আবরার হত্যার ৭ বছর: আপিল বিভাগে বিচারের অপেক্ষা
“আমার চাওয়া, মামলাটি যেন বিশেষ বিবেচনায় কার্যতালিকায় এনে বিচারকাজ সম্পন্ন করা হয়,“ বলেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ।
চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা।
সাত বছর আগের এ মামলার দুই ধাপের বিচার শেষ হলেও চূড়ান্ত বিচার শেষ হতে কত সময় লাগবে, তা বলতে পারছে না কোনো পক্ষই।
তবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালতে মামলার বিচার শুরু হলে শুনানির ক্ষেত্রে কোনো 'মুলতবি' চাইবে না রাষ্ট্রপক্ষ।
আর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, সাধারণত আপিল বিভাগে মামলার শুনানি হয়ে থাকে সন-তারিখের ভিত্তিতে। ক্রম অনুসারে মামলাগুলো কার্যতালিকায় ওঠে। এ মামলার ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি 'অগ্রাধিকার' দিলে দ্রুত শুনানি হতে পারে।
অন্যদিকে আবরার ফাহাদের পরিবারের প্রত্যাশা, বিচার দ্রুত সম্পন্ন করে যেন দণ্ডিতদের সাজা কার্যকর করা হয়।
বিচারিক আদালতের দেওয়া ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে এক বছর আগে এ মামলায় রায় দেন হাই কোর্ট।
এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করলেও রায়ে সন্তুষ্ট রাষ্ট্রপক্ষ কোনো আপিল করেনি।
জানতে চাইলে আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আপিলের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ম অনুযায়ী দুই পক্ষকে কনসাইজ স্টেটমেন্ট বা সারসংক্ষেপ জমা দিতে হয়। এরপর পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়।”
“পেপারবুক প্রস্তুত হওয়ার পর তা শুনানির জন্য চেম্বার জজের মাধ্যমে ফিক্স করতে হয়। তবে চেম্বার আদালত থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কনসাইজ স্টেটমেন্ট চাওয়া হয়নি। তাছাড়া আপিল শুনানির জন্য মক্কেলদের কাছ থেকে কোনো নির্দেশনাও এখনও পাইনি।”
প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক তৈরি করা হয়েছে জানিয়ে আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলাটি এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন, তবে কার্যতালিকায় আসেনি। কবে শুনানি হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না।”
এই আইনজীবী বলেন, “আপিল বিভাগের মামলা সন-তারিখের ভিত্তিতে শুনানি হয়ে থাকে। প্রধান বিচারপতি চাইলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলাটি শুনতে পারেন। তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য আসামিপক্ষের উদ্যোগ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
মামলার প্রেক্ষাপট
২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের শেরে বাংলা হলে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আবরার ফাহাদকে। এ ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ।
৩৭ দিনে তদন্ত শেষ করে ১৩ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান।
পরে ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মামলার বিচার শুরু হয়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান রায় ঘোষণা করেন।
সেদিন জনাকীর্ণ আদালতে ২০ আসামির সর্বোচ্চ সাজার রায় ঘোষণা করে বিচারক বলেন, “মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাদের গলায় ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ প্রদান করা হলো।”
বিচারিক আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হাই কোর্টের অনুমোদন লাগে। এজন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুসারে বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলার যাবতীয় নথি হাই কোর্টে পাঠাতে হয়, যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত।
২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি আবরার হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স হাই কোর্টে আসে। অন্যদিকে আসামিরাও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পেপারবুক উপস্থাপনের মধ্যদিয়ে শুনানি শুরু করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরে আসামিপক্ষও শুনানি করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষ হলে গত বছর ১৬ মার্চ রায় ঘোষণা করে হাই কোর্ট।
রায়ে ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়।
হাই কোর্ট রায়ে বলে, “এ মামলায় বিচারিক আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে হস্তক্ষেপ করার মত কোনো উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের আবেদন (ডেথ রেফারেন্স) মঞ্জুর এবং আসামিদের আপিল খারিজ করা হলো।”
মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা ২০ আসামির সবাই বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তারা হলেন- মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মেফতাহুল ইসলাম, মো. মাজেদুর রহমান, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল জেমি, মো. শামসুল আরেফিন, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ।
এ ২০ জনের মধ্যে বিচারিক আদালতের রায়ের সময় থেকেই তিনজন পলাতক। তারা হলেন মোর্শেদ-উজ-জামান, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামি মুনতাসির আল জেমি ২০২৪ সালের ৬ অগাস্ট গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যান। বিষয়টি গত বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায় কারা কর্তৃপক্ষ।
সে হিসাবে হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আপিল করেছেন ১৬ জন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচজন লিভ টু আপিল করেছেন।
‘মুলতবি চাইবে না রাষ্ট্রপক্ষ’
আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখায় হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেনি বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তবে আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান কী হবে, তা তুলে ধরে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ মামলায় আপিল বিভাগে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হচ্ছেন দণ্ড বা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। তারাই কিন্তু আপিল করেছে। ফলে প্রাথমিকভাবে তাদেরই দায়িত্ব হচ্ছে দ্রুত আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তি করা।”
কাজল বলেন, “আমাদের অবস্থান হচ্ছে, আমরা কোনো মামলাতেই বিলম্ব ঘটাতে চাই না। প্রত্যেক নাগরিকের দ্রুত বিচার প্রাপ্তির যে সাংবিধানিক অধিকার, আমরা চাই সেটা নিশ্চিত হোক। আপিল বিভাগে এ মামলার শুনানি শুরু হলে শুনানির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো রকম বিলম্ব ঘটানো হবে না। আমরা কোনো মুলতবি প্রার্থনা করব না।”
তিনি বলেন, “আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত আলোচিত একটি ঘটনা। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত হওয়া উচিত।”
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা তো সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রথম থেকেই আবেদন জানাচ্ছি, যেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয়। এ বিষয়ে কোনো লিখিত আবেদন না করলেও তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল ও বর্তমান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে মৌখিকভাবে আরজি জানিয়েছিলাম।”
বরকত উল্লাহ বলেন, “বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আমার আবেদন, যেন মামলাটি বিশেষ বিবেচনায় কার্যতালিকায় এনে বিচারকাজ সম্পন্ন করা হয়।”
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর আবরার ফাহাদকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক দেয়। বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা এটি।
‘আবরার হত্যাকাণ্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত’
২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখার রায়ে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডকে পূর্বপরিকল্পিত বলেছে হাই কোর্ট।
রায়ে বলা হয়, এ হত্যাকাণ্ড হঠাৎ ঘটেনি। এর আগে ৫ অক্টোবর একটি সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে আবরারকে হত্যা করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের ২৭ নম্বর সাক্ষী বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ওবায়দুর রহমান রাফসান এবং ২২ নম্বর সাক্ষী মো. গালিবের সাক্ষ্যে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে বলে রায়ে তুলে ধরা হয়।
আবরারকে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বলে রায়ে বলা হয়।
হাই কোর্ট বলে, “নির্মম নির্যাতন করে কাউকে পিটিয়ে মারার ক্ষেত্রে এটি কোনো কারণ হতে পারে না।”
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের মক্কেলদের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও তারা ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না, এমন কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি বলে রায়ে বলা হয়।
কয়েকজন আসামিকে আবরারকে মারধরে সরাসরি অংশ নিতে এবং অন্যদের ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে তা দেখতে দেখা গেছে। তাদের কেউ আবরারকে উদ্ধারের চেষ্টা করেননি। এ কারণে তাদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে বলে হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ।
রাষ্ট্রপক্ষের ৩১ নম্বর সাক্ষী চিকিৎসক সোহেল মাহমুদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রায়ে বলা হয়, আবরারের শরীরের আঘাতের স্থানে রক্ত জমাট বেঁধেছিল এবং তার আঘাতগুলো ছিল প্রাণঘাতী নরহত্যামূলক।
রাষ্ট্রপক্ষের পঞ্চম সাক্ষী চিকিৎসক মো. মাসুদ এলাহীর সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে হাই কোর্ট বলে, আবরার অজ্ঞান ছিলেন এবং যথাযথ চিকিৎসা বা যত্ন পেলে বেঁচে যেতে পারতেন, আসামিপক্ষের এমন দাবি মামলার প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক নয়।
আবরারকে ঘটনাস্থলে হত্যা করা হয়নি বা অন্য কোথাও হত্যা করা হয়েছে, এমন দাবিও আসামিপক্ষ করেনি বলে রায়ে বলা হয়েছে।
আসামিদের নিজস্ব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে আদালত মত দেয়।
