২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

এবার ১০ এয়ারবাস কেনার ঘোষণা এল

বিমানমন্ত্রী বলেন, ভূরাজনৈতিক চাপে নয়, যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই এসব উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 29 Sep 2026, 09:43 PM

Updated : 29 Sep 2026, 09:43 PM

এক সপ্তাহ আগে ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেছিলেন, এয়ারবাস বর্তমান সরকারের জন্য ‘পরীক্ষা’। তার ইঙ্গিত ছিল এয়ারবাস কেনার ওপর সরকারের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক নির্ভর করবে। ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় এসে সরকারের তরফে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ১০টি এয়ারবাস কেনার ঘোষণা এল।

মঙ্গলবার প্রেস বিফ্রিংয়ে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।

তবে তিনি বলেছেন, ভূরাজনৈতিক চাপে নয়, যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই এসব উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে। বোয়িং কেনার বিষয়ে চলতি মাসেই তিনি বলেছিলেন, ডনাল্ড ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ীই ১৪টি বোয়িং কেনা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের ক্ষমতায় আসার সাত মাসের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমানের জন্য মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা এল। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি এবং ফ্রান্সভিত্তিক এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে।

একসঙ্গে ১০টি এয়ারবাস কেনার ঘোষণা দিয়ে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, এর মধ্যে চারটি সুপ্রশস্থ (ওয়াইড বডি) এ ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি ন্যারো বডির এ ৩২১ নিও।

এদিন সচিবালয়ে বিমান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “বিমান বাংলাদেশের বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ৩০ এপ্রিল ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করেছিলাম। ওই ক্রয়চুক্তির আলোকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অতিরিক্ত ১১টি বোয়িং কেনার চুক্তি হয়।”

Image

ফাইল ছবি

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। চব্বিশের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন আর ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের চাপের মধ্যে বোয়িং কেনার পথে পা বাড়ায় বিমান।

এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরে এসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, বাংলাদেশ এয়ারবাস থেকে ১০টি বড় উড়োজাহাজ ‘কেনার প্রতিশ্রুতি’ দিয়েছে।

এয়ারবাস থেকে আটটি যাত্রীবাহী ও দুটি পণ্যবাহী উড়োজাহাজ কেনার বিষয় ‘পর্যালোচনার’ মধ্যে তখন মার্কিন কোম্পানি বোয়িংও তৎপর হয়ে ওঠে। তৎকালীন সরকারের সঙ্গে দুপক্ষেরই দেনদরবার চলে। এর মধ্যেই ২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছর যে বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করেন, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে।

ট্রাম্পের ৩৫ শতাংশ শুল্কের চাপ সামলাতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা নিয়েই বিএনপি সরকার এপ্রিলে প্রথমে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করে। পাঁচ মাসের মাথায় আরও ১১টি বিমান কেনার চুক্তির ঘোষণা আসে সরকারের তরফেণ অর্থাৎ সব মিলিয়ে ২৫টি বোয়িংয়ের এয়ারক্রাফট কিনবে বাংলাদেশ।

বোয়িং কেনার এসব ঘোষণা আর চুক্তির খবরের মধ্যে এয়ারবাস বিক্রি করতে সরকারের ভেতরে লবিং আর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছিল ইউরোপের দেশগুলো।

ঢাকায় ফ্রান্সের নতুন রাষ্ট্রদূত গত সপ্তাহে (২২ সেপ্টেম্বর) বলেন, “আমি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের উপর জোর দিচ্ছি এবং এটা এমন এক বার্তা, সেটা বর্তমান সরকারের কাছেও আমরা দিচ্ছি। কেননা, আমরা মনে করি এটা অত্যাবশ্যকীয়।

“আমি মনে করি এটা বর্তমান সরকারের জন্য ভালো পরীক্ষা এবং এই সরকার এবং বিমানের প্রতি আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে।”

এর এক সপ্তাহের মাথায় বিমান মন্ত্রী এয়ারবাস কেনার ঘোষণাও দিলেন।

“ভূরাজনৈতিক চাপে নয়”

মঙ্গলবার মন্ত্রী অবশ্য বলছেন, ভূ রাজনৈতিক চাপে নয়- বিমানের চাহিদার ভিত্তিতেই উড়োজাহাজগুলো কেনা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যাত্রী চাহিদার আলোকে গঠিত বিমান এর নেটওয়ার্ক ফ্লিট প্ল্যানিং, এয়ারক্রাফট রেঞ্জ, যাত্রী ধারণ ক্ষমতা, ফ্লাইটপ্রতি সম্ভাব্য যাত্রী এবং সাপ্তাহিক ফ্রিকুয়েন্সি বিবেচনায় ওয়াইড বডি ও ন্যারো বডির উড়োজাহাজের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। ওয়াইড বডির উড়োজাহাজ মূলত পশ্চিম এশিয়ার উচ্চ চাহিদার রুট এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘ রুটের জন্য এবং ন্যারো বডির উড়োজাহাজ আঞ্চলিক ও স্বল্পদূরত্বের জন্য পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা বিমান এর পুরাতন ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজগুলোকে প্রতিস্থাপন করবে।”

আফ্রিকার এয়ারলাইন্স ইথিওপিয়ানের মডেল অনুসরণ করে এসব উড়োজাহাজ কেনার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “আমরা বিমানের বহর সম্প্রসারণে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স মডেল অনুসরণ করছি। একটি ছোট লিগ্যাসী ক্যারিয়ার থেকে এখন ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের বহরে ১৬৭টি উড়োজাহাজ রয়েছে যেখানে আমাদের রাষ্ট্রীয় ক্যারিয়ারে রয়েছে মাত্র ১৯টি।

“আপনারা জানেন ইথিওপিয়ার তুলনায় আমাদের জিডিপি বেশি এবং আমাদের বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রী চাহিদাও বেশি। বর্তমানে আমাদের মোট চাহিদার তুলনায় ২০ শতাংশের কিছু বেশি বিমান পরিবহন করতে পারছে। বাকি ৮০ শতাংশই বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখলে। তাই উড়োজাহাজ স্বল্পতা দূরীকরণে সরকার উড়োজাহাজ ক্রয়ের সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে কোনো ভূরাজনৈতিক প্রভাব নেই।”

এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর বোয়িং কেনা নিয়ে বিমানমন্ত্রী মিল্লাত বলেছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বাংলাদেশ কিনছে।

সেদিন তিনি বলেন, “আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ট্রাম্প একটা জিনিস চেয়েছে যে, ‘আমাদের বোয়িংগুলি ইউজ করেন’। আমরা করছি, আমরা কিনছি। ১৪টি বোয়িং কিনছি, আরও আমরা লিজ নিব।”

বোয়িং কেনার জন্য নিজের এক্স হ্যান্ডেলে বাংলাদেশে প্রশংসাও করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনালল্ড ট্রাম্প।

নতুন ঘোষণা দেওয়া ৩৫টি উড়োজাহাজের দাম পরিশোধের জন্য বাজেটের ওপর চাপ পড়বে না তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিমান একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। বিমানের নিজস্ব আয় ও উপযুক্ত অর্থায়নের মাধ্যমে এগুলোর দাম পরিশোধ করা হবে। ডেলিভারি ধাপে ধাপে হওয়ায় অর্থ পরিশোধ ও ধাপে ধাপে হবে। বিমানের আর্থিক সক্ষমতা, রুট-আয় ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কাজেই সরাসরি বাজেটের উপর চাপ পড়বে না।“

পুরানো খবর:

এয়ারবাস বর্তমান সরকারের জন্য ‘পরীক্ষা’: ফরাসি রাষ্ট্রদূত
ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ী বোয়িং কিনছি: বিমানমন্ত্রী
বাংলাদেশে বোয়িং-এয়ারবাস দ্বৈরথে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ চাইলেন ইইউ রাষ্ট্রদূত
বোয়িং ও এয়ারবাস দুটোই কিনব: শামা ওবায়েদ
এয়ারবাসকে ফেরালে বাণিজ্য সম্পর্কে ‘প্রভাব পড়বে’: জার্মান রাষ্ট্রদূত