ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনে রোগী ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের দুর্ভোগ

মো. খালেদুন
Published : 19 March 2018, 01:27 AM
Updated : 19 March 2018, 01:27 AM

ঢাকার ফুটপাতও যখন প্রতিবন্ধীবান্ধব হয়ে উঠছে ঠিক তখনি রাজধানীর বুকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনটি যেন তার ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে! স্টেশনটিতে প্রবেশের জন্য পাশাপাশি দুটো গেট রয়েছে। এর মধ্যে একটি গেটে র‌্যাম্প আছে, কিন্তু সেই গেটটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গেটটি বন্ধ থাকায় পক্ষাঘাতস্থ ব্যক্তি, অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ রোগী যারা হাঁটতে অক্ষম, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তি (প্রতিবন্ধী) বিশেষ করে যাদেরকে হুইল চেয়ার ব্যবহার করতে হয় এমন ব্যক্তিরা স্টেশনে প্রবেশের সময় জটিল সমস্যায় পড়েন। আর এই সমস্যার পেছনে স্টেশন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা বা অবহেলাকেই ‍দুষলেন ভুক্তভোগীরা।


ছবি: এভাবেই সবসময় বন্ধ রাখা হয় র‌্যাম্পযুক্ত গেটটি

স্টেশনটিতে প্রতিবন্ধীদের স্বাভবিক প্রবেশগম্যতা না থাকায় ২০১৫ সাল থেকে ‍এমন পরিস্থিতির ভুক্তোভোগী শারিরীক প্রতিবন্ধী নাজমুস সাকিব। 'রিমোটয়েড আর্থ্রারাইটিস ও এনকাইলজিং স্পন্ডিলাইটিস' রোগে আক্রান্ত হওয়ায় নাজমুস সাকিব হাঁটতে পারেন না। তার চলার সঙ্গী হুইলচেয়ার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে পড়া শেষ করেছেন তিনি।

নাজমুজ সাকিব জানান, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে প্রায়ই মৈত্রী এক্সপ্রেসে ভারতে যেতে হয়। কিন্তু স্টেশনে গেলেই প্রতিবার তাকে এই সমস্যায় পড়তে হয়। র‌্যাম্পযুক্ত গেটটা বন্ধ থাকায় তিন-চার জন মিলে হুইলচেয়ার তুলে ধরে স্টেশন প্রবেশ করান। র‌্যাম্পযুক্ত গেটটা খুলে দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ জানালেও কোনো ইতিবাচক ফল পাননি সাকিব।


ছবি: হুইলচেয়ার তুলে ধরে সিঁড়ি পার করা হচ্ছে সাকিবকে

গত ৬ মার্চ স্টেশনে ঢোকার মুহূর্তের একটি ভিডিও নেন নাজমুস সাকিব। ভিডিওটিতে দেখা যায়, সাকিবকে হুইল চেয়ারে চ্যাংদোলা করে স্টেশনে ঢোকানো হচ্ছে এবং পাশের র‌্যাম্পযুক্ত গেটটি তালাবদ্ধ রয়েছে। র‌্যাম্পযুক্ত কলাপসিবল গেটটিতে ট্রেনের সময়সূচির একটি ব্যানার ঝোলানো রয়েছে। সাকিব বলেন, "এইটা আমি সেই ২০১৫ থেকেই দেখছি। বারংবার বলার পরও কোন কাজ  হয়নি। সরকারি ভবনেই সরকারি আইন অগ্রাহ্য করা হচ্ছে!"

https://www.youtube.com/watch?v=7Sqv7zM17b0

কেউ আগ্রহী হলে শুক্রবার, শনিবার, রবিবার ও বুধবার সরাসরি স্টেশনে গিয়ে দেখতে পারেন। এই চারদিন সকাল সোয়া আটটায় ঢাকা থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে মৈত্রী এক্সপ্রেস ছেড়ে যায়। অথবা শনিবার, সোমবার, শুক্রবার বা মঙ্গলবার বিকেল ছয়টায় স্টেশনে যেতে পারেন, ঐদিন কলকাতা থেকে ঢাকায় আসে মৈত্রী এক্সপ্রেস।

নাজমুস সাকিব বলেন, স্টেশন কর্তৃপক্ষের আচরণে আমি মর্মাহত। আমার মত অনেকেই এই সমস্যায় পড়েন। এই রুটে যাতায়াতকারীদের বড় অংশই বাংলাদেশ থেকে ভারতে উন্নত ট্রিটমেন্টের জন্য যাওয়া রোগী। যাদের মধ্যে পক্ষাঘাতগ্রস্থ ও বয়স্ক লোকের সংখ্যা অনেক। স্টেশনে প্রবেশের সময় তাদের হুইলচেয়ার উঁচু করে তুলে ধরে ঢোকানো হয় তাদের। আবার ট্রেনে ওঠার সময়ও সমস্যায় পড়তে হয়। প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনের দরাজা তিন ফুট উপরে এবং দরজা এত সংকীর্ণ যে কোন হুইলচেয়ার প্রবেশ করতে পারে না। কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করলে তারা কোন সদুত্তর দিতে পারে না। শুনেছি ওঠার জন্য ঢালু সিঁড়ি আছে কিন্তু সেটা চোখে দেখার ভাগ্য হয়নি!


ছবি: 'ইমারত নির্মাণ আইন- ২০০৮' এর ৬৪ ধারায় প্রতিবন্ধী সহ সর্বজনীনগম্যতা নিশ্চিত করনের বিধান

তবে ভারতের রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে এমন সমস্যায় পড়তে হয়নি তাকে। সাকিব বলেন, "প্লাটফর্ম থেকে ট্রেনের দরজার খুব কাছাকাছি, প্লাটফর্ম থেকে হুইলচেয়ার মাত্র ১৭ ইঞ্চি উল্টো করে পেছনে দিক করে সহজেই নামানো যায়। আর সর্বত্রই র‌্যাম্প আছে, এমনকি এক প্লাটফর্ম থেকে অন্য প্লাটফর্মে যাওয়ার ফুটওভার ব্রিজটাতেও র‌্যাম্প আছে!"

আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'ইমারত নির্মাণ আইন- ২০০৮' এর লঙ্ঘন করেই চলেছেন স্টেশন কর্তৃপক্ষ। সরকারি প্রতিষ্ঠানেই আইন বাস্তবায়নে কেন এত অবহেলা? কবে এই আইনের সফল প্রয়োগ দেখব? প্রশ্ন সাকিবের।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক