১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের সেই ধারা বাতিলে মন্ত্রিসভার সায়

আলোচিত ১৮ক ধারা বাতিল করায় ব্যাংকের আগের শেয়ারধারীদের একীভূত ব্যাংকের অংশীদারত্বে ফেরার সুযোগ বদ্ধ হল।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 10 Aug 2026, 09:41 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ‘বিতর্কিত’ ১৮ক ধারা বাতিলের যে ঘোষণা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে দিয়েছিলেন, তাতে সায় দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

আলোচিত এই ১৮ক ধারা বাতিল করায় ব্যাংকের আগের শেয়ারধারীদের একীভূত ব্যাংকের অংশীদারত্বে ফেরার সুযোগ বদ্ধ হল।   

সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ এর সংশোধনীতে ১৮ক ধারাটি বাতিল করে আইনের খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এ সংশোধন কার্যকর হলে রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে কোনো ব্যাংকের যারা শেয়ারধারক বা অংশীদার ছিলেন, শর্ত সাপেক্ষে তাদের আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার সুযোগ রাখার ১৮ক ধারাটি আইন থেকে বাদ যাবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আইনটির খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং অর্থাৎ আইনি যাচাই শেষে চূড়ান্ত করা হবে।

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ এর ১৮ক ধারার শর্ত পূরণ করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় ধারাটি বিলুপ্ত করার জন্য সংশোধনী আনার কথা বলেছে সরকার।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ বলে খেলাপি ঋণ ও নানা অনিয়মে দুর্দশায় পড়া শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সরকারি মালিকানায় নেওয়া হয়। 

এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত (মার্জ) করে গঠন করা হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি।

এগুলোর মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ছিল শেখ হাসিনার সরকারের সময় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। অন্য চারটির পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামের আলোচিত এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম ও তার পরিবারের হাতে। তবে অধ্যাদেশটি বিল আকারে হুবহু পাস না করে এতে ১৮ক ধারা যোগ করে তা সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী, যেটি নিয়ে তৈরি হয় বির্তক।

গত ১০ এপ্রিল বিএনপি সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করে। সংসদে আইনটি পাসের আগে ১৮ক যুক্ত করা হয়। ওই ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যাংক রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যারা সেই ব্যাংকের শেয়ারধারক ছিলেন, তারা পরে আবার ব্যাংকটির শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো ‘উপযুক্ত’ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেও এ সুযোগ দিতে পারবে।

এই ধারা যুক্ত হওয়ার পর সংসদের ভেতরে ও বাইরে সমালোচনা শুরু হয়। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে সংসদে অভিযোগ করা হয়, এস আলমসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই ধারাটি যুক্ত করা হয়েছে।

বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তা-মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস বা বিএবি এবং ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ বা এবিবিও ধারাটি বাতিলের দাবি জানায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি রেজল্যুশন আইনে একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকের পুরনো শেয়ারধারীদের মালিকানায় ফেরার বিধান যুক্ত করার উদ্যোগকে ‘আত্মঘাতীমূলক’ বলে বর্ণনা করেছিল।

পরে চলতি বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১৮ক ধারা বাতিল করার কথা জানান।

কেন এসেছিল ১৮ক ধারা

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তফসিলি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট, দেউলিয়াত্ব বা অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ ঝুঁকি মোকাবেলা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরের জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল আকারে তোলা হয়। পরে সেটি বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়।

বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি সংশোধন করে উপস্থাপনের সুপারিশ করে। সেই সুপারিশ অনুযায়ী অধ্যাদেশের কিছু বিধান আইনের বদলে বিধিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য আলাদা করা হয়। 

এরপর সরকারের আর্থিক দায়, গ্রাহকের স্বার্থ এবং ব্যাংকিং খাতের বাস্তব পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে নতুন ১৮ক ধারা যুক্ত করে বিলটি সংসদে তোলা হয়। সেই অবস্থাতেই ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ পাস হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রচলিত রেজল্যুশন ব্যবস্থার পাশাপাশি বাজারভিত্তিক আরেকটি বিকল্প ব্যবস্থা রাখা, সমস্যায় পড়া ব্যাংককে চালু রেখেই পুনর্গঠন করা, মূলধন ও তারল্য ঘাটতি কমানো এবং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ১৮ক ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক উদ্ধারে সরকারের অর্থের ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যও ছিল।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১৮ক ধারার সব শর্ত পূরণ করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি। সে কারণে ধারাটি বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: 

ব্যাংক রেজল্যুশন বিল পাস: পুরনো শেয়ারধারীদের ফেরার পথ খোলা নিয়ে বিতর্ক