Published : 16 Feb 2026, 06:40 PM
মুশশারাত রহমানের গল্প আসলে এক নিঃশব্দ যুদ্ধের গল্প। মাতৃত্বের প্রথম কান্নায় যেমন আনন্দ আছে, তেমনি থাকে গভীর এক শূন্যতা—যা অন্য কেউ কখনো দেখে না।
একসময় একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানে ট্রেইনিং কো-অর্ডিনেটর ছিলেন তিনি। কাজের চাপ, মিটিং, ডেডলাইন—সব কিছুর মাঝেও ভালোবাসতেন নিজের পেশাজীবনকে। অথচ ২০২২ সালের জুনে গর্ভধারণের পর আচমকাই দীর্ঘ সাড়ে সাত বছরের কর্মজীবনে ব্রেক টেনে ধরতে হলো তাকে।
সেই ব্রেকটাই যেন অচেনা এক দুনিয়ার দরজা খুলে দিয়েছিল। সেবছর সেপ্টেম্বরে জন্ম নিল তার পুত্রসন্তান। মা হওয়ার আনন্দ তাকে ভরিয়ে দিলেও—ধীরে ধীরে অন্য একটি বাস্তবতা এসে তাকে ঘিরে ধরল। ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তাকে কর্মজীবন থেকে দূরে থাকতে হল।
মধ্য ত্রিশের কাছাকাছি বয়সের, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মুশশারাত কখনও ভাবেননি—ক্যারিয়ারের এমন সময়ে তাকে এত দীর্ঘ বিরতিতে যেতে হবে। বন্ধুদের সবাই তখন কর্মজগতে প্রতিষ্ঠিত। আর তিনি নিজেকে আবিষ্কার করছিলেন এক নতুন, অচেনা বাস্তবতায়।
জীবনের মাঝপথে অবাক করা এই থেমে যাওয়া—যার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। বন্ধুরা, সহকর্মীরা একেকজন জীবনে এগিয়ে যাচ্ছে। আর তিনি, প্রায় প্রতিদিন, ঘড়ির কাঁটার মত একই রুটিনে বন্দি।
মাতৃত্বের প্রথম বছরগুলো ছিল তার কাছে এককথায় একাকী।
“সারাক্ষণ বাচ্চাকে ঘিরে থাকতে হয়। একই কাজ, একই রুটিন। মনে হত, আমি অনেক কিছু থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি,” বলেন মুশশারাত।
তার এই অভিজ্ঞতা বহু মায়ের অদৃশ্য ইতিহাস। মাতৃত্ব নিয়ে সমাজ যত গল্প বলে, মাতৃত্বের নিঃসঙ্গ অন্ধকার নিয়ে ততটা কথা বলে না কেউ।
এর ওপর যোগ হয়েছিল পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন। খুব ছোট ছোট ঘটনায় হতাশা তাকে গ্রাস করত। যিনি নিজেকে সবসময় ‘সেলফ-মোটিভেটেড’ ভাবতেন, তার ভেতরে জন্ম নিল ‘সেলফ-ডাউট’। যেন দুই ভিন্ন মানুষ একসঙ্গে বাস করছিল তার ভেতর।
কিন্তু একটি চিন্তা কখনও তাকে ভাঙতে দেয়নি—“আমাকে দিয়ে হবে না”—এটা কখনও মনে হয়নি।
এই মানসিক দৃঢ়তার বড় উৎস ছিল তার পরিবার। নারীবান্ধব একটি পরিবারে বড় হওয়া মুশশারাত সবসময়ই পেয়েছেন বাবা-মায়ের নিঃশর্ত সমর্থন।
মা হওয়ার আগেই তিনি ইন্টারস্পিড ও বিটপির মতো বিজ্ঞাপনী সংস্থায় ক্লায়েন্ট সার্ভিসে কাজ করেছেন।
বিরতি দীর্ঘ হলে মানুষ থেমে যায় না, বদলে যায়। বিরতির সময়টাতে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ স্থবির হতে দেননি। ব্লগ লিখেছেন, ফটোগ্রাফি করেছেন, ইনস্টাগ্রামে কনটেন্ট তৈরি করেছেন—নিজের শখ ও সৃজনশীলতাকে ধরে রেখেছেন।
ছেলের বয়স যখন ১ বছর ৮ মাস, তখন তিনি আবার কাজে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন।
ফিরতে চাওয়া মানেই কি পথ সহজ? না। তার ক্ষেত্রে ছিল ঠিক উল্টো। সিভি পাঠালেই ইন্টারভিউ কল আসত। অথচ ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রায়ই শুনতে হত— “মায়েরা তো কাজ করে, আপনি কেন বিরতিতে গেলেন?”
কখনও বলা হত— “ডে-কেয়ার তো আছে!”
তিনি ভেতরে ভেতরে ভেঙে যেতেন। কারণ তিনি জানতেন—বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার নেই।
মা হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়াকে কেন যেন অনেকেই ‘অক্ষমতা’ বলে ধরে নেন। একসময় তার মনে হল— “সমস্যা আমার না, আমাদের সমাজের।”
এখনো মাতৃত্বকালীন বিরতি যেন ব্যর্থতার দাগ হিসেবে দেখা হয়।
“বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে তো ডে-কেয়ারই নেই। হয়তো কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে আছে, কিন্তু বেশিরভাগ জায়গায় নয়,”—তার এই বাস্তব বয়ান অনেক কাজ করা মায়ের অভিজ্ঞতাই তুলে ধরে।
মুশশারাত বলেন, “ব্রেকটা এখানে স্বাভাবিকভাবে দেখা হয় না।”
ঠিক এই জায়গাতেই নতুন আলোর মত আসে ওয়াটারএইডের উইমেনস রিটার্নশিপ প্রোগ্রাম।
সাবেক বসের পাঠানো একটি লিংকে আবেদন করেন তিনি। প্রথম সেশনে গিয়ে দেখেন, তার মতই আরও অনেক নারী—মাতৃত্ব, বিরতি, মানসিক দোদুল্যমানতা—সব মিলিয়ে একই অভিজ্ঞতা শেয়ার করা একটি কমিউনিটি।
“আমি বুঝলাম—আমি একা নই। আমাদের সবারই একই গল্প।”
প্রোগ্রামটি তার জন্য হয়ে ওঠে এক বড় মোড়বদল—একটি ‘স্টেপিং স্টোন’।
ট্রেইনারদের মধ্যে কাজী মাহমুদ আহমেদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আর ওয়াটারএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহানের স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট সেশনটি তার কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
“তিনি খুব বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিষয়টা ব্যাখ্যা করেছিলেন,” বলেন মুশশারাত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের যত্ন নেওয়ার গুরুত্বও নতুন করে উপলব্ধি করেছেন তিনি।
এই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত তিনি একটি বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগে যোগ দেন। আজ ইন্টারভিউ নিতে বসলে তিনি বিরতিকে ‘নেতিবাচক’ দৃষ্টিতে দেখেন না। বরং দেখেন—অনুভব, স্কিল, কমিটমেন্ট।
মুশশারাত বলেন, “আমার মেন্টর আবদুল্লাহ মোর্শেদ ভাই আমাকে যে সমর্থন দিয়েছেন, সেটা আজীবন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।”
হাসতে হাসতে তিনি বলেন, “একজন কর্মজীবী মাকে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়। বাইরে আপডেট থাকা, ঘরে ফিরে সন্তান সামলানো—আমাদের যেন দশ হাতে কাজ করতে হয়।”
শেষবারের মত মুশশারাতের বার্তাটি যেন সব নারীর জন্য প্রেরণা, “জীবন কোথাও থেমে থাকে না। আপনি যে জায়গায় আছেন, সেটাকে উপভোগ করুন। নিজের ওপর ভরসা রাখুন, জয় একদিন হবেই।”
ডিসক্লেইমার
প্রতিবেদনটি একটি বিজ্ঞাপন বার্তা; সংবাদ প্রতিবেদন নয়। আর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি করা। এর কোনো কনটেন্টের দায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নয়।