যেমন গেছে কোভিড-১৯ ‘পজিটিভ’ দিনগুলো

মোনেম অপু
Published : 8 Sept 2020, 02:07 PM
Updated : 8 Sept 2020, 02:07 PM


ছবি: সাদ আব্দুল্লাহ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম

এ যেন বাস্তব নয়, স্বপ্ন; স্বপ্ন দেখে চলেছি। নতুন করোনাভাইরাস যখন প্রথম দেশে এলো, লোকে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল। এই আতঙ্কিত হয়ে ওঠাটা ছিল নিতান্তই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে লোকে খুব সতর্ক হয়ে উঠেছিল- তা কিন্তু নয়। কারণও ছিল। করোনাভাইরাস প্রতিরোধী সতর্কতার অবলম্বনগুলো, বস্তুগত হোক বা আচরণগত, অধিকাংশ মানুষের জন্য একরকম বিলাসিতারই নামান্তর।

তবে মানুষ কোভিড-১৯ রোগী সন্দেহে মানুষের সাথে খানিকটা নির্মম হয়েও উঠেছিল। ভীতিকর ও ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাবের প্রথম ধাক্কা বলে কথা। তবে দিনে দিনে রোগটি নিজেই খানিকটা যেন কাহিল হয়ে উঠলে এবং আক্রান্তজনেরা অধিকাংশই নিজ থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকলে লোকের মন থেকে ভয় অনেকটাই কেটে গেল। আমার ছোটভাইয়ের ঘটনাটা ছিল প্রথম দিকের। ফলে সে যখন আক্রান্ত হলো আমরা স্বভাবতই কাতর ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলাম।

সেদিন মাকে যখন ফোন দিলাম, ওপার থেকে মায়ের কান্না ভেসে আসলো। মায়ের কান্না পাষাণ সন্তানের জন্যও উদ্বেগের কারণ।

কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলে বললেন, বিজয়ের জ্বর।

অন্য যে কোনো সময়ে জ্বরের সংবাদ চোখের জলসহ জানানোর ব্যাপার ছিল না। কারণ এসময়ে জ্বর একটা ভীষণ রকমের কুলক্ষণ। ভাই নিজেকে ঘরে আবদ্ধ করলো। জ্বর সারলো। জলে ডুবন্ত মানুষ যেভাবে খড়-কুটা আকরে ধরে, আমরাও সেভাবে আশায় থাকলাম এ জ্বর সে জ্বর হয়তো নয়। তবে চৌদ্দ দিনের কোয়ারেন্টাইন তো নিয়মের বিষয়। কিন্তু কিছুদিন পরই তার ঘ্রাণশক্তি লুপ্ত হলো। ফলে কোভিড টেস্টের জন্য আমার মরিয়া হয়ে উঠলাম। বাসায় এসে স্যাম্পল নেওয়ার প্রতিষ্ঠান খুঁজতে লাগলাম।

মানুষ তার অস্তিত্বকে গভীরভাবে অনুভব করতে পারে গুরুতর বিপদের মুখোমুখি হলে। কিন্তু কোভিড-১৯ শঙ্কা না দিয়েছে অস্তিত্বকে অনুভব করার সুযোগ, না দিয়েছে অস্তিত্বকে ভুলে থাকার উদাসীনাবস্থা। জীবনে বিপদ থাকে, থাকে বিপদের অনুপস্থিতিও। কিন্তু মহামারীী আমার জীবনে অভূতপূর্ব এক মনোদশা তৈরি করেছে। কী দিয়ে এর তুলনা তুলে ধরা যায়?

এ যেন প্রাণবিবর্জিত জীবন, জীবন্ত ক্লীবের পরিক্রমণ। অফিস থেকে বাসা, বাসা থেকে অফিস। একটা অনিকেত অস্থিরতা নিয়ে যেন শুধুই সময় পার করা। অস্থিরতা তো শান্ত কিছু নয়। তবুও অদ্ভুত কথা হচ্ছে, এ অনেকটাই শান্ত অস্থিরতা, ফল্গুধারার মতো সংগোপনে বয়ে চলা।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাসের পর মাস মনে একটা দীর্ঘ কিন্তু অনির্দিষ্ট সময় ধরে শঙ্কা নিয়ে যাপিত জীবন মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়, না দৈহিক দিক থেকে, না মানসিক দিকে থেকে। এ শঙ্কা যতটা না নিজের জন্য তার চেয়েও বেশি প্রিয়জনদের জন্য। দ্রুতই মনে এক ধরণের বৈকল্য অনুভব করতে লাগলাম। মনে হচ্ছে একটা অস্বাভাবিক জগতের ভেতর দিয়ে হাঁটছি; যেন একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর আটকা পড়ে আছি, যার কোনো প্রান্তই খোলা নয়।

অনিশ্চয়তাবোধ মনকে কাহিল করে ফেলে। এই অনিশ্চয়তাবোধ আগে আমার জীবনে কখনো আসেনি তা নয়; নানা সময়ে নানা কারণে বহুবার এসেছে। কিন্তু তা কখনও এই মহামারী কালের মতো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রত্যাশিত ফলাফল বিচারে পরিণতি ইতিবাচক হোক বা নেতিবাচক, সময়টা সবসময়ই সংক্ষিপ্ত ছিল। কী হবে, কী হবে, বা হায়-হুতাশ ভাবটা, শঙ্কাটা দ্রুতই সমাপ্ত হতো। তবে শঙ্কার তীব্রতা বেশি ছিল। টানা ও প্রলম্বিত অনিশ্চয়তাবোধ মনকে অবসন্ন করে তুলেছে, প্রাণশক্তিকে ম্রিয়মাণ করে ফেলেছে।

অথচ আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনার চেয়ে অন্য আরও নানা বিপদে, যেমন অন্য রোগে আক্রান্ত হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা, আগুন, ঝড়, ভূমিকম্প, জীবন সংকটাপন্ন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ঢের বেশি। তাহলে কি একথাই সত্য হয়ে ওঠে না যে, আমি এতদিন যে ভয়হীন জীবন যাপন করেছি তা একটা অযৌক্তিক-অসচেতন নিশ্চয়তার বোধ নিয়ে যাপন করেছি?

আর এখন যে অনিশ্চয়তাবোধ তাড়া করে ফিরছে, যার প্রভাবে জীবন একরকম ফ্যাকাসে হয়ে পড়েছে, তাও কি অযৌক্তিক-অসচেতন অনিশ্চয়তাবোধ?  জীবন যখন অযৌক্তিক-অসচেতন নিশ্চয়তাবোধ ও অনিশ্চয়তাবোধের ইতিহাসে পর্যবসিত হয়, জীবনকে তখন কেমন দেখায়?

এরই মধ্যে ঈদের ক'দিন আগে মায়ের বাড়িতে মা, বোন ও আরেক ভাই কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলেন। একইসাথে আক্রান্ত হলাম আমার বাসায় আমি, আমার স্ত্রী ও আমাদের কন্যা। এদের মধ্যে মা ও স্ত্রী সবচে বেশি আক্রান্ত ছিলেন। স্ত্রীকে চারদিন হাসপাতালেও থাকতে হলো। 'অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর' বলে একটি প্রবচন আছে। অনুরূপ অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করলাম। একই পরিবারের ছয়জন। কেমন যেন একটা বোধহীন যান্ত্রিক মন নিয়ে একমাস অতিবাহিত করে ফেললাম।

নিজের জীবন নিয়ে একটা গ্লানিও অনুভব করতে শুরু করলাম। নিজের বিশ্বাসটা প্রশ্নের মুখে পড়লো। শুধু কি মুখে পড়া? না, মাঝে মাঝে মনে হয়েছে সর্পরূপী সংশয়ের গলা পেড়িয়ে রীতিমতো তার পেটের ভেতরে গিয়ে পড়া। নিজ বিশ্বাসের সাথে নিজ মনের দশাটির অসঙ্গতিটা যেন উৎকটভাবে আমাকে উপহাস করছে।

মহামারী এসে জীবনে অবশ্য কয়েকটি ইতিবাচক পরিবর্তনও এনে দিয়েছে। পরিচ্ছন্নতা এসেছে। আগে বাজার থেকে খাওয়ার জিনিসগুলো সোজা রিফ্রিজারেটরে ঢুকতো, এখন আগে ধুয়ে নিচ্ছি; সবজি থেকে ডিম সবই।

বাইরে থেকে এসে গোসল করছি, আগে যেখানে গোসল করে বাইরে যেতাম। গৃহকর্মী বাড়ি চলে যাওয়ায় ঘরের কাজ এখন নিজেরাই করছি। গৃহকর্মী ছাড়া গৃহ পরিচালনায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। ভাবছি বাকী জীবন এভাবেই 'নিজের কাজ নিজে কর' নীতিতেই কাটিয়ে দেব।

এই সময় অনেক ব্যক্তি চাকরি হারিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচল হ্রাস পেয়েছে। রেস্টুরেন্টে মানুষের খাওয়ার অভ্যাস কমেছে। ব্যবসায় মন্দাভাব এসেছে। মানুষের রোজগার কমেছে। কমেছে বাইরে ঘোরাঘুরি করার প্রবণতা। মানুষ এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ঘরে বেশি সময় কাটাচ্ছে। আমরাও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু ঘরেও দূরত্ব তৈরি করেছে এই ভাইরাস। আমরা দুজনেই অফিস করি বিধায় কন্যা থেকে খানিকটা দূরেই থাকছি।

আমার অফিসের প্রধান নির্বাহী এক সভায় মহামারী পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একটি ছোটখাটো বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি উল্লেখ করলেন, এরকম প্রাদুর্ভাব শত বছরে একবার আসে। তিনি এও বললেন, সে বিচারে আমরা একরকম সৌভাগ্যবান যে, আমরা নিজ জীবন দিয়ে এরকম শতবার্ষিক পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছি। সবচে অবাক করা বিষয়টি ছিল, তিনি এ সুযোগের জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদও দিয়েছিলেন।

বেখাপ্পা লেগেছিল কথাটা; বড্ড বেখাপ্পা লেগেছিল। বিস্মিত হয়েছিলাম। অনেকক্ষণ ধরে মনে মনে কথাটার মর্ম খুঁজেছিলাম। আজ মনে হচ্ছে নিজ বিশ্বাসের সাথে নিজ জীবনের সঙ্গতি আনার জন্য এটাকে একটা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা যেতেই পারে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক