Published : 03 Jan 2026, 07:11 PM
বাসা-বাড়িতে বেশি ব্যবহার হওয়া ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে রাজধানী ঢাকার কোথাও কোথাও প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে শনিবার সন্ধ্যায় জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তরফে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা বলেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, তিনি সন্ধ্যায় বিইআরসি ও বিপিসিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
“আমি বিষয়টা পরিষ্কারভাবে বুঝতে চেষ্টা করছি। আজ আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করব, জ্বালানি সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে।”
সরকার নির্ধারিত দামে কখনই এলপিজি সিলিন্ডারের গ্যাস কিনতে পাওয়া যায় না। খুচরায় অন্তত দুইশ টাকা বেশি গুনতে হয় ক্রেতাদের। এখন যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে বাড়তে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ডিসেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছিল ১,২৫৩ টাকা।
কিন্তু রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় এ পরিমাণের গ্যাসের সিলিন্ডার ১,৮০০ থেকে ২,২০০ টাকা, কোথাও আরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের।
অনেক জায়গায় আবার বাড়তি দাম দিয়েও সিলিন্ডার মিলছে না। এতে বাসাবাড়িতে খাবার রান্না করা নিয়ে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েছেন এলপিজি ব্যবহারকারীরা। পাইপলাইনের গ্যাস নেই কিংবা চাপ না থাকায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেই অনেকে এলপিজি ব্যবহার করে থাকেন।
হঠাৎ করে সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে খুচরা বিক্রেতারা ডিলারদের দোষ দিচ্ছেন।
এর বিপরীতে এলপিজি পরিবেশক ও অপারেটরগুলোর সংগঠনের তরফে দাবি করা হয়েছে, গত মাসে (ডিসেম্বরে) আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
‘সরবরাহ নেই, ডিলাররা চাচ্ছে অস্বাভাবিক দাম’
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক দিনে ঘুরে নির্ধারিত দামের আশপাশে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। কোথাও সরবরাহ নেই, এই যুক্তিতে খুচরা বিক্রেতারা এক লাফে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি চাইছেন বলে অভিযোগ। কোথায় কোথায় বাড়তি নেওয়া হচ্ছে এক হাজার টাকাও।
যাত্রাবাড়ীর কাজলার রিফা এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মো. পাভেল বলেন, “১০ দিন আগে যে গ্যাস ১২৫০ টাকায় বিক্রি করেছি, এখন তা ২২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। গত ২৬-২৭ ডিসেম্বর থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে আসে। আস্তে আস্তে দাম বাড়তে শুরু করেছে। এখন ২২০০ টাকায় এসে ঠেকেছে।"
দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “সিলিন্ডার গ্যাসতো বাইরে থেকে আসে। এখন মাল নিয়ে জাহাজ আসতে পারছে না বলে জানিয়েছেন ডিস্ট্রিবিউটররা। এ কারণে সরবরাহ কম।”
মোহাম্মদপুরের আদাবরের রহমতুল্লাহ এন্টারপ্রাইজের দেখভালের দায়িত্বে থাকা মিজানুর রহমান বলেন, “গত দুই দিন ধরে আমাদের এলাকায় কোনো গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহ নেই। ছোট–বড় কোনো সিলিন্ডারই ডিলাররা দিচ্ছে না। ফোন করলে তারা ধরছে না, আর ধরলেও অস্বাভাবিক দাম বলছে।”
তার দাবি, “ডিলাররা ১২ কেজির সিলিন্ডারের জন্য আমাদের কাছ থেকেই ১,৮০০ টাকা চাইছে। তাও আবার দুই–চারটার বেশি দিতে চায় না। এই অবস্থায় আমরা সিলিন্ডার আনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছি।”
সরকার নির্ধারিত দামের বিষয়ে তিনি বলেন, “সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, সেটাতে আমরা নিজেরাই গ্যাস পাই না। গত মাসে ১,২৫৩ টাকা নির্ধারণ থাকলেও আমাদের ১,২৮০–১,৩০০ টাকায় কিনতে হয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমরাই এখন সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। ডিলাররা ইচ্ছেমত দাম বাড়াচ্ছে।”
যাত্রাবাড়ীর কাজলার খুচরা বিক্রেতা পাভেলও সরবরাহ না পাওয়ার অভিযোগ করেন।
তার সঙ্গে কথা বলার সময় দোকানে আসেন শাহিদা আক্তার নামে এক নারী। গ্যাসের দাম জানতে চান দোকানদারের কাছে। ২২৫০ টাকা শুনে অবাক হয়ে বলেন, “কয়েকদিন আগেই তো ১২৫০ টাকা টাকা দিয়ে নিয়ে গেছি। এখন এত টাকা। এলাকায় লাইনের গ্যাস থাকে না, মানুষ বিল দিয়ে যাচ্ছে। আবার এই গ্যাসের দাম বাড়ছে। মানুষ যাবে কোথায়? খাবে কি? খাওয়া দাওয়াও কি বন্ধ করে দিতে হবে?”
আমদানি কমেছে, সরবরাহে ঘাটতি
বিভিন্ন এলপিজি পরিবেশক ও অপারেটরদের বক্তব্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বলছে, প্রতিমাসে গড়ে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ লাখ টন আমদানির বিপরীতে ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার টন। তাদের হিসাবে আমদানি কমার হার প্রায় ৪০ শতাংশ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শীতকালে বৈশ্বিক চাহিদা বেড়ে যাওয়া, জাহাজ সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত কিছু জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ায় শিপিং মার্কেটে সংকট বেড়েছে।

বিইআরসি চিঠি দিয়েছে লোয়াবকে
বিইআরসি ২০২১ সাল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম ঘোষণা করে আসছে। তবে নির্ধারিত দামে খুচরা বাজারে বিক্রি নিশ্চিত করা নিয়ে সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনার মুখে।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে বিইআরসি লোয়াবকে চিঠি দিয়ে মজুত, বোতলজাতকরণ, বিতরণ ও খুচরা বিক্রির সব স্তরে নির্ধারিত দাম মানতে বলেছে।
বাড়তি দামের বিষয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ডিসেম্বরে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এলপিজির আমদানি কম হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন বলছে, এলসি খোলা থাকলেও পণ্য পাচ্ছে না, জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “ফ্রেইট বা ভাড়া আগের তুলনায় বেড়েছে। আগে যেখানে সাধারণত ১০০ ডলারের মতো ছিল, তা এখন প্রায় ১৮০ ডলারে উঠেছে, এটাই বড় কারণ বলে মনে হচ্ছে।”
তার ভাষায়, “অ্যাসোসিয়েশন বলছে, উৎপাদক বা বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠান দাম বাড়িয়ে নিচ্ছে না। কিন্তু ব্যবসায়ী ও ডিস্ট্রিবিউটরদের দাবি, তারা বোতলজাতকারী সরবরাহকারকদের কাছ থেকে সঠিক দামে পাচ্ছে না।”
আইন আছে, প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, দাম নির্ধারণের পাশাপাশি সেই দাম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও বিইআরসির দায়িত্ব। কিন্তু সংস্থাটি তা ধারাবাহিকভাবে পালন করতে পারেনি।
ক্যাব (কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) বলেছে, অতিরিক্ত দামে বিক্রি আইনত অপরাধ হলেও শাস্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
তারা বলছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩ অনুযায়ী কমিশনের আদেশ/নির্দেশ অমান্য করলে জরিমানা বা অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আছে। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪০ ধারাতেও “ধার্য্যকৃত মূল্যের অধিক” দামে পণ্য বিক্রির জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।
কিছু এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান হলেও তা নিয়মিত নয়, এমন অভিযোগও রয়েছে।
৪ জানুয়ারি নতুন দাম ঘোষণা
বিইআরসি জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসের জন্য এলপিজি ও অটোগ্যাসের নতুন দাম ৪ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় প্রেস ব্রিফিংয়ে ঘোষণা করা হবে; সাধারণত ঘোষণা শেষে সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়।
মজুত এলপিজি পাঠানোর চেষ্টা: উপদেষ্টা
উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ মুহূর্তে আমরা যা করছি, তা হলো, বিপিসির কাছে যে পরিমাণ এলপিজি মজুত আছে, সেটি তুলনামূলক কম দামে সংকটপূর্ণ এলাকাগুলোতে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, এলসি খোলা থাকলেও পণ্য না আসা, শিপিং ও সাপ্লাই চেইনসহ আরও কিছু বড় বিষয় আছে, এসব বোঝার জন্যই আলোচনা।
উপদেষ্টার ভাষায়, শনিবারের বৈঠকটি আনুষ্ঠানিক নয়। সন্ধ্যায় তার বাসায় আলোচনা হবে।