২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

একটি গাছ ও এক যুবকের লড়াই

বিপ্লব মল্লিক

Published : 24 Jan 2018, 02:32 PM

Updated : 23 Jun 2022, 11:13 PM

আমাদের সমাজটা বড্ড দুঃসময়ের মাঝে বসবাস করছে। এই সমাজটা আজ চারিদিকে অনিয়মের রাজত্বে যেন মৃত হতে চলছে। চারিদিকে চলছে অনিয়মের হাহাকার। প্রশ্নপত্র ফাঁস, ঘুষ, দুর্নীতি, ভূমি দখল, দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, ক্ষমতাবানদের দাপুটে মহড়া। কেউ অসৎ উপার্জনে অট্টালিকা বানিয়ে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নে ভিভোর। কেউবা সম্পদের পাহাড় বানাতে ব্যস্ত। তখনই এক যুবক যুদ্ধ করছে একটা গাছকে বাঁচাতে। কি লাভ তাঁর এই গাছকে বাঁচিয়ে। তাও আবার সেই গাছটা একটি রাস্তার উপর। যেটি সরকারি সম্পদ হিসাবে বিবেচ্য। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো মানুষরা আজ আমাদের সমাজে নেই। আর যারা আছে তারা নষ্টদের কবলে পড়ে পিষ্ট। যারা পৃথিবীর মানুষেকে ভালোবাসে, সমাজকে ভালোবাসে তারা হয়ত অনেক সামাজিক অধিকার নিয়ে প্রতিবাদ করে। যে যুবকের কথা বলছিলাম তার নাম আবু সাঈদ সিডল, যিনি একটি গাছকে বাঁচাতে উপজেলা নির্বাহীকে চিঠি পর্যন্ত দিয়েছেন।

.

সেই গাছকে বাঁচাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকতার কাছে সরাসরি তার অভিযোগের কথা বলেছেন। জানি না উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিরবে হেসেছিলেন কিনা। সামান্য একটি গাছ তার জন্য এত দরদ! আবারও এও জানি না, তিনি হয়ত গাছটার জন্য আহত হয়েছিলেন কিনা। তবে তিনি এই যুবকের সামনেই টেলিফোনে এক ইঞ্জিনিয়ারকে বলেছেন, যদি সমস্যা না হয় তাহলে গাছটা মারার দরকার নেই।

এবার জানাই, সেই গাছটির নাম বটগাছ। গাছটি যশোর জেলার চৌগাছা থানার হাকিমপুর ইউনিয়ন অন্তর্গত বকশিপুর গ্রামের এক রাস্তার তে মাথায় অবস্থিত। গাছটি লাগিয়েছেন ঐ গ্রামের বাসিন্দা শেখ শামসুল আলম। তিনি আজ দশ বছর ধরে সন্তানের মতো লালন পালন করে আসছে গাছটি। মূল রাস্তার সাথে আরেকটি রাস্তা পিচ হবে এজন্য গাছটি কাটা পড়বে। গাছটা বাঁচানোর আকুতি ক্ষমতাবানদের বাড়া ভাতে ছাই দেওয়ার মতো অবস্থা। তাই যেন গাছটি কেটে ফেলতে পারলেই ক্ষমতাবানরা তাদের আত্নতৃপ্তিতে ডুব দিবে। তবে এলাকার সাধারণ মানুষ বলছে, ওই এলাকার চেয়ারম্যান ও দুষ্ট মানুষরা নিজেদের আত্নতৃপ্তির জন্য বেশ প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এদিকে যুবকের অভিযোগকে হটিয়ে নিজেদের জয়ীকে এক নতুন মানদণ্ডে মাপতে চাচ্ছে। এটা বরাবরই ক্ষমতাবানদের আভিপ্রায়।

জানি না যুবকটি সফল হবে কিনা। অন্যদিকে আশেপাশের মানুষগুলোও রয়েছে গাছটি না কাটার পক্ষে। এদেশে বরাবরই সামাজিক দায়িত্বগুলোর জন্য প্রতিবাদ হাস্যকর ক্ষমতাবান লোভীদের কাছে। যেখানে মানুষের কোন লভ্যাংশ নেই তার পেছনে থাকা মানুষদেরকে আমারা নির্বোধদের লিস্ট এ অন্তর্ভূক্ত করি। সাথে সাথে থাকে তিরস্কার। এই সমাজের সাধারণ মানুষের পাশে আছে গণমাধ্যম। তাছাড়া আর কেউ কেউ। তারপরও মিডিয়ার নিযুক্ত কলমের পেছনে রয়েছে অদৃশ্য কালো হাত।

আমরা জানি অতি প্রাচীন কাল থেকে বটগাছ মানুষের বড্ড প্রিয়। ক্লন্ত পথিক ও নানা মানুষের দল বট গাছের তলে বসে নিজেদের প্রাণ জুুড়িয়ে নেয়। তবে এই বটগাছকে বাচাঁতে তার সাথে যুক্ত হয়েছে আরও কয়েক যুবক। প্রয়োজনে তারা মানববন্ধন করতেও প্রস্তুত আছে বলে জানা গেছে। চলছে গাছটাকে হত্যা করার নানা জল্পনা-কল্পনা। হয়ত গাছটা যিনি লাগিয়েছিলেন পথচারীদের জন্য, গাছটার মৃত্যু তাকে আপনজনের চলে যাওয়ার মতোই হয়ত কষ্ট দিবে।

এই সমাজে গাছ কাটার মানুষের অভাব থাকলেও গাছ লাগানোর মানুষের বড্ড অভাব। আমরা আগেই জেনেছি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা যশোর শহর থেকে বেনাপোল পর্যন্ত রাস্তার দৈর্ঘ্য ৩৮ কি.মি.। এর মধ্যে দুইশোর অধিক গাছ রয়েছে যেগুলোর বয়স ১৭০ বছরের বেশি। গাছগুলোর সাথে জড়িয়ে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক ঘটনা এবং স্থানীয় মানুষের আবেগ বিজড়িত স্মৃতি। তবে রাস্তা সম্প্রসারণের অজুহাতে গাছগুলোর কবর রচনার প্রস্তুতি চলছে। প্রকৃতিপ্রেমী ও পরিবেশবাদীরা এরপর থেকেই যশোর রোডের গাছ যাতে না কাটা হয় সেটা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে বেশ কয়েক দিন ধরেই সমালোচনা করছে। তবে জানি না গাছগুলোর ভাগ্যে কি আছে।

এদেশে ক্ষমতাবানরা বরাবরই গাছের শত্রু। যখন যেভাবে ইচ্ছা সরকারি গাছগুলো মেরে তাদের ঝুলি ভরার জন্য নানা রকম ফন্দি তৈরি করে। কারণ সমাজটা নষ্টদের দখলে। গাছ আমাদের বন্ধু। আসুন সবাই মিলে একটি গাছ হলেও বাঁচায়। এই সুন্দর পৃথিবী নতুন করে উপহার দিই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। শুভ কামনা সবার জন্য।

-বিপ্লব মল্লিক