জাপানের নিসর্গ শহর সুইডেন হিল

নুরুন নাহার লিলিয়ান
Published : 12 March 2020, 10:10 AM
Updated : 12 March 2020, 10:10 AM

জাপানের অভিজাত শ্রেণির অন্যতম তীর্থভূমি হল হোক্কাইডো আইল্যান্ডের সুইডেন হিল। বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্ত বিদেশিদের কাছে সুইডেন হিল ভীষণ আকর্ষনীয় এক জায়গা। ধীরে ধীরে তা সাধারন মানুষের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বলা যায় জাপানে বসবাসরত ধনী দেশ থেকে আসা ভিনদেশিদের সেকেন্ড হোম এখন সুইডেন হিল।

জাপানি আত্মজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে ঘুরতে গিয়েছিলাম নিস্তব্ধ গ্রাম সুইডেন হিলে। এর আগে অনেকের মুখে ব্যয়বহুল জায়গা হিসেবে
সুইডেন হিলের গল্প শুনেছিলাম । গল্প শুনতে শুনতে এর প্রেমে পড়েই ঘুরতে যাওয়া।

পুরো গ্রামের সব কিছু সুইডেনের নির্মাণ শৈলীর অনুসরণে তৈরি । পাহাড়ি পরিবেশে সারি সারি সুন্দর সব একই ধরনের লাল কাঠের বাড়ি। সাদা ও লালের মিশ্রণে তৈরি সুইডেন হিলের বাড়িগুলো। সেখানকার বাড়ি ঘর, ক্রাফট, ট্রাডিশনাল জিনিসপত্র সব কিছুই বলা যায় জাপানে এক টুকরো সুইডেন।

১৯৮৪ সালে সুইডেন অ্যাম্বাসেডর হোক্কাইডো আইল্যান্ডের বড় শহর তোবেতসুর ইশিকারি ঘুরতে যান৷ তখন তিনি অনুভব করেন তোবেতসুর এলাকাটার জলবায়ু ও ভূমির স্থাপত্য পুরোটাই যেন সুইডেনের মতো। সেখান থেকেই আরও একটি ছোট্ট দেশ সুইডেন তৈরি হয় জাপানের হোক্কাইডো আইল্যান্ডের তোবেতসু শহরে। ১৯৮৪ সালে এটা তৈরি হলেও এর পরিকল্পনা হয় ১৯৭৯ সাল থেকে।

হোক্কাইডোর সাপ্পোরো শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার বা ১৯ মাইল দূরে তোবেতসু নামক শহরে এই সুইডেন হিল অবস্থিত। আর হোক্কাইডোর নিউ ছিতোস এয়ারপোর্ট থেকে তোবেতসু ইশিকারির দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। বাস, ট্রেন, প্রাইভেট কার অথবা প্লেন সব কিছুরই সুবিধা আছে সুইডেন হিলে যাওয়ার। এছাড়াও আন্তর্জাতিক অনেক সরাসরি ফ্লাইট আছে। চীনের সাংহাই, বেইজিং, তাইওয়ানের তাইপাই, হংকং, কোরিয়ার শিউল থেকে সরাসরি হোক্কাইডোর এই নিভৃত গ্রাম সুইডেন হিলে যাওয়া যায় প্লেনে চড়ে ।

ট্রেনে গেলে খরচ তুলনামূলক কম ও দ্রুত সময়ে যাওয়া যায়। সেখানে যেতে প্রায় পৌনে এক ঘন্টা সময় লাগে। একটু খরচ বেশি ট্যাক্সিতে গেলে। একই দূরত্ব হলেও খরচ হয় ট্যাক্সিতে প্রায় ৭৫০০ ইয়েন থেকে ৯৫০০ হাজার ইয়েনের মতো । নিজের, আত্মীয় অথবা বন্ধুর গাড়িতে গেলে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট থেকে এক ঘন্টার মতো সময় ব্যয় হয়।

আমি তখন আমার স্বামীর সাথে সাপ্পোরো শহরের কিতাকু ওয়ার্ডে থাকি। নিত্যদিনের প্রয়োজনেই একদল বৃদ্ধ সেচ্ছাসেবকের সাথে আমার সুসম্পর্ক হয়। চিয়ো সাইতো ও রিউহে সাইতো দম্পতি ছিলেন আমার স্থানীয় জাপানি অভিভাবক। আমাকে উনারা নাতিন বানিয়েছিলেন। আমি ছিলাম উনাদের আদরের নাতনি।

জাপান জীবনের পুরোটা সময় এই দম্পতি ছিল আমার পরম আপন জন। তারা নিয়মিতই আমাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে নিয়ে গিয়েছেন। নিজ দায়িত্বে নিজ দেশের সুন্দর দিকগুলো উন্মোচন করেছেন।

চিয়ো সাইতো মানে আমার জাপানি দাদীর মাধ্যমেই পরিচয় হয় আরও অনেক বিভিন্ন বয়সী জাপানি বন্ধুর সাথে। তাদের মধ্যে তেরুকো সান, কেইকো সান,কাজুহা সানসহ অনেকেই ছিলেন। যাদের সাথে নিয়মিতভাবে আমি হোক্কাইডো আইল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম। একদিন হোক্কাইডো আইল্যান্ডের বিভিন্ন সুন্দর জায়গা নিয়ে গল্প করতে করতেই হঠাৎ সিদ্ধান্ত হল সুইডেন হিল যাওয়ার।

২০১৫ সালের ২৮  জুলাই ভোর ছয়টায় জাপানি দাদী চিয়ো সান, তার স্বামী রিউহে সান, কেইকো সান ও তেরুকো সান আমার বাসা থেকে আমাকে নিয়ে গেলেন। বরাবরের মতো চিয়ো সানের স্বামী রিউহে সান ড্রাইভ করছিল।

গাড়িতে ওঠার পর বরাবরের মতো চিয়ো সান একটা ফটোকপি চিরকুট হাতে দিলেন। সেখানে পুরো দিনের শিডিউল ইংরেজিতে লেখা আছে।সেই সাথে ইংরেজিতে লেখা তোবেতসু ও সুইডেন হিল নিয়ে সাপ্পোরো সিটি সেন্টারের কয়েকটা গাইড বই ও ম্যাপও দিলেন সবাইকে।

আমরা হোক্কাইডোর সাপ্পোরো শহরের কিতাকু ওয়ার্ড থেকে রওয়ানা হওয়া থেকে বিকেলে বাসায় ফেরা পর্যন্ত সব কিছু ইংরেজিতে টাইপ করা আছে। যেন আমার বুঝতে অসুবিধা না হয়। মোটামুটি সময় তো লাগবে। কারণ সাপ্পোরো শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে আর ভিন্ন আরেকটা শহরে অবস্থিত সুইডেন হিল। গাড়িতে ব্যাপক উত্তেজনা নিয়ে আমি সবার সাথে উঠে বসলাম।

হোক্কাইডোর আবহাওয়া দারুণ। একটু গরম থাকলেও বাতাস বহমান আছে। শীতকালে সব সময় শীতের ভারী জ্যাকেট, হাত ও পা মুজা, মাফলারসহ কতো কিছু বাইরে বের হওয়ার সময়ে পরতে হতো। কিন্তু এই সময়টায় চারপাশে  মুগ্ধকরা আবহাওয়া। রোদ, বাতাস আর হালকা গরমের দারুণ মিতালি।

সুইডেন হিল তৈরি হওয়ার পর থেকে আনুমানিক এক হাজারেরও বেশি বাড়ি সেখানে তৈরি হয়। হোটেল আছে আছে এক হাজারেরও বেশি। হোটেলে থাকতে  এক রাতের জন্য গুণতে হয় দশ হাজার ইয়েন।

তিন ভাগের এক ভাগ বাড়ি ব্যবহৃত হয় ছুটি কাটানোর জন্য। পর্যটকদের অবকাশ যাপনের জন্য এই বাড়িগুলো বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়েছে। অবকাশ যাপনের বাড়িগুলো দুই সপ্তাহ থেকে সর্বোচ্চ দুই মাস ভাড়া নেওয়া যায়। গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন পার্থক্যে এই ভাড়া আবার দুই রকম হয়।

সুইডেন হিলে পার্ক, টেনিস কোর্ট, গলফ ক্লাবসহ নির্মল বিনোদনের জন্য অনেক কিছু আছে। উৎসবের সময় পুরো সুইডেন হিল সুইডিশ স্টাইলে খাবার, লোকজ সংস্কৃতি প্রদর্শন, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, হ্যান্ড ক্রাফট ও গ্লাস ওয়ার্ক প্রদর্শন করা হয়। আর এই আয়োজনে থাকে সুইডিশ সেন্টার ফাউন্ডেশন। সেখান থেকেই বিভিন্ন উৎসবে সুইডিশ ঐতিহ্যবাহী পণ্য  কেনাবেচা হয়।

আমাদের পরিকল্পনা ছিল সুইডেন হিলের ভেতরে যে পার্ক ও রেস্তোরাঁ আছে সেখানেই মধ্যাহ্ন ভোজ করব। কিন্ত জাপানের কোনো একটা হলি ডে থাকায়  বন্ধের কারণে আমরা কোনো রেস্তোরাঁ খোলা পেলাম না।

এদিকে গাড়িতে নিয়ে আসা খাবার ফুরিয়ে গেছে। পেটের ক্ষুধা তো নিবারণ করতে হবে। আমাদের গাড়ি তখন সুইডেন হিল এরিয়ায় এগিয়ে যেতে যেতে ইংরেজি ও জাপানি ভাষায় সুইডেন হাউজ লেখা  একটি দোতলা কাঠের বাড়ির কাছে থামল৷

আমরা সবাই ঢুকে পড়লাম। দেয়ালে দেয়ালে সুইডেনের নানা রকম ছবি, সুইডিশ স্টাইলে কিচেন, বেডরুম, বেবি বেড রুম, ড্রইং রুম আর নানা রকম আসবাবপত্র। একটা বাড়িতে যা যা থাকে সবই সুইডিশ স্টাইলে আছে। আমরা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম৷ সেই হাউজে আমাদের ছবি তোলা ও ভিডিও করা তো চলছেই। তেমন কাউকে দেখছিলাম না। চিয়ো সান ডাকছিল, কেউ কি আছেন? এই বাড়িতে কেউ কি আছেন?

হঠাৎ একজন মহিলা বের হয়ে এলেন আচমকা। আমরা তো সবাই আঁতকে উঠলাম। উনি আমাদের ভয় পাওয়া দেখে হেসে উঠলেন। লাল রঙের স্কার্ট পরিহিতা ষাট-সত্তর বয়সী নারীটি এখানকার কেয়ারটেকার ও ম্যানেজার।

আমি মনে মনে ভাবছিলাম ঠিক এমন আসবাবপত্রসহ উন্মুক্ত একটা বাড়ি যদি আমাদের দেশে থাকতো তাহলে মুহূর্তে সব তছনছ হয়ে যেতো।  ঘন্টা খানিক ধরে আমরা ঘোরাঘুরি করছি অথচ বাইরে কোনো মানুষই চোখে পড়েনি।

আমাদের পেটে ক্ষুধা চাগিয়ে উঠলো। তখন সুইডেন হাউজের মহিলা ম্যানেজারের কাছে চিয়ো সান জানতে চাইল দুপুরে খাওয়ার জন্য কোনো রেস্তোরাঁ পাওয়া যাবে কি না।

উনি তার লাল গাড়িটা বের করলেন। আর আমাদের বললেন, তার পেছনে পেছনে যেতে। দশ-পনেরো মিনিটের দু'তলা একটা রেস্তোরাঁ দেখতে পেলাম। লাল স্কার্ট পড়া বৃদ্ধা আমাদের রেস্তোরাঁয় পৌঁছে দিয়ে চলে গেলেন।

রেস্তোরাঁয় ঢুকের চোখে পড়লো এর কোনায় কোনায় বইয়ের তাক । জাপানে হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, স্টোর সব জায়গায় কিছু হলেও বইয়ের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। বোঝা যায় জাপানিরা বই পড়তে ভালোবাসে।

সেখানে আমরা মিৎস্যু স্যুপ, স্যামন ফিশের কাটলেট, ডিমের পুডিং, চিকেন ফ্রাই, এভি ফ্রাই,  নুডুলস, ওনিগিরিসহ নানা পদের জাপানি প্লেট উপভোগ করলাম। সেই রেস্তোরাঁর নামটা এই ভুলে গেছি। সেখানকার মহিলা মালিক আমাকে একটা বাঘ আকৃতির শো পিস উপহার দিয়েছিলেন। আর বলেছিলেন, তুমি তো রয়েল বেঙ্গলের দেশের মেয়ে, তাই তোমাকে দিলাম। তুমি এখানে অতিথি হয়ে এসে আমাদের মনকে মুগ্ধ করেছো। তোমার প্রতি আমাদের পক্ষ থেকে ভালোবাসা। আমি ভীষণ রকম অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম।

বেশ খানিকটা সুন্দর সময় সেখানে পার করে আমরা আবার সুইডেন হিলের বাকি জায়গা দেখতে গাড়ি এক জায়গায় রেখে হাঁটতে শুরু করি। একটা বাড়ির সামনে ফুল বাগান দেখেই অভিভূত হয়ে যাই আমরা। আমরা সেখানেই একটু থামলাম। ফ্লক্স, গোলাপ, ক্যাকটাসসহ বেশ কিছু ফুলের বিলাসি রূপ চোখে লাগার মতো। এমন কি কুমড়া গাছের ফুলও মনকে মুগ্ধ করছে। কিছুক্ষণ পর একজন ব্রিটিশ মহিলা এগিয়ে এলেন। জানা গেলো তার নাম জায়মা সারাহ। দুই সন্তান নিয়ে সুইডেন হিলে বাড়ি কিনে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন। তারা স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই পেশায় ডাক্তার। অনেক বছর আগে এখানে সেচ্ছাসেবক হয়ে এসেছিলেন চিকিৎসা দিতে। তারপর জাপানের সুইডেন হিলের সৌন্দর্যের প্রেমে পড়েন। সেই থেকে এই দম্পতি সন্তানদের নিয়ে এখানেই ভালোবাসার বসতি গড়েছেন। অনেকক্ষণ জায়মা সারাহর সাথে সুইডেন হিলের জীবন নিয়ে গল্প  হল।

এরপর আরও কিছুটা সময় চারপাশের সবুজ প্রকৃতি আর নানা রকম শৈল্পিক স্থাপত্য দেখতে দেখতে বাড়ির পথে রওয়ানা হলাম আমরা।গাড়ি থেকে যে দিকে চোখ বিস্তৃত হয়েছে শুধু মুগ্ধতা আর মুগ্ধতা। হৃদয়ের মনিকোঠায় একটা সুন্দর নিভৃত গ্রাম সুইডেন হিল আজীবনের সমৃদ্ধ স্মৃতি হয়ে রইল।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক