স্কুল নেই, রোজ বেলুন বেচে ঝুমা

রুহিন আহমেদ
Published : 14 Jan 2021, 04:20 PM
Updated : 14 Jan 2021, 04:20 PM

কাজের প্রয়োজনে সিলেট নাইওরপুল পয়েন্টে গিয়েছিলাম। সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি একটা রেস্তোরাঁতে ঢুকলাম। একটু  রেস্তোরাঁর পাশের দেয়াল ঘাসের কার্পেট দিয়ে ঢাকা।  সবাই এই দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত।

আমি খাবার যখন বেরিয়ে যাচ্ছি তখন একটা মেয়ে আমার সামনে হুট করে বেলুন নিয়ে  দাঁড়াল।  হাসি দিয়ে ভাইয়া বলে ডাকল আমাকে।

শিশু সাংবাদিকতা করেছি অনেক বছর । এরকম অনেক পথশিশু আমি দেখেছি। মনের মধ্যে কৌতূহল জাগায় তার সাথে কথা বলার ইচ্ছা হলো। কথা বলতে চাইলে ওর একটাই শর্ত, বেলুন কিনতে হবে। আমিও সব বেলুন কিনবো বলে তার কথায় রাজি হই।

পথশিশু: ভাইয়া কি বেলুন নিবেন?

আমি: আমি তো অনেক বড়, আমি বেলুন দিয়ে কী করবো?

পথশিশু: সারাদিন কিছু খাওয়া হয় নাই। আম্মার ঔষধ নিবো। বেলুন নিয়ে আপনি কাউকে দিবেন। দেখবেন সে খুশি হবে।

আমি: আচ্ছা। বেলুনের দাম কত?

পথশিশু: পাঁচটা বেলুন ১০ টাকা। আপনি সব নিলে কিছু কম দিবেন।

আমি: বেলুন কত দিন ধরে বিক্রি করো? আর প্রতিদিন কত টাকার বেলুন বিক্রি হয়?

পথশিশু: জানি না। অনেকদিন হইছে। আম্মার সাথে আগে মাঝে মাঝে আসতাম। এখন স্কুল বন্ধ হওয়ায় প্রতিদিন বেলুন বিক্রি করতে আসি। প্রতিদিন একশ-দেড়শ টাকার মতন বিক্রি হয়। অনেকে খুশি হয়ে ১০-২০ টাকা বেশি দিয়ে যায়। সব টাকা আম্মার কাছে দেই।

আমি: তোমার নাম কি?

পথশিশু: নাম আমার ঝুমা বেগম।

আমি: তোমার বাসা কোথায়? তোমার পরিবারে বাবা -মা কী করে?

ঝুমা: বাসা লাউয়াই; মুকুল মিয়ার কলোনি। আব্বা কুলাউড়া ট্রাক গাড়ির সাথে গেছে। ট্রাকের মালামাল নামায়।আব্বা আম্মার সাথে প্রতিদিনে ঝগড়া করে। এখন রাগ অনেকদিন বাসায় আসে না। আম্মা আর আমার বড় বোন আর আমি বেলুন বিক্রি করি।

আমি: তোমরা ভাই-বোন কতজন? তুমি স্কুলে যাওনা?

ঝুমা: আমরা ভাই-বোন চারজন; তিন বোন এক ভাই। ভাই সবার ছোট। আমি ক্লাস দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি। এখন স্কুল বন্ধ থাকায় আম্মার সাথে বেলুন বিক্রি করি।

আমি: তোমার মা কোথায়? আর তোমার বয়স কত? তুমি কি সবার বড়?

ঝুমা: (একটু হেসে) আমার বয়স জানি না। আম্মার জ্বর; দুই দিন ধরে আসে নাই।।আমি আর আমার বোন আসছি। আমি বোনের মধ্যে সবার ছোট। আর এক বোন ছোট ভাইকে বাসায় দেখাশুনা করে। ভাইয়া কি সব বেলুন নিবেন? আমি আরো আনতে যাবো।

আমি:  (আরো কিছু জানার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আর কথা বাড়ানো হয়নি।) আচ্ছা বেলুনের দাম কত হয়েছে?

ঝুমা: ১৫টা আছে। ৩০ টাকা দেন।

আমি: (সব বেলুন হাতে নিয়ে ৬০ টাকা দিলাম।) এই ৩০ টাকা বেলুনের আর  ৩০ টাকা ভাত খাওয়ার জন্য।

ঝুমা: ( আবারো হেসে) আচ্ছা ভাইয়া। আপনি অনেক ভালো।

ওই ঘাসের কার্পেটের সামনে দাঁড়িয়ে ওর কয়েকটা ছবি নিলাম।  আসার সময় আমার বাসার টিকানা দিয়ে আসলাম। ওর পড়াশুনার বই-খাতা আর কলম আমি দিব বলে জানালাম; মেয়েটা যেন ওর মাকে নিয়ে আমার বাসায় আসে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক