১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

জকসু ভোট স্থগিতের পর যা যা হলো

“এবার ভাবছিলাম আমরা শেষ বয়সে এসে ভোটটা অন্তত দিয়ে যেতে পারব; কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে—সে আশাটা পূর্ণ হবে না।”

বিডিনিউজ২৪

অনুপম মল্লিক আদিত্য, আরফাতুল ইসলাম নাইম

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Dec 2025, 02:18 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:27 PM

প্রতিষ্ঠার দুই দশক বাদে প্রথম যখন শিক্ষার্থী সংসদের নির্বাচন আয়োজন করল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, তার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জীবনাবসান হওয়ায় ভোটগ্রহণ আর হলো না।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডেকে ভোট স্থগিত করেছে। বলেছে, ভোটের নতুন দিন শিগগিরই জানানো হবে। তবে সেই সিদ্ধান্ত মানতে চাননি প্রার্থীসহ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। 

তারা উপাচার্য ভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখিছেন, ক্ষোভ ঝেরেছেন ফেইসবুকে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সদস্য কানিজ ফাতেমা কাকলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত দ্বারা পরিচালিত। যেহেতু সিন্ডিকেটে নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেক্ষেত্রে জকসু নির্বাচন আপাতত স্থগিত।”

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত জকসু ভোট হওয়ার কথা ছিলই। এদিনই ভোর ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মারা যান।

এ খবরে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট জরুরি সভা করে ভোট স্থগিত করে।

তার আগেই ভোট দিতে আসা শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সব প্যানেল শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তা ডেস্কও বসিয়েছিল।

ক্ষোভ-বিক্ষোভ

ভোট স্থগিতের খবর ছড়াতেই বেলা সাড়ে ৯টার দিকে ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ ও ছাত্রশিবির-আপ বাংলাদেশ-ইনকিলাব মঞ্চ সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল উপাচার্য ভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করে। পরে অন্য শিক্ষার্থীরাও এসে তাতে শামিল হয়।

সেখানে ‘জকসু আমার অধিকার, রুখে দেয়ার সাধ্য কার’, ‘জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘সিন্ডিকেটের গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে’, ‘ভিসির গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে’সহ নানা স্লোগান দেওয়া হয়।

পরে পৌনে ১০টার দিকে উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে কয়েকজন ভিপি প্রার্থী। এসময় উপাচার্য ভবনের চারপাশে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা।

তারা বলছিলেন, ভোট ‘আজকেই’ হতে হবে। না হলে সরবেন না।

প্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা যা বলছেন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে মোট চারটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ভোট স্থগিতের খবরে সব প্যানেলের প্রার্থীরা উপাচার্য ভবনের সামনে বিক্ষোভ দেখান।

ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী এ কে এম রাকিব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা কড়া ভাষায় প্রশাসনকে জানিয়ে দিয়েছি জকসু ভোট আজকেই অনুষ্ঠিত হতে হবে। আর নির্বাচন কমিশন যদি তা আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের পদত্যাগের ঘোষণা দিতে হবে।”

ইসলামী ছাত্রশিবির জবি শাখার সভাপতি ও জকসুর ভিপি পদপ্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম ফেইসবুকে লিখেছেন, “শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত। আজকেই জকসু দিতে হবে।”

বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর প্যানেল ‘মওলানা ভাসানী ব্রিগেড’র জিএস পদপ্রার্থী ইভান তাহসীব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জকসু ভোট আজকেই নিতে হবে। প্রশাসনের কোনো ধরনের তালবাহানা আমরা মেনে নিব না। 

“নির্বাচন কমিশন কীভাবে ভোট নেবে, সেটা তারাই ভালো জানে; তবে আমাদের কথা হলো ভোট আজকেই হতে হবে।”

২০০৫ সালে কলেজ থেকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫’ এ ছাত্র সংসদ সম্পর্কিত কোনো ধারা না থাকায় প্রতিষ্ঠার পর একবারও জকসু নির্বাচন হয়নি।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আইন বিভাগের শিক্ষার্থী তাহসিনা রউফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এত বছর পর একটা ভোট হচ্ছে; শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দ আছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে এ নির্বাচন স্থগিত করেছে। আমরা সেটা কখনো মানবো না।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জাভেরিয়া খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক কোনো নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য অনেক খুশি ছিলাম। কিন্তু ক্যাম্পাসে আসার পর জানতে পারি যে, নির্বাচন স্থগিত হয়েছে। 

“আর কবে অনুষ্ঠিত হবে, সেটাও জানি না। আসলে জকসুতে ভোট দেওয়ার আক্ষেপটা মুছল না।”

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্নাতকোত্তর পড়ুয়া অভিজিৎ বাড়ৈ বলেন, “২০১৯ সাল থেকে আমরা জকসু হবে, হচ্ছে—শুনতেছি। এবার ভাবছিলাম আমরা শেষ বয়সে এসে ভোটটা অন্তত দিয়ে যেতে পারব। 

“কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে—সে আশাটা পূর্ণ হবে না।”

কী বলছে প্রশাসন

শিক্ষার্থী ও প্রার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবারই সিন্ডিকেট ডেকে ভোটগ্রহণের সম্ভাবনা আছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে নির্বাচন কমিশনার কানিজ ফাতেমা কাকলী দুপুরে বলেন, “যেকোনো নির্বাচন সেটা ছোট হোক কিংবা বড়, একবার স্থগিত হলে সেটা ওইদিনই পুনরায় আয়োজন করার বিধান নেই। 

“আর সিন্ডিকেটে পুনরায় ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত হলেও আজকে আর তা সম্ভব হবে না। তাছাড়া বেলা গড়ানোর কারণে পুনরায় ভোট গ্রহণের সম্ভাবনা নেই। সকালে যত সংখ্যক ভোটার ছিল, এখন তার অর্ধেকও ক্যাম্পাসে নেই। শুধুমাত্র দলীয় নেতা-কর্মীরাই বিক্ষোভ ও আন্দোলন করছে।”

এর আগে ২০০৫ সালে কলেজ থেকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫’ এ ছাত্র সংসদ সম্পর্কিত কোনো ধারা না থাকায় প্রতিষ্ঠার পর একবারও জকসু নির্বাচন হয়নি।

 বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বহুবার নির্বাচন দাবি করলেও ‘আইনি জটিলতার’ কারণে তা আয়োজন করা যায়নি। শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের মুখে গত ২৮ অক্টোবর জকসু নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গত ৫ ডিসেম্বর জকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। শুরুতে ভোটগ্রহণের জন্য ২২ ডিসেম্বর দিন ঠিক করা হলেও ভূমিকম্পে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় ৮ দিন পিছিয়ে তা ৩০ ডিসেম্বর করা হয়।

জকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা হাসান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জকসু নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের জরুরি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ভোটগ্রহণের নতুন দিন শিগগিরই জানিয়ে দেওয়া হবে।