১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

দুই কিলোমিটার সড়কজুড়ে জমে উঠেছে ধোলাইখাল পশুর হাট

প্রায় দুই হাজার গরুর জায়গা দিতে গিয়ে দয়াগঞ্জ-সূত্রাপুর সড়কের একটি অংশ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

অনুপম মল্লিক আদিত্য

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 May 2026, 09:00 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:42 PM

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে দুই দিন আগ থেকেই জমে উঠেছে পুরান ঢাকার ধোলাইখাল সংলগ্ন এলাকার পশুর হাট। 

প্রতিদিন সকাল থেকে ক্রেতাদের আনাগোনা শুরু হলেও বিকেলের দিকে ভিড় বাড়তে থাকে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাটে এসে গরু দেখছেন, দরদাম করছেন এবং পছন্দের গরু কিনে বাড়ি ফিরছেন ক্রেতারা। 

মঙ্গলবার ধোলাইখাল হাট ঘুরে দেখা গেল, ক্রেতাদের কেউ বড়, কেউ মাঝারি, আবার কেউ ছোট গরু খুঁজছেন। মধ্যবিত্তের জন্য যেমন ৫৫ হাজার টাকা দামের ছোট গরু রয়েছে, তেমনি উচ্চবিত্ত ও শৌখিন ক্রেতাদের জন্য রয়েছে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা দামের গরু। 

তবে হাটে মাঝারি আকারের গরুর চাহিদাই বেশি। এসব গরুর দাম এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে। খামারিদের ভাষ্য, অধিকাংশ ক্রেতা এই বাজেটের গরু কিনতে হাটে আসছেন।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থেকে ১৬টি গরু নিয়ে ধোলাইখাল হাটে এসেছেন খামারি বেলাল হোসেন বিপ্লব। এর মধ্যে সাতটি বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি গরু এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। 

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বড় গরুর ক্রেতা আছে, তবে হাটে থাকা বড় গরুর সংখ্যার তুলনায় ক্রেতা কম। আমরা তিন দিন আগে হাটে এসেছি। এখনো নয়টি গরু বিক্রি বাকি আছে। এর মধ্যে দুটি ছোট এবং সাতটি খামারের সবচেয়ে বড় আকারের। আশা করছি, কালকের মধ্যেই এগুলো বিক্রি করে বাড়ি ফিরতে পারব।”

বিপ্লব বলেন, “আমার ও আমার স্ত্রীর শখ থেকেই গরুর খামার করা। গরু পালনে সে আমাকে সব ধরনের সহযোগিতা করেছে। খামার পরিষ্কার রাখা থেকে শুরু করে খাদ্য ও পানি সরবরাহ-সবকিছুই দেখভাল করেছে। আমরা এই অর্থ দিয়ে খামারের পরিধি আরও বাড়াব এবং সন্তানদের লেখাপড়ার পেছনেও কিছু ব্যয় করব।”

নরসিংদী থেকে ২২টি গরু নিয়ে রোববার ঢাকায় এসেছিলেন হাবিবুর রহমান। দুই দিনেই তিনি ১৮টি গরু বিক্রি করেছেন। 

এত দ্রুত বিক্রির রহস্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার গরুগুলোর দাম তুলনামূলক কম ছিল। বেশিরভাগই ছোট ও মাঝারি আকারের। ক্রেতাদের গরু ও দাম দুটোই পছন্দ হওয়ায় দ্রুত বিক্রি হয়েছে। আজ বিক্রি ভালো হচ্ছে। আশা করছি আগামীকাল সব গরু বিক্রি করে রাতে বাড়ি ফিরতে পারব।”

কেরানীগঞ্জ থেকে আটটি গরু নিয়ে এসেছেন মিনহাজুল কবীর। তিনি তিনটি গরু বিক্রি করেছেন। প্রতি গরু গড়ে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করেও তিনি বলছেন, আশানুরূপ লাভ হয়নি। তবে বাকি গরুগুলোতে ভালো দাম পাবেন বলে আশা করছেন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ধোলাইখাল হাটে আসা ক্রেতারা বলছেন, খামারি ও ব্যাপারীরা যে দাম চাইছেন, তাতে এবার কোরবানির পশুর দাম তুলনামূলক বেশি বলে মনে হচ্ছে।

যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গরু কিনতে এসেছেন দুই ভাই কামরুল ও কায়সার। তাদের ভাষ্য, গত বছর যে গরু এক লাখ টাকায় কিনেছিলেন, এবার একই ধরনের গরুর দাম এক লাখ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেশি চাওয়া হচ্ছে। 

দুই দিন ধরে হাট ঘুরেও দরদামে বনিবনা না হওয়ায় মঙ্গলবার তারা আবার এসেছেন। এবার গরু কিনেই বাড়ি ফিরতে চান তারা।

মতিঝিল থেকে গরু কিনতে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা রবিউল হোসেন বললেন, পোস্তগোলা ও ধোলাইখাল—দুই হাটেই গরুর দাম কিছুটা বেশি। বিক্রেতারা ‘অতিরিক্ত’ দাম হাঁকছেন বলেও তার মনে হয়েছে।

ঢাকায় এবারই প্রথম কোরবানি দিচ্ছেন রবিউল। শেষ মুহূর্তে এক লাখ ২৫ হাজার টাকায় একটি লাল রঙের গরু কিনেছেন। 

তিনি বলেন, “গরুটি আমার ছেলে পছন্দ করেছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর এটি পেয়েছি। দামাদামি করে কিনেছি, তাই মনে হচ্ছে খুব একটা ক্ষতি হয়নি।”

ক্রেতারা অতিরিক্ত দাম চাওয়ার অভিযোগ করলেও খামারিরা বলছেন, পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি, বিদ্যুৎ বিল এবং খামার পরিচালনার অন্যান্য খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে গরুর দাম কিছুটা বেশি হওয়াই তাদের বিবেচনায় ‘স্বাভাবিক’।

ধোলাইখাল হাটে ছোট, মাঝারি ও বড়—সব ধরনের গরুর চাহিদা থাকলেও সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে মাঝারি আকারের গরু। বেশি দামে বিক্রির আশায় ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে খামারিরা গরু এনে এই হাটে তুলেছেন।

সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা হাসিবুল ইসলাম ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়ে মাঝারি আকারের একটি ষাঁড় কিনেছেন। পরিবারের সদস্যসংখ্যা কম হলেও আত্মীয়স্বজনও ও নিম্নআয়ের মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করার কথা বললেন তিনি।

গেন্ডারিয়া থেকে আসা জালাল মিয়া এক লাখ পাঁচ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছেন। তিনি বলেন, “পোস্তগোলা হাটে গরুর দাম বেশি। তাই এখানে এসে তুলনামূলক কম দামে একটি ছোট গরু পেয়েছি। ছোট চাকরি করি, আয়ও সীমিত। তাই বড় গরু কেনা সম্ভব হয়নি।”

হাটের সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকা আব্দুল কাদির বলেন, “সব ধরনের গরুরই চাহিদা রয়েছে। তবে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকার গরুগুলো বেশি বিক্রি হচ্ছে। বড় গরুর বিক্রি এখন তুলনামূলক কম হলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলোও বিক্রি হয়ে যাবে।”

শেষ দুই দিনে বেচাকেনা আরো বাড়বে বলে আশা করছেন হাটের ইজারাদার কাজী ইমরান হোসেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ হাটের ইজারা নিতে তার সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট কত টাকা হাসিল উঠেছে, তার সঠিক হিসাব আপাতত তার কাছে নেই। 

ইমরান হোসেন বলেন, “ধোলাইখাল পশুর হাট পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হাট। প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গরু এসেছে। প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার গরু বিক্রির জন্য হাটে উঠেছে। একদিকে গরু বিক্রি হচ্ছে, অন্যদিকে খালি হওয়া জায়গায় নতুন গরু আসছে। 

“বৃষ্টির কারণে বেচাকেনা কিছুটা কম হলেও আজ বিকেল থেকে বাড়বে বলে আশা করছি। ঢাকার অধিকাংশ ক্রেতা ঈদের আগের দিন গরু কিনতে চান। গরু রাখার জায়গা, যত্ন ও খাবারের ব্যবস্থা করার ঝামেলা এড়াতেই তারা শেষ মুহূর্তে কেনাকাটা করেন। এ কারণে শেষ দুই দিনের বেচাকেনা সাধারণত বেশি হয়।”

মূল সড়কজুড়ে প্রায় ২ কিলোমিটার হাট, বাড়ছে যানজট

পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার মোড় থেকে ধোলাইখাল, মুরগিটোলা মোড় হয়ে দয়াগঞ্জ মোড় পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে পশুর হাট বসেছে। ফলে পথচারী ও যানবাহন চালকেরা সড়কের পুরো অংশ ব্যবহার করতে পারছেন না।

প্রায় দুই হাজার গরুর জায়গা দিতে গিয়ে দয়াগঞ্জ-সূত্রাপুর সড়কের একটি অংশ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দয়াগঞ্জ থেকে গুলিস্তানমুখী বিকল্প সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। স্বামীবাগ, রাজধানী মার্কেট ও বঙ্গভবন সংলগ্ন এলাকায়ও তীব্র যানজট দেখা দিয়েছে।

স্বামীবাগ এলাকায় যানজটে আটকে পড়া রাইড শেয়ারের বাইক চালক মহসীন আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাস্তা দখল করে পশুর হাট বসানো ঈদের সময় যাত্রীদের ভোগান্তির অন্যতম কারণ। পুরো ঢাকায় মোটরসাইকেল চালাই, তাই পরিস্থিতি সম্পর্কে জানি। কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নেই। 

“যার যেখানে ইচ্ছা, সেখানেই গরু তুলে বিক্রি করছে। এটা কোনো নিয়ম হতে পারে না। ১৮০ টাকার একটি ট্রিপ শেষ করতে আমার দেড় ঘণ্টা লেগেছে। কাল বাড়ি যাব, তাই ঈদের আগে কিছু বাড়তি আয় করার জন্য ঢাকায় থেকে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেটাও হচ্ছে না।”

লক্ষ্মীবাজার এলাকার বাসিন্দা রহমান কাজী বলেন, “এই মুহূর্তে ধোলাইখাল সড়কে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করার মত পরিস্থিতি নেই। ড্রেন ও সড়ক সংস্কারের কাজ এখনো শেষ হয়নি। তার ওপর হাট বসিয়ে পুরো সড়ক আরও সংকুচিত করা হয়েছে। 

“পথচারীরা ফুটপাতও ব্যবহার করতে পারছেন না। গরু রাখা হয়েছে সড়কে, আর খাবার রাখা হয়েছে ফুটপাতে। আরও পরিকল্পিতভাবে হাট বসানো উচিত ছিল।”

রাস্তাজুড়ে হাট বসানোর বিষয়ে ইজারাদার ইমরান হোসেন বলেন, “আমরা যে পরিমাণ জায়গার লিজ পেয়েছি, তার মধ্যেই হাট বসিয়েছি। রায়সাহেব বাজার মোড় থেকে দয়াগঞ্জ মোড় পর্যন্ত এলাকাতেই হাট সীমাবদ্ধ রয়েছে। সড়কের মাঝখান দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে পারছে। পথচারীদের যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।”