে কাশেম, ইউরোপীয় ইউনিয়নের শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বের্ন্ড স্প্যানিয়ার, শহীদ তানভীরের মা দিলকুশ জামান, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের চেয়ারম্যান এম জাসিম উদ্দিন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মাহাদী আমিন ও এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, এনডিএম নেতা ববি হাজ্জাজ বক্তব্য রাখেন।
