Published : 16 Oct 2025, 07:09 PM
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ হরণের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন শিক্ষালয়টির সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি কালীপূজার অনুমতি এবং মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবিতে তারা স্মারকলিপি দিয়েছেন।
তাদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ ও ছাত্রফ্রন্টের নেতারা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং পূজা আয়োজন নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার দুপুরে ক্যাম্পাসের শান্ত চত্বরে সমাবেশ করেন বিক্ষুব্ধরা।
এরপর তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক ভবনে যান। সেখানে উপাচার্য দপ্তরে তারা স্মারকলিপি দেন।
সমাবেশে বলা হয়, কালী পূজা উদযাপনের অনুমতি চেয়ে প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি মৌখিক অনুমতি দেন। পরে আনুষ্ঠানিক অনুমতি চাইলে ‘নিরাপত্তার দোহাই’ দিয়ে সেই অনুমতি দেওয়া হয়নি।
বক্তারা অভিযোগ করেন, আনুষ্ঠানিক অনুমতি চাওয়ার দিন প্রক্টর তাজাম্মুল হক বলেন, ‘কালী পূজা তো উত্তর ভারতের পূজা’। এরপর শিক্ষার্থীরা উপাচার্য রেজাউল করিমের কাছে গেলে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে নতুন কোনো পূজার ট্রাডিশন শুরু করতে দেওয়া যাবে না।’

সমাবেশ থেকে কালী পূজার অনুমতি দেওয়ার দাবি জানানোর পাশাপাশি মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর অধ্যাপক তাজাম্মুল হক বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হয়েছে।
“শিক্ষার্থীরা অনুমতি নিতে অফিসে এসেছিল, তখন কথা বলার একপর্যায়ে ভারতের পূজা পার্বণের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। সেই সময় কালী পূজা উত্তর ভারতে ধুমধাম করে পালন হয়—সেটা নিয়ে কথা হয়েছিল। আর সেটাই শিক্ষার্থীরা ভুল বুঝেছেন।”
অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য রেজাউল করিমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন কেটে দেন।
সমাবেশে যা বলা হয়
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন বিদ্যার্থী সংসদের সভাপতি সুমন কুমার দাস বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মন্দির প্রষ্ঠার দাবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই হয়ে আসছে। আমরা বারবার প্রশাসনের নিকট গিয়েছি, আর তারা প্রত্যেকবার আমাদের মুলা দেখিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে চব্বিশের অভ্যুত্থানে আমরা ন্যায়ের পক্ষে ছিলাম।
“কিন্তু চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরেও আমরা বৈষম্যের শিকার। আমরা প্রশাসনের কাছে গেলে তারা বলে যে- আমাদের পূজার নিরাপত্তা দিতে পারবে না। নিরাপত্তা যদি নাই দিতে পারেন, তাহলে গদি ছাড়েন; নিরাপত্তা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীদের অধিকার। যারা নিরাপত্তা দিতে পারবে, তারাই আসুক।”

গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব কিশোয়ার আনজুম সাম্য বলেন, “এই বাংলায় অসাম্প্রদায়িকতা আপনারা তৈরি করেন নাই, সেটা শত শত বছরের ঐতিহ্য। এই বাংলা যতটা আপনার, ততটা আমার; যতটা হিন্দুর, ততটা মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানের।
“আপনারা সেই শক্তির অংশ, যারা বিভাজন ও বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। আমরা হুঁশিয়ারি করে বলতে চাই, এই বাংলার কোনো মুসলিম—হিন্দু বিদ্বেষী না; এই বাংলার ছাত্র, কৃষক, জনতা—কেউ কোনো ধর্মের বিপক্ষে নয়।
“এই জগন্নাথে মন্দির হবে, মন্দির হবে, মন্দির হবে; আমরা এই ক্যাম্পাসেই কালীপূজা করব। সনাতন ভাই-বোনদের অধিকার আদায়ের জন্য যতদূর যেতে হয়, ততদূর আমরা যাব।'
সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি এ কে এম রাকিব বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোন ধর্মে বিশ্বাস করবে, আর কোন ধর্মে করবে না তা প্রশাসন ঠিক করে দিতে পারে না। আমরা দেখেছি আমাদের হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন থেকে মন্দির চেয়ে আসছে; কিন্তু তারা পাচ্ছে না।
“আজ বৈষম্যহীন বাংলাদেশেও আপনারা বৈষম্যের সৃষ্টি করছেন। ভিসি মিজান আর আপনাদের মধ্যে পার্থক্য নাই। আজ আমি বলতে চাই, আমার ধর্মে যে বাধা দিতে আসবে, তার কালো হাত যেমন ভেঙে দেব যেমন, তেমনই সনাতন ধর্মে যে বাধা দিতে আসবে—তার কালো হাতও আমরা ভেঙে দেব।”

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম বলেন, “প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রাখে। সেই ন্যায্য অধিকারের দাবিতে পূজা উদযাপনের আবেদন নিয়ে গেলে প্রশাসন যে বিরুপ মন্তব্য করেছে তার নিন্দা জানাচ্ছি ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবিতে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট সহমত জানাচ্ছে।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের সদস্য সচিব শাহীন আলম বলেন, “আজ যে দাবিতে আমার ভাইয়েরা এখানে দাঁড়িয়েছে, এটা হওয়ার কথা না। এটি কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান না যে, কোনো একটি ধর্মকে গুরুত্ব দেবেন; আর অন্য ধর্মকে অবহেলা করবেন। আমি বাগছাসের পক্ষ থেকে সনাতনী শিক্ষার্থীদের সাথে একাত্মতা পোষণ করছি।”
শাখা গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক ফয়সাল মুরাদ বলেন, “নিরাপত্তার ভয় দেখিয়ে আপনারা পূজার অনুমতি দেন না। আমরা কি ৫ অগাস্টের পরে আমাদের হিন্দু ভাইদের মন্দির পাহাড়া দিই নাই?
“আপনারা যদি সেটা এবার না পারেন, আমাদের বলে দিন, আমরাই নিরাপত্তা দিব। এই ক্যাম্পাসে একমাস রোজা রাখা হবে, আবার সনাতনীরা পূজাও পালন করবে।”
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদি হাসান হিমেল বলেন, “একটি ফ্যাসিবাদের পতনের পরে আরেকটি ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটেছে। বিশেষ গুপ্ত সংগঠনের মদদে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে আপনারা ভিসি হয়েছেন, প্রশাসন দখল করে আছেন। আমরা এমন এক ভিসি পেয়েছি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রভাবশালীর কথা শোনেন; আর একেক সময় একেক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন।
“এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলবাদ কায়েম করতে চাইলে আমরা দাঁত ভাঙা জবাব দেব। জবিয়ানদের অধিকার আদায়ে দল-মত নির্বিশেষে আমরা সকল ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন একসাথে আছি এবং থাকব। এই ক্যাম্পাসে আগামী এক মাসের মধ্যে অবশ্যই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছে—দেখতে চাই।”
নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্র ঐক্য পরিষদের সভাপতি অর্ঘ্য শ্রেষ্ঠ রায় বলেন, “আজকে আমরা সকল ভাই-বোনেরা মিলে একটি স্মারকলিপি দেব, যেখানে সকল ধর্মের শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতাদের স্বাক্ষর রয়েছে। এটি শুধু স্মারকলিপি না, এটি একটি আলটিমেটাম। আমরা শিক্ষকদের সমর্থন চাই। সন্তান হিসেবে আপনারা আমাদেরকে এই সমর্থনটা দেন।”
আন্দোলনের মুখে কালী পূজার অনুমতি দেওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নের প্রক্টর অধ্যাপক তাজাম্মুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা প্রাথমিকভাবে তাদেরকে পূজা পালনের জন্য মৌখিক সম্মতি দিয়েছিলাম, এটা সত্য। কিন্তু আসন্ন বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ও জকসুকে সামনে রেখে ক্যাম্পাসে কোনোরূপ বিশৃঙ্খলা যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকে আমরা সচেষ্ট।
“পরদিন আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমতি নিতে আসলে তাদেরকে আমরা বুঝিয়ে বলেছিলাম এই বছরটা শুধু স্কিপ করতে, তারা এতে প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছিল; পরে আবার কী হলো জানিনা। যদি তখন তারা সম্মত না হত, তাহলে হয়তো কালী পূজার অনুমতি পেত। এখন আর সেই সুযোগ নাই।”