Published : 18 Aug 2026, 02:55 PM
ভারতের সঙ্গে টানাপড়েন কাটিয়ে ব্যবসা, বাণিজ্য ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি বলেছেন, “দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে স্বাভাবিক বাণিজ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, ভিসা সহজ করা এবং বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে।”
মঙ্গলবার সচিবালয়ে কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক, বিদ্যমান সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি।
জুলাই গনঅভ্যুত্থানের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। দুই দেশের তরফেই কঠোর অবস্থান দেখা গেলে স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে পড়ে।
তবে বাংলাদেশের নিত্যপণ্য দেশটির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বাণিজ্য কার্যক্রম ওঠানামার মধ্যে গেছে।
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী মুক্তাদির বলেন, “আয়তন, জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকারে পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক বাস্তবতা পারস্পরিক সহযোগিতার বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
“বিশেষ করে বাংলাদেশের অবস্থান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।”
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনীতি বড় হলেও আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য তুলনামূলক কম মন্তব্য করে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো গেলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “দুই দেশের বাণিজ্যকে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন।”
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আশা প্রকাশ করেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে।
বৈঠকে ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের ভিসা জটিলতা নিয়েও আলোচনা হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা, ব্যবসা ও অন্যান্য প্রয়োজনে নিয়মিত যাতায়াতকারীদের জন্য কয়েক মাস পরপর নতুন ভিসার আবেদন বাস্তবসম্মত নয়।
“দীর্ঘমেয়াদি ভিসা ব্যবস্থার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন।”
এদিকে সিআইআই প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের অবকাঠামো ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে দুটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।
এর মধ্যে একটি অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) উন্নয়নে এবং অন্যটি সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, ব্যাটারি স্টোরেজ ও ডাটা সেন্টারের মতো ভবিষ্যৎমুখী শিল্পে সহযোগিতা বাড়াতে কাজ করবে।
সিআইআই বলছে, ভারতে গত বছর অবকাঠামো খাতে প্রায় ২৫ লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগ হয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। ভারতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে বলে মত দেন তারা।
বৈঠকে স্থানীয় উৎপাদনকারী শিল্পের সক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়।
ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা থাকার পরও বিভিন্ন সমস্যার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে।
এনার্জিপ্যাকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের উদাহরণ দিয়ে এক প্রতিনিধি বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ থাকার পরও অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়। স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আনতে ৪০-৪৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। স্থানীয় শিল্প পুনরুজ্জীবিত হলে এ সমস্যা অনেকাংশে কমবে।
এফএমসিজি খাতেও বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিআইআই। ঢাকার আশপাশে সাবান, হোম কেয়ার ইনসেক্টিসাইড ও ফ্র্যাগ্রেন্সসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে একটি অত্যাধুনিক সমন্বিত কারখানা স্থাপনের আগ্রহ জানানো হয়। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে শুল্ক কাঠামো সমন্বয়ের আহ্বানও জানানো হয়। সিআইআই প্রতিনিধিরা বলেন, তাদের স্টিম-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহারে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক ও খাদ্য শিল্পে ১০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব। তবে ‘শুল্ক বৈষম্যের’ কারণে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের তরুণদের ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের তৃতীয় দেশে কাজের ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতা নিরসনে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই।