Published : 12 Jul 2025, 10:09 PM
সেবার মান ও দাম বাড়ানো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর সমালোচনায় সরব হয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
তিনি বলেন, মোবাইল ফোনে সেবার গ্রাহক কমার কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলো সিমের কর বাড়ানোর কথা বলছে, যা খুবই ‘বাজে যুক্তি’। গ্রাহকরা মনে করছেন, মোবাইল অপারেটরগুলোর সেবার মান খারাপ ও দামও বেশি।
ফেইসবুকে কোনো পোস্ট দিলে সেখানে লোকেরা তাকে মোবাইল ইন্টারনেটের দাম কেন কমানো হচ্ছে না জানতে চেয়ে ‘আক্রমণ’ করে বলেও তুলে ধরেন তিনি।
শনিবার ঢাকার একটি হোটেলে ‘টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং লাইসেন্সিং অবকাঠামো’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামনে এসব কথা বলেন ফয়েজ তৈয়্যব।
টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতের সাংবাদিকদের সংগঠন টিআরএনবি এ বৈঠকের আয়োজন করে।
এতে অন্তর্বর্তী সরকার মোবাইল কোম্পানিগুলোর ‘নেটওয়ার্ক কানেক্টিভিটির’ যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে সেগুলো না বলে কোম্পানিগুলো বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করে যাচ্ছে বলেও তাদের তীব্র সমালোচনা করেন ফয়েজ তৈয়্যব।
সভায় নয়জনের পর বক্তব্য দিতে শুরু করেন মোবাইল ফোন অপারেটর রবির মূল কোম্পানি আজিয়াটা গ্রুপের এভিপি (সিনিয়র কনসালট্যান্ট) দিদারুল আলম। তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে কিছুটা রেগেই যান বিশেষ সহকারী তৈয়্যব। দিদারুলকে থামিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন তিনি।
দিদারুল বলেন, “আমরা যেটা দেখেছি নীতির মূল্য উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিযোগিতাটাকে লাইসেন্সের নিয়ম-কানুন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার। তার মানে হচ্ছে একটা খাতে কতগুলো প্লেয়ার আসবে কতোগুলো বিদেশি বিনিয়োগকারী আসবে সেটা আমরা নির্ধারণ করে দিচ্ছি।”
এ সময় ফয়েজ তৈয়্যব তাকে থামিয়ে বলেন, “গত ১৫ বছর যে ইনভেস্টমেন্ট ক্যাপিং ছিল তাতে আমাদের অপারেটররা কী অর্জন করেছে, বলেন?”

জবাবে দিদারুল বলেন, “আমি একটু তাহলে শুরু থেকেই বলি।”
ফয়েজ তৈয়্যব বলেন, “প্রশ্নের উত্তর দেন।”
পাশের দেশ ভারতে মোবাইল অপারেটরগুলোর মালিকানা কাদের হাতে সেই প্রশ্নও দিদারুলকে করেন তিনি।
কিছুটা বিব্রত দিদারুল জবাবে বলেন, “এখানে বেশির ভাগই দেশি বিনিয়োগকারী।”
ফয়েজ তৈয়্যব পাল্টা প্রশ্ন করে, “বেশির ভাগ কেন? আপনি সত্য কথাটা কেন বলছেন না সংবাদমাধ্যমের সামনে? আপনি সত্য কথাটা বলেন।
“সেলুলার সার্ভিস খাতে কেউ চাইলেই আসতে পারে না। কারণ আমি স্পেক্ট্রাম দিতে পারব না। স্পেক্ট্রাম একটা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। এটা আমরা আপনাদের (মোবাইল অপারেটর) দিয়ে দিছি, এখন কেউ চাইলেই দিতে পারবো না।”
এসময় দিদারুল আবার কথা বলার সুযোগ চাইলে ফয়েজ তৈয়্যব তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আপনি তো প্রথম থেকেই অভিযোগ দেওয়া শুরু করলেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে সত্য কথাটা বলেন, ভুল তথ্য ছড়াবেন না।
“বাংলাদেশে যে কোম্পানিটা সবচেয়ে ভালো করছে (জিপি) তার ৩৪ শতাংশ স্থানীয় শেয়ার। একটেল যখন ছিল তখন এটা খুব সম্ভাবনাময় ছিল। যখন এর শতভাগ শেয়ার হস্তান্তর হয়ে গেল তখন এটা লোকসান করতে শুরু করল। আমাদের স্থানীয় অভিজ্ঞতা কী। একটা কোম্পানিতে বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগের মিশ্রণ থাকলে সেটা ভালো করে।”
সরকার যে টেলিযোগাযোগ নীতিমালা করছে সেখানে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ রাখার যে বিষয়টি বলা হয়েছে সেটি কোনো আইন নয়, সুপারিশ বলে তুলে ধরে বিশেষ সহকারী তৈয়্যব বলেন, “আমি আপনাকে বাধ্য করছি না। আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি। যে নীতিগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আপনারা গত ১৫ বছর অপারেট করেছেন এগুলো ভালো কিছু নিয়ে আসেনি। সেই কারণে আমি বলছি, আমরা কিছু নীতি নিয়ে আসছি, এগুলো আইন নয়। আমি মনে করি এই নীতিগুলো আপনারা ফলো করেন তাতে আপনারা (মোবাইল অপারেটর) ভালো করবেন।
“আমরা আপনাদের বাধ্য করছি না। রবির ১০ শতাংশ শেয়ার মার্কেটে ছাড়া আছে আরও ৫ শতাংশ ছাড়তে কোনো সমস্যা না। আমি প্রথমে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ বিদেশি মালিকানার কথা বলেছি। এরপর আপনারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠির প্রতি সম্মান রেখে আমি আরও ৫ শতাংশ ছাড়ার কথা বলেছি। আমি মনে করি স্থানীয় অংশীদারত্ব বাড়লে স্থানীয় উদ্ভাবনগুলো এখানে প্রাধান্য পাবে, এখন যেটা পাচ্ছে না।”
মোবাইল অপারেটরগুলোর মুনাফা দিন দিন কমার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “গ্রাহক যদি মনে করে দাম বেশি ও গুণগত মান খারাপ তাহলে সেটা ভালো না। গ্রাহক সংখ্যা কমছে। আপনারা এর কারণ হিসেবে বলেন সিম কর বাড়ানোর কথা। এটা একটা খুবই বাজে ব্যাখ্যা। আপনারা ফিল করেন যে আমাদের গ্রাহকেরা মোবাইল অপারেটরদের থেকে যেটা মান সম্মত সেবা সেটা পাচ্ছে না সেজন্য তারা দূরে সরে যাচ্ছে। তাহলে আমাদের এখন সেবার মান বাড়াতে হবে।
“আমি ফেইসবুকে কোনো পোস্ট দিতে পারি না। সমানে অ্যাটাক আসে। প্রতি ১০টির মধ্যে নয়টি মন্তব্যই হচ্ছে ইন্টারনেটের দাম কেন কমাতে পারলাম না। কেন এত ইন্টারনেটের দাম বাড়ছে, কেন কভারেজ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি।”
এসময় দিদারুল বলতে শুরু করেন, “ট্রান্সমিশন হচ্ছে আমার আর্টারি। সেটা যদি ঠিক না থাকে।”
ফয়েজ তৈয়্যব আবার তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “ট্রান্সমিশনের বাধা তুলে নিয়েছি। আমরা আপনাদের ডিডব্লিউডিএম এবং ডার্ক ফাইবার পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছি। ওটা কেন বলছেন না? আপনারা এটা কেউ বলেনইনি।
“আপনাদের যদি আন্তরিকতা ভালো থাকত, তাহলে আপনারা বলতেন। প্রথমেই বলতেন যে আপনারা সরকারের এসব উদ্যোগকে প্রশংসা করছেন। আপনাদের ডিডব্লিউডিএম দেওয়া হয়েছে, অ্যাকসেস ফাইবার দেওয়া হয়েছে…।
“সুতরাং আপনারা শুধু এখানে বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করতে এসেছেন। আমি পুরোটা নিয়ে ভীষণ হতাশ। আপনারা এখানে শুধু অভিযোগ করতে এসেছেন। আমি তো অভিযোগ শুনতে আসি নাই। আমি সমালোচনা শুনতে এসেছি। কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল হচ্ছে।”
নতুন টেলিযোগাযোগ নীতিমালার বিষয়ে ফয়েজ তৈয়্যব বলেন, “আপনি কোনো অভিপ্রায় নিয়ে পড়লে এখানে কিছু পাবেন না। খোলা মনের সঙ্গে যথাযথ জ্ঞান নিয়ে পড়লে তাহলে এখানে অনেক কিছু পাবেন। শব্দের বিন্যাসটা আমরা এমনভাবে করেছি।”
এর আগে রবির প্রধান করপোরেট ও রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলমের বক্তব্যের পর ফয়েজ তৈয়্যব বলেন, “আমি বিগত স্বৈরাচার সরকারের কোনো নীতিকে নিজের মনে করি না। কাজেই আমি সেই স্বৈরাচারের কোনো পলিসিকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনও মনে করি না। আমি খারিজ করে দিই।
“আইএলডিটিএস এবং টেলিযোগাযোগ নীতিমালা নামে যেগুলো করা হয়েছে সেগুলো খারিজ করে আমরা নতুন করে করছি।”
টিআরএনবি সভাপতি সমীর কুমার দে এর সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব জহিরুল ইসলাম, বিটিআরসির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারী, গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান, রবির ভারপ্রাপ্ত সিইও রিয়াজ রশীদ, বাংলালিংকের সিইও ইওহান বুসে, টেলিটকের এমডি নুরুল মাবুদ, আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল হাকিমসহ খাত সংশ্লিষ্ট ১৬ জন।