এলিজি ফর সাগর-রুনি

ফারদিন ফেরদৌস
Published : 10 Feb 2016, 10:33 AM
Updated : 10 Feb 2016, 10:33 AM

বিশুষ্ক পাতাঝরা শীতের দিন শেষে প্রকৃতিতে নেশা লাগা অমৃত বসন্ত সমাগত। কিন্তু আজ প্রকৃতির মন খারাপ করা ঝিমুনি আর শীতনিদ্রা যেন কিছুতেই কাটছে না। কুয়াশা অস্বচ্ছতায় আবদ্ধ শোকবিহবল আনত দৃষ্টিতে অশ্রুজলের সায়র। সুরটা সাধতেই পারছে না ঋতু বন্দনার হুইশেল ব্লোয়ার কৃষ্ণকায় সুকন্ঠী কোকিল। ওহে চিরজাগরুক মৃত প্রাণপ্রদীপ একবার জ্বলে উঠো। দেখে যাও, কেমন উথাল পাথাল চলছে আজ ৯ বছরের শিশু মাহির সারোয়ার মেঘের মনে। তা জানে কেবল নীড় হারা পাখিরা। জানে চাপিয়ে দেওয়া বঞ্চনায় পিষ্ট নিঃস্ব মানবেরা।

Our death is not an end if we can live on in our children and the younger generation.
For they are us, our bodies are only wilted leaves on the tree of life.
-Albert Einstien

চার বছর আগে ঠিক এমন একটি দিনেই দুর্ভাগা ও মনপোড়া মেঘকে পিতা মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ারের পরম আশ্রয় ও মাতা এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনির অনি:শেষ মমতা থেকে বঞ্চিত করেছিল কোন এক অস্পৃশ্য অন্ধকার জগতের হায়েনারা। কখনো কখনো সেই হায়েনারাও রাষ্ট্রযন্ত্রের চেয়ে বিশাল হয়। রাষ্ট্রও হার মানে অন্ধকার হায়েনার কাছে এই বাংলাদেশে। ৪৮ ঘন্টার হার মানা অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হয় ৩৫ হাজার ঘন্টা ধরে বা তারও অধিক। তবে কী অসহায় ভীষণ বঞ্চিতজনেরা নিরন্তর বয়ে বেড়াতেই থাকবে প্রলম্বিত বিচার প্রার্থনার এমন দুর্বিষহ হাহাকার!

হে প্রবল সক্ষমতার উটপাখি কী জবাব আছে শিশু মেঘের কাছে তোমার? কী জবাব আছে নিজের বিবেকের কাছে? জানি নিরুত্তর তুমি এবং তোমরা!

জাতির স্থপতি ও তাঁর পরিবারের সাথে নির্মমতার বিচার, জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার এবং একাত্তরের পরাজিত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয় এখানে এই প্রিয় বাংলাদেশেই। কলঙ্কমুক্ত আমরা। ওই মাপের না হোক, সাগর রুনিও ছিল মানুষ অথবা মেঘের কাছে তারও বেশি। তবে তাদের বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদতেই থাকবে এই কেমন চেপে বসা কৃত্রিম নিয়তি হৃদয়ে রক্তঝরা সুশান্ত মেঘের?

৪৮ ঘন্টার ঐতিহাসিক প্রবক্তা সাহারা খাতুন, পিলার ঝাকনেওয়ালা মহিউদ্দিন খান আলমগীর কিংবা নতুন তাদন্তিক সিপাহশালার আসাদুজ্জামান খান হয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা আকাশ ছুঁয়েছে মানতে হবে আপনাকে। তবে মহান ঈশ্বরের ঝুলিতেও কী কেবল ব্যর্থতারই গ্লানি? হয়ত তাই।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় মৃত্যুর বিভীষিকা ও অনিবার্য শূণ্যতা উপলব্ধি করেছিল অতি কান্নায় চোখে জলহীন মেঘ। সেদিন রাতে মহান ও পরাক্রমশালী ঈশ্বর সাগর ও রুনির আত্মাকে বলেছিলেন, বেরোও। আত্মারা বলেছিল, আমরা স্বেচ্ছায় বেরোব না। প্রভু বললেন, অনিচ্ছায় হলেও বেরোও। প্রভুর চাপে দু'টি সতেজ সজীব উচ্ছ্বল আত্মা দেহ থেকে বেরোলে চারজন ফেরেশতা শূণ্যে ভাসমান আত্মা দু'টির সাথে দেখা করে তা গ্রহণ করে উর্ধ্বে আরোহন করে। অন্ধকারের বাসিন্দা দুর্বৃত্তের খেয়ালীপনা ও চরম নির্মমতায় বেরোনো মেঘের কান্না ভেজা তারই জনক জননীর আত্মার সুগন্ধে ঈশ্বরের আস্তানা সুবাসিত। আসমানবাসীগণ সমস্বরে উচ্চারণ করে, পৃথিবী থেকে দু'টি পবিত্র রুহের আগমন ঘটেছে। হে রুহ! তোমাদের প্রতি এবং যে দেহ তোমরা আবাদ করেছিলে তার প্রতি মহান ঈশ্বরের শান্তি বর্ষিত হোক। অনন্তর প্রতিপালক কেয়ামত পর্যন্ত আত্মা দু'টিকে যত্নে রাখবার জন্য নির্দেশ দেন। ধর্মমতে দেহাতীত আত্মার গতিটা এমন সুখকর ছিল বটে। তবে অস্পৃশ্য হায়েনাদের সহায়তায় আত্মাকে দেহচ্যুত হতে বলেছিলেন ঈশ্বর। বলা যায়, মহান ঈশ্বর সেদিন ওই হায়েনাদেরই পরম মিত্র ছিলেন। একে ঈশ্বরের ব্যর্থতার গ্লানি না বলুন অন্তত রহমত বলবেন না!

ভয়ঙ্করভাবেই দেখা যাচ্ছে দুর্বৃত্তদের পক্ষাবলম্বনে রাষ্ট্রযন্ত্র আর ঈশ্বরের কারিকুলাম সেদিন মিলে গিয়েছিল সোনায় সোহাগায়। সাগর রুনির করুণ মৃত্যু নিয়ে ঈশ্বর ও সরকারের এমনতর মাসতুতো ভাই কারবার চলেছে, চলছে আর আমাদের হৃদয় বিদীর্ন হওয়া দীর্ঘশ্বাস ও হাহাকার ফেনিল সমুদ্রের মতোই বাড়ছে কেবল।

সাগর রুনির মতো আলোর পথের দিশারীদের হন্তারকরা বিশাল পুরষ্কারে ভূষিত হচ্ছেন অন্ধ, বোবা ও বোধহীন রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছ থেকে। উদাহরণ চোখের সামনেই জাজ্বল্যমান। ‌তদন্তে প্রমাণিত সত্য নারায়ণগঞ্জের প্রগতিপুত্র মেধাবী ত্বকী হত্যাকারীদের ইন্ধনদাতা কিংবা সাত খুনের প্রধান আসামী নূর হোসেনদের ঈশ্বরপিতা শামীম ওসমান গং কিংবা মাতাল হয়ে শিশু সৌরভের পায়ে গুলি করা গাইবান্ধার মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনরাই এখন দেশের আইন প্রণেতা। পরিহাস উনারা মহান সংবিধানকে স্রেফ সঙবিধান ঠাওরে যাচ্ছে তাই আইন বানাবেন সেই আইন আমরা সুবোধ বালকের মতোই মেনে চলব। নইলে আর রক্ষা নাই জানবেন।

জানা যাচ্ছে, আপাত রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে পুরষ্কারের ঘাটতি আছে। তাই রাষ্ট্রের ছায়াতলে আরাম করা মহান ঈশ্বরের বন্ধু সাগর রুনির নির্মম হন্তারক অস্পৃশ্য হায়েনাদের মুখোশ উন্মোচন হচ্ছে না। আপাতত: বিটিএন বাংলা বা সিটিএন নিউজ নামীয় টেলিভিশন চ্যানেলের স্টক সমাপ্ত। যখনই জানা যাবে, ওই অন্ধকারের হায়েনাদের জন্য ওইরূপ বিশাল উপহারের ডালি সাজানো গেছে, তৎক্ষণাত তাদের টিকিটা আপনারা ছুতে পারবেন। সরকারে আস্থা রাখুন, নিশ্চিত দরকারে আসবে। আর কত পরিহাস এমনতর! সত্যি জানা নেই।

এবার একটি 'প্রোফেসি' কল্পনা করি। মাহির সারোয়ার মেঘ বড় হয়ে বাবা মা'র মতোই দুর্দান্ত ও নামী সাংবাদিক হয়েছে। মেঘের নামে অন্ধকারের সারথীদের ঘুম বেমালুম হারাম। সেদিন এসময়ের রাষ্ট্রনায়করা থুত্থুরে বুড়ো সব। কথা বলতে গলা কেঁপে কেঁপে উঠে। ঘটনাক্রমে সেই প্রজ্ঞাবান বুড়ো বা বুড়িদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার দায়িত্বটা আমাদের মেঘই পেয়েছে। দৃপ্ত কন্ঠে মেঘের প্রশ্ন সাবেক রাষ্ট্রনায়কদের।
: স্যার আপনারাতো এখন দায়িত্ববান কেউ না। আপনাদের নিয়ে আমি যা খুশি নাটক করতে পারি।
: কি বলছো, নাটক? আমাদেরকে লোকে দেখতে যাবে কোন দু:খে।
: যে কারণে আমার মা মেহেরুন রুনি ও বাবা সাগর সারোয়ার দুর্বৃত্তের হাতে মারা যাওয়ার পর কঙ্কাল পরীক্ষার নামে, সেসময় পাঁচ বছরের এই শিশু আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে, বিচারের আশ্বাস প্রহসনের নামে, আমার মা বাবার পরিবারের সাথে যে নাটকগুলো করে জনসাধারণ্যে দেখিয়েছিলেন, ঠিক সে কারণে।
: আমরা ঠিক কিছু বুঝে উঠতে পারছি না বাছা।
: আপনারা কবেই বা কী বুঝে উঠতে পেরেছিলেন? নিজেদেরটা ছাড়া!

মেঘ তোমার সামনে বিনম্র, বিব্রত ও বেদনাতুর আমরা অবনত মস্তক। আমাদের ক্ষমা করো না তুমি। ক্ষমা করোনা না সাগর রুনি আলোকবর্তিকারা।

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সাগর রুনি'র চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে মাহির সারোয়ার মেঘ ও আমাদের শোকের এই দিনে জীবনানন্দ দাশ বড় প্রাসঙ্গিক-
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোন প্রেম নেই– প্রীতি নেই–করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।

লেখকঃ সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
facebook.com/fardeen.ferdous.bd
twitter.com/fardeenferdous

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক