পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি: ‘অনেক দূর আগাতে রাজি’ মালিকপক্ষ

মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, “নভেম্বরের মধ্যেই মজুরি চূড়ান্ত হবে এবং ডিসেম্বর মাস থেকে কার্যকর হবে। জানুয়ারি মাস থেকে শ্রমিকরা নতুন কাঠামোতে বেতন-ভাতা হাতে পাবেন।”

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 Nov 2023, 04:10 PM
Updated : 1 Nov 2023, 04:10 PM

তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে যে প্রস্তাব মালিকপক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল শুরুতে, সেখান থেকে তারা ‘অনেক দূর’ বাড়াতে রাজি; তবে নতুন কোনো অংক তারা বলেননি।

আর মজুরি বোর্ডে শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি বলছেন, অবাস্তব কোনো দাবি করলে যে হবে না, সেটা তারাও বোঝেন, তবে ‘ন্যায্য মজুরির’ জন্য তারা দর কষাকষি করে যাবেন।

মালিক পক্ষ নতুন মজুরি প্রস্তাব না করায় পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের পঞ্চম সভা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে।

নভেম্বরের মাঝামাঝি বোর্ডের পরের সভায় এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসার বিষয়ে আশার কথা বলেছে সব পক্ষই।

পোশাক কারখানার শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে মিরপুর, সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ চলছে। একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, ব্যাপক ভাঙচুরও চলেছে। এর মধ্যে বুধবার সরকার পক্ষ, মালিক পক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধির উপস্থিতিতে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের পঞ্চম সভা হয়।

সভায় শ্রমিক পক্ষের দাবি ছিল, বেতনের গ্রেড সাতটি থেকে কমিয়ে পাঁচটি করতে হবে। এ বিষয়ে মালিকপক্ষ রাজি বলে জানানো হয়েছে বোর্ডের পক্ষ থেকে।

তবে সভায় মালিক পক্ষ থেকে নতুন সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব না আসায় বোর্ডের পক্ষ থেকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। পরে ষষ্ঠ বৈঠকে প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানান মালিক পক্ষের প্রতিনিধি।

শ্রমিক প্রতিনিধি জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি জানান, তাদের প্রস্তাব ২০ হাজার ৩৯৩ টাকা নিম্নতম মজুরি।

আর বোর্ডে বিজিএমইএর প্রতিনিধি সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, তারা ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার ৪০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেখান থেকে বাড়াতে রাজি।

বাস্তব অবস্থাটা বুঝতে হবে: শ্রমিক প্রতিনিধি

বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তগুলো বিবেচনা করে প্রস্তাব করেছেন জানিয়ে মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, “২৩ হাজার, ২৫ হাজার টাকা বললেই হবে না। বাস্তব অবস্থাটা বুঝতে হবে।”

তবে তারা যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটিতেই অটল থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা ডিসাইডেড যে আমরা যে প্রস্তাব দিয়েছি সেখান থেকে আর বাড়াব না, যে প্রস্তাব দিয়েছি সেখান থেকে কমাবোও না।… হ্যাঁ, ন্যায্য মজুরি নিয়ে বারগেইন চলতে পারে।”

যে দাবি করা হয়েছে, সেখান থেকে ছাড় দেওয়া হবে কি না- এই প্রশ্নে সিরাজুল বলেন, “আগামী মিটিংয়ে উনাদের (মালিকপক্ষ) প্রস্তাব দেখে সিদ্ধান্ত নেব।”

তিনি জানান, বেতনের গ্রেড সংখ্যা কমিয়ে আনা ছাড়াও বোনাস, রেশনিংসহ অন্যান্য দাবি নিয়েও আগাতে চান।

এই দর দষাকষিতে কত দিন সময় লাগতে পারে, সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, “হয়ত এক মাস বা ১৫ দিন দেরি হতে পারে। আমরা সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছি।“

অনেক দূর আগাব: বিজিএমইএর প্রতিনিধি

মালিকপক্ষের প্রতিনিধি সিদ্দিকুর রহমান বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “উনারা (বোর্ড) অনুরোধ করেছেন যে, আমরা আগে যে মজুরি প্রস্তাব দিয়েছি, সেখান থেকে আরও বাড়াতে হবে। হ্যাঁ, আমরাও বাড়াতে অ্যাগ্রি হয়েছি। কতটুকু বাড়াব সেটা আগামী ফাইনাল মিটিংয়ে প্রস্তাব আকারে লিখিতভাবে জমা দেব।

“আজকে আমরা এইটুকু বলতে পারি, আমরা যেটা দিয়েছিলাম, তার থেকে অনেক দূর বাড়াব। এর পরেও কিন্তু সরকার একজন রয়ে গেছে। আমরা যা প্রস্তাব করি, বোর্ড যেটা প্রস্তাব করে এর পরেও সরকার চাইলে সেখানে বাড়াতে বা কমাতে পারবে।”

তবে এই বৈঠকে সেই প্রস্তাব না আসায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন শ্রমিক প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এইটা আমি আশা করি নাই। এই বিষয়টা আমার কাছে অপ্রত্যাশিত লেগেছে।

“চলমান আন্দোলন বিবেচনায় আজকের মধ্যেই মালিকরা লিখিত আকারে মজুরি প্রস্তাব করলেই ভালো হত। কিন্তু উনাদের দুটো সংগঠন রয়েছে। উনারা মালিকরা হয়ত এ বিষয়ে একমত হতে পারেননি।”

নভেম্বরের মাঝামাঝিতেই ঘোষণা?

নভেম্বরের মাঝামাঝিতেই মজুরির বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসার বিষয়ে আশাবাদী জানিয়ে মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি বলেন, “কারণ, বোর্ডে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর সেটা মতামতের জন্য ১৫ দিন সময় দিতে হবে। তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে এটা কার্যকর করা যাবে, জানুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে বর্ধিত বেতন যোগ হবে।”

সভা শেষে বোর্ড চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী মোল্লা বলেন, “এখন শ্রমিক আন্দোলন হচ্ছে। সে বিষয়টি মাথায় রেখে চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আরও একটি সভা আহ্বান করব।

“শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিতে সম্মত হয়েছে মালিক পক্ষ। তাদের প্রতিনিধি আগামী সভায় লিখিতভাবে জমা দেবেন। শ্রমিক পক্ষ তখন সিদ্ধান্ত নেবে, তারা সেই প্রস্তাবে রাজি কি না।”

তিনি বলেন, “নভেম্বরের মধ্যেই মজুরি চূড়ান্ত হবে এবং ডিসেম্বর মাস থেকে কার্যকর হবে। জানুয়ারি মাস থেকে শ্রমিকরা নতুন কাঠামোতে বেতন-ভাতা হাতে পাবেন।”

এদিন সংসদেও বিষয়টি নিয়ে কথা হয়। শ্রমিক বিক্ষোভ নিয়ে টেবিলে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, “তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ২০১৮ সালে ৫৩০০ টাকা হতে বাড়িয়ে ৮০০০ টাকা করা হয়েছে। যথাসময়ে মজুরি পুননির্ধারণে মন্ত্রণালয় সচেষ্ট রয়েছে।”

‘কাজে যোগ দিন’, আহ্বান সব পক্ষের

শ্রমিক প্রতিনিধি সিরাজুল শ্রমিকদের বৃহস্পতিবার থেকেই কাজে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেন, “আজকের মিটিংয়ে আমি আশাবাদী হয়েছি। আগামী মিটিংয়ে একটা ভালো মজুরির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা নৈরাজ্যের দিকে গেলে দরকষাকষি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।…আমরা আশা করি একটা ন্যায্য মজুরি আমরা পাব।”

বিজিএমইএ নেতা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “একটা সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই বর্তমানে শ্রমিক ভাইয়েরা একটা প্ররোচনায় পড়ে রাস্তায় নেমে, ফ্যাক্টরি বন্ধ করে, ভাঙচুর করছে। আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনেরা, ভাঙচুর করেন না। এখানে বাইরের ইন্ধন আছে।”

“আমরা যে প্রস্তাবনা দিয়েছি, সেখান থেকে সরকারের সহযোগিতায় একটা ‘উইন উইন সিচুয়েশনে’ আসব”- বিজিএমইএর প্রস্তাবের চেয়েও বেশি মজুরি দেওয়ার বিষয়ে আবার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন সিদ্দিকুর রহমান।

মজুরি বোর্ড চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী মোল্লা বলেন, “আমি শ্রমিক ভাই-বোনদের বলব, তারা যাতে কারো উসকানিতে কান না দিয়ে, কলকারখানায় ফিরে যায় এবং কাজ করেন।

“কারণ, শিল্পটা রক্ষা করাটাও তাদের দায়িত্ব। আপনাদের (শ্রমিকদের) রুজি-রুটি এখান থেকে হয়। তাই কোনো কটূ কথা না শুনে বিভ্রান্ত না হয়ে শান্তভাবে কাজ করার অনুরোধ করছি।”

একই দিন সরকারের পক্ষ থেকে একটি তথ্য বিবরণী দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, “গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে গঠিত বোর্ড মজুরি বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। শিগগিরই মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে স্বার্থান্বেষী মহল এ বিষয়ে গুজব ছড়াচ্ছে।”

ভেতরে বৈঠক বাইরে বিক্ষোভ

২৩ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি, ৬৫ শতাংশ মূল বেতন এবং গ্রেড ৫টিতে নামিয়ে আনা এবং পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভে হামলায় দায়ীদের বিচার দাবিতে মজুরি বোর্ডের সামনে এদিন বিক্ষোভ করে ৬৫টি গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের জোট গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স অ্যালায়েন্স বাংলাদেশ।

সংগঠনের বিবৃতিতে পরে বলা হয়, “মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের সময়ক্ষেপণের অপকৌশল আর ‘তামাশামূলক’ মজুরি প্রস্তাব গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।”

রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারের উপর চাপ তৈরি করে বিশেষ সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে মালিকপক্ষ পরিকল্পিতভাবে উসকানি দিচ্ছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানানো হয় বিবৃতিতে।