রাঙ্গুনিয়ায় ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্পে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের 'গড়িমসি'

পাঁচ বছরে শুরুই হয়নি প্রকল্পের কাজ; টাকা জমা দেওয়ার এতদিন পরও প্লট না পেয়ে এলাকাবাসীদের অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Nov 2023, 02:27 PM
Updated : 30 Nov 2023, 02:27 PM

নগরমুখী হওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ এর আওতায় নেওয়া আবাসন প্রকল্পের কাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি।

নগরী থেকে দূরে রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থিত চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কাছে ১৯৫ প্লটের এ আবাসন প্রকল্পের জন্য এলাকাবাসীর অনেকে টাকা দিলেও এখন পর্যন্ত প্লট পাননি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের 'গড়িমসির' কারণে তারা এতদিনেও এ প্রকল্পে প্লট বুঝে পাচ্ছেন না।

তারা জানান, ২০১৮ সালে হাতে নেওয়া এ প্রকল্পে প্লট বরাদ্দের জন্য আবেদন চাওয়া হলে ৫-৬ গুণ বেশি আবেদন জমা হয়। উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে কর্মরত। এ কারণে অনেকেই এ প্রকল্পে প্লট পেতে আবেদন করেন। দ্রুত তারা প্রকল্পটি শেষ করে বুঝিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

‘চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প’ শীর্ষক এ প্রকল্প ২০১৮ সালে হাতে নেয় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ২০২১ সালে এটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও কাজই শুরু হয়নি। যেসব স্থানীয় সুবিধাভোগী এ প্রকল্পের আওতায় আসার কথা রয়েছে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় তাদের অনেককেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের গাফলতির জন্য নয় বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্রের জটিলতা থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লেগেছে বেশি।

২০১৮ সালে ১৬ দশমিক ১৯ একর জমিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পরে দুই একর বাদ দিয়ে ১৪ দশমিক ১৯ একর জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়।

পরে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (পিজিসিবি), আইএমইডি, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সার্ভে ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ছাড়পত্র গ্রহণ করে ১৩২ কেভি বৈদ্যুতিক লাইন ও উঁচু টিলার অংশ বাদ দিয়ে প্রকল্প এলাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০২১ সালে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও কাজই শুরু হয়নি।

প্রকল্পের বিষয়ে খোঁজ নিতে ঢাকায় আসা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কার্যালয়ের সামনে। তাদের অভিযোগ, বারবার মেয়াদ বাড়ানোর পেছনে এটি থেকে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বাড়তি আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এজন্য তারা প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এ কারণে কাজে বড় অগ্রগতি নেই।

রাঙ্গুনিয়ায় বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেলের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের আবাসন নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকলেও নিজেদের উন্নয়নেই বেশি মনোযোগী জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তা। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও সমন্বয়) মোসলেহ উদ্দীন আহাম্মদ বারবার ছাড়পত্রের বিষয়টিকে বারবার সামনে আনার কারণেই প্রকল্পের কাজ বেশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে তারা শুনেছেন।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর প্রকল্পের বাস্তবায়নে ছাড়পত্র দিয়েছে। এখন আবারও ছাড়পত্র চাওয়া হচ্ছে। এতে বিস্মিত হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। কারণ এক প্রকল্পে দুবার ছাড়পত্র দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

“এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার প্রথম থেকেই পাহাড়/নিচু টিলা না কেটে ভরাট করার কথা বলেন। কিন্তু প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের পাহাড় কাটার দিকেই ঝোঁক। দ্বিতীয়বার পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র চাওয়ার পেছনে সংশ্লিষ্টদের অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এছাড়া রাউজানে তিন ফসলি আবাদি কৃষি জমির ওপর এমন একটি প্রকল্প করা হচ্ছে। এতেই বোঝা যায়, তাদের কৃষিজমির ওপরই প্রকল্প করার প্রবণতা বেশি। অথচ ফসলি জমি রক্ষার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না।”

তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য চাওয়া হলে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য মোসলেহ উদ্দীন আহাম্মদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আপনি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেন।”

কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "এই প্রকল্পে কোন ধরনের কালক্ষেপণ হচ্ছে না। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। এখানে প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ার এর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে এর কোন কারণ আমার জানা নেই। এখানে কাজ করতে গেলে অনেক ছাড়পত্র নিতে হয়।"

পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্য প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র দেওয়ার পরও কাজের অগ্রগতিতে ধীরগতি এবং বার বার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, "পরিবেশ অধিদপ্তর যে ছাড়পত্র দিয়েছে সেখানে অনেক বিষয় নিষেধ করা আছে, বিশেষ করে পাহাড় কাটা যাবে না, ভরাট করে করতে হবে এগুলো তো বললেই হয়ে যায় না। আপনি ভালো করে দেখুন কাজ করতে হলে ভালোভাবে সব বিষয় মাথায় নিয়েই করতে হয়।"

এ প্রকল্পে কোনো গাফলতি নেই বলেও দাবি তার।