এআরটি চুক্তির প্রভাব: তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি
“এটা তো হবারই কথা ছিল।… আগামীতে কী হবে, উড়োজাহাজ আমদানি শুরু হলে কী হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া বহুল আলোচিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যে। চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত অনুযায়ী, দেশটি থেকে পণ্য আমদানি হু হু করে বাড়ছে; যার লক্ষ্য মূলত দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশভিত্তিক সবশেষ পণ্য আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৮৯ কোটি ৬২ লাখ বা প্রায় ১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ।
এর মধ্যে বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) আমদানি হয়েছিল ৬০ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পণ্য। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) তা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৯ কোটি ৬ লাখ ডলারে।
এই হিসাবে তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি বেড়েছে ১১৩ দশমিক ১১ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও বিটুমিনসহ খনিজ জ্বালানি ও তেল থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য।
এসব পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৭৭ কোটি ৫২ লাখ ডলার। অথচ প্রথম প্রান্তিকে এসব পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ১৩ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।
এছাড়া ১৪ কোটি ২৬ লাখ ডলারের তুলা, ১০ কোটি ৪১ লাখ ডলারের লোহা ও ইস্পাত, ৪ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের খাদ্যশস্য (গমসহ) এবং ৭ কোটি ২৯ লাখ ডলারের সয়াবিন ও পশুখাদ্য আমদানি করা হয়েছে এপ্রিল-জুন সময়ে।
এর বাইরে ২ কোটি ১৯ লাখ ডলারের পরিমাপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাসংক্রান্ত যন্ত্রপাতি, ১ কোটি ৯১ লাখ ডলারের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম এবং ১ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের প্লাস্টিক সামগ্রী আমদানি হয়েছে।
উড়োজাহাজ কেনায় বাড়বে আমদানি ব্যয়
আমদানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বৃদ্ধি অবধারিত ছিল। বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনা শুরু হলে আমদানি ব্যয়ের অংক আরও বড় হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে এরই মধ্যে দুটি চুক্তি সই হয়েছে।
গত ৩০ এপ্রিল প্রথম চুক্তিতে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার কথা বলা হয়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩৭০ কোটি বা ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার (বর্তমান বিনিময় হার ১২৩ টাকা হিসাবে যা প্রায় ৪৫ হাজার ৫১০ কোটি টাকা)। ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এসব উড়োজাহাজ সরবরাহ করবে বোয়িং।
পরে ২৪ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কিনতে দ্বিতীয় চুক্তি সই হয়। তবে এই চুক্তির আর্থিক মূল্য সম্পর্কে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
চুক্তির প্রেক্ষাপট ও শুল্ক বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এর আওতায় বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপের কথা জানানো হয়। পরে দরকষাকষির মাধ্যমে তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা ১ অগাস্ট কার্যকর হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ নয় মাস আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তিতে (এআরটি) সই করে বাংলাদেশ।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাঁচামাল (তুলা ও কৃত্রিম তন্তু) আমদানি করে তৈরি করা পোশাক দেশটিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো পাল্টা শুল্ক দিতে হবে না বলে শর্ত যুক্ত করা হয়।
বিনিময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৭০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য, ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য এবং ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অঙ্গীকার করে।
চুক্তির ১১ দিন পর ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা শুল্কগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করে। আদালতের রায়ে শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তি বাতিল হলেও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের কোনো উদ্যোগ এখনও নেওয়া হয়নি।
কী বলছেন আমদানিকারকরা
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার পেছনে ওই চুক্তি বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বলে মনে করেন বাংলাদেশে মার্কিন পণ্যের দ্বিতীয় শীর্ষ আমদানিকারক সিকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা ব্যবসায়ী; যেখান থেকে পণ্য আমদানি করলে আমরা এবং দেশ উপকৃত হবে, সেখান থেকেই আমদানি করব। দেশকে সহায়তার অংশ হিসেবেই আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়িয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর প্রতিশ্রুতির মান খুব ভালো। সরবরাহের নিশ্চয়তাও বেশি। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তাদের পণ্যের মান তুলনামূলক ভালো।
“সংঘাতের কারণে ইউক্রেনসহ কয়েকটি দেশ থেকে পণ্য আনার ক্ষেত্রে বন্দর ব্যবহারের ঝুঁকি ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। সব দিক বিবেচনা করেই আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি পণ্য কিনছি।”
সিকম গ্রুপ এলপিজি ও সয়াবিনসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করে বলে তথ্য দেন আমিরুল হক।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের দাম বেশি। তাতে ভোক্তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “হাঁ, এটা ঠিক। দাম একটু বেশি। তবে কোয়ালিটির বিষয়টাও বিবেচনায় রাখতে হবে। ব্রাজিল বা অন্য যে কোনো দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের চেয়ে আমেরিকার পণ্যের গুণগতমান অনেক ভালো।”
ছয় বছরে আমদানির চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে খুব বেশি ওঠানামা ছিল না। আমদানির পরিমাণ ২২৬ কোটি থেকে ২৮৫ কোটি ডলারের মধ্যে থাকত।
কিন্তু সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা এক লাফে ৩৫৯ কোটি ২৯ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৩২ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাণিজ্য চুক্তির কারণেই এই উল্লম্ফন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এটা তো হবারই কথা ছিল। ফেব্রুয়ারিতে চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তির আওতায় এখন দেশটি থেকে পণ্য আমদানি হচ্ছে। চুক্তির পর জুন মাস পর্যন্ত যে তথ্য আমরা দেখছি, তাতেই অনেক বেড়েছে। আগামীতে কী হবে, উড়োজাহাজ আমদানি শুরু হলে কী হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।”
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ শুল্ককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশসহ অনেক দেশকে বাণিজ্য চুক্তিতে বাধ্য করেছে, যাতে তাদের নিজেদের রপ্তানি বাড়ানো যায়।
“তবে একটা বিষয় কিন্তু বিবেচনায় রাখতে হবে। আমদানি বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের রপ্তানিটাও যদি বাড়ে, তাহলে খুব সমস্যা হবে না। সেই কাজটিই আমাদের এখন করতে হবে।”
মাসরুর রিয়াজ বলেন, “বাংলাদেশ যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় রপ্তানিকারক, তাই তাদের শর্ত মানতে হচ্ছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই আমদানি বাড়ছে।”
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি, গম, সয়াবিন ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশের মত পণ্য।
“আগে এসব পণ্য অন্য দেশ থেকে আনা হত, এখন সেগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হচ্ছে। ফলে চুক্তির প্রভাব আমদানিতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে,” বলেন মাসরুর রিয়াজ।
