আমদানিতে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ হচ্ছে: গভর্নর

পণ্য আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের অভিযোগ আসছে আগে থেকে।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 Nov 2022, 05:51 PM
Updated : 15 Nov 2022, 05:51 PM

পণ্য আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ার আড়ালে অর্থ পাচারের যে অভিযোগ আসছিল, তার পক্ষে সমর্থন পাওয়া গেল বাংলাদেশের ব্যাংকের গভর্নরের এক বক্তব্যে।

গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার মঙ্গলবার এক কর্মশালায় বলেছেন, পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য অতিরিক্ত দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে।

পণ্য আমদানিতে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ মানেই হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংক চ্যানেলেই বিদেশে পাচার হচ্ছে। পণ্যের মূল্যের নামে পাঠানো অতিরিক্ত অর্থ পরবর্তীতে বিদেশেই আমদানিকারকের পক্ষে কেউ গ্রহণ করছে। এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকে আসছে।

‘আন্ডার ইনভয়েসিং’ ব্যবহার করা হয় পণ্য রপ্তানিতে। পণ্য রপ্তানির সময়ে যে পরিমাণ অর্থ কম দেখানো হয়, তা বিদেশে রপ্তানিকারকের পক্ষে বুঝে নেওয়া হয়। এভাবেও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়ে আসছে।

আমদানি-রপ্তানিতে এমন ‘মিস ইনভয়েসিং’র মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বড় অংকের অর্থ পাচারের তথ্য উঠে আসছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায়ও। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক তথ্যে দেখা যায়, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিস ইনভয়েসিং বা অস্বচ্ছ লেনদেনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৮০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি মিস ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টি বেশ আগে থেকে বলে আসছে। ডলারের সাম্প্রতিক সংকটের মধ্যে দেশ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় আসছে।

এর মধ্যেই দেশের ব্যাংক ও এনবিএফআইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় আন্ডার ও ওভার ইনভেয়েসিং নিয়ে গভর্নর কথা বলেন বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

রউফ তালুকদার বলেন, “সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে পরিলক্ষিত হয়েছে যে, কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকসমূহ পণ্যের প্রকৃত বাজার মূল্য যথাযথভাবে যাচাই করতে ব্যর্থ হওয়ায় আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে এলসি খোলার কারণে দেশ কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে।”

কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’র কারণেও সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে বলে তুলে ধরেন তিনি। একইসঙ্গে বলেন, অন্যদিকে অবৈধভাবে হুন্ডি ব্যবসার ফলে দেশ বৈদেশিক মুদ্রা প্রাপ্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এলসি খোলার ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের ‘ওভার ইনভয়েসিং’ এবং ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি গভর্নর বলেন, “শিশুখাদ্য, গম, চিনি, ডাল, ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর আমদানি যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়।”

দেশের কোনো কোনো ব্যাংকের বন্ধ হওয়ার উপক্রম বলে যে কথা সোশাল মিডিয়ায় ছড়াচ্ছে, সে বিষয়ে রউফ তালুকদার বলেন, এমন ‘অপপ্রচার’ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

“ক্ষুদ্র আমানতকারীগণের আতঙ্কিত হয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। অপপ্রচারের কারণে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের মিথ্যাচার প্রসূত ঝুঁকি হ্রাসকল্পে গণমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাংকসমূহকে নিজেদের এবং ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে তাদের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক বক্তব্য তুলে ধরতে হবে।”

‘ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম’র উদ্বোধন ও এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আয়োজিত এই কর্মশালা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম মিলনায়তনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে এই অনুষ্ঠান আয়োজনে ছিল আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি)।

গভর্নর রউফ তালুকদার ব্যাংক নির্বাহীদের উদ্দেশে বলেন, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সিএমএসএমই খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রয়োজনীয় সহায়ক জামানত না থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাগণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে ঋণ গ্রহণ করতে সক্ষম হন না। ক্রেডিট গ্যারান্টি সুবিধার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষি এবং এসএমই খাতে ঋণ প্রবাহ আরও বাড়াতে হবে।

সিএমএসএমই খাতে ২৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করার নির্দেশনাও দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফরাহ মো. নাছেরের পাশাপাশি কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল হোসেন, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, দি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন বক্তব্য দেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক