০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ: ময়মনসিংহের তিন দণ্ডিতের জামিন নাকচ

মামলাটির আপিল পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য আগামী ১৭ নভেম্বর দিন ধার্য করেন বিচারক।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ: ময়মনসিংহের তিন দণ্ডিতের জামিন নাকচ

সুপ্রিম কোর্টের ছবি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Oct 2026, 04:19 PM

Updated : 07 Oct 2026, 04:41 PM

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ময়মনসিংহের তিন আসামির জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়েছে চেম্বার আদালত।

বুধবার চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে মামলাটির আপিল পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য আগামী ১৭ নভেম্বর দিন ধার্য করেন।

দণ্ডিতরা হলেন-মো. হরমুজ আলী, মো. আব্দুস সাত্তার, খন্দকার গোলাম রাব্বানী, খন্দকার গোলাম সাব্বির আহমেদ ও মো. ফখরুজ্জামান।

শুনানি শেষে এসব মামলার আপিলকারীদের আইনজীবী এসএম শাহজাহান বলেন, “একই রায়ের ভিত্তিতে তিনটি পৃথক আপিল করা হয়েছে এবং তিনটিতেই আসামি মো. ফখরুজ্জামান, মো. আব্দুস সাত্তার ও খন্দকার গোলাম রাব্বানীর খালাস চাওয়া হয়েছে।”

খালাসের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে শাহজাহান বিডিনিউজ টোয়ন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলায় প্রসিকিউশনের একমাত্র সাক্ষী ছিলেন একজন, যিনি সাক্ষ্য দেওয়ার সময় নাবালক ছিলেন। এটিকে আপিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রাউন্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বুধবারের শুনানিতে আমাদের প্রধান প্রার্থনা ছিল জামিন। তবে আদালত জামিন না দিয়ে মামলাটির পূর্ণাঙ্গ আপিল শুনানি নিশ্চিত করতে পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য করে।”

প্রসিকিউশনে যোগ দেওয়া মামলার আপিলকারী আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিমের এই মামলায় উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজাহান বলেন, “তামিম আগে মামলাটিতে ডিফেন্সের ফাইলিং ল’ইয়ার ছিলেন। পরে প্রসিকিউশনে যোগ দেওয়ায় নৈতিক কারণে তিনি এখন আপিলকারীদের বিরুদ্ধে এই মামলায় কাজ করতে পারবেন না। কারণ, ডিফেন্সের আইনজীবী হিসেবে তিনি আগেই মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য দেখেছেন।”

এর আগে ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে বিচারপতি মো. আবু আহমেদ জমাদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ময়মনসিংহের পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গুম ও অপহরণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের এই দণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ে বলা হয়, রায়ের আগে কারাগারে কাটানো সময় সাজা থেকে বাদ যাবে।

সেসময় মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সিমন, রেজিয়া সুলতানা চমন ও ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আব্দুস সোবহান তরফদার, মিজানুল ইসলাম ও গাজী এম এইচ তামিম।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে ময়মনসিংহের গোলকীবাড়ী বাইলেনের প্রখ্যাত ভাস্কর আব্দুর রশিদকে জিপ গাড়ির পেছনে রশি দিয়ে বেঁধে টেনেহিঁচড়ে নির্মমভাবে হত্যা ও লাশ গুমের দায়ে খন্দকার গোলাম রাব্বানী ও মো. ফখরুজ্জামানকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়।

ত্রিশালের বৈলর হিন্দুপল্লী ও মুন্সিপাড়ায় অগ্নিসংযোগ এবং যোতিশ চন্দ্র চক্রবর্তীকে গুলি করে হত্যা ও দুইজন হিন্দুকে গুলি করে আহত করার দায়ে হরমুজ আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া বৈলরের আ. রহমান মেম্বারকে অপহরণের পর হত্যার দায়ে হরমুজ আলীকে আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

খন্দকার আব্দুল আলী রতনকে অপহরণের পর হত্যা ও লাশ গুমের দায়ে খন্দকার গোলাম রাব্বানী, খন্দকার গোলাম সাব্বির আহমেদ, মো. ফখরুজ্জামান ও আব্দুস সাত্তারকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়।

মো. আবেদ হোসেন খানকে আটক, নির্যাতন ও পাকিস্তান বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের দায়ে আব্দুস সাত্তারকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আওয়ামী সরকারের সাবেক সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বাবুকে অপহরণ, আটক ও নির্যাতনের অভিযোগের আসামি ছিলেন কেবল এমএ আব্দুল হান্নান। বিচার চলাকালেই তিনি মারা যান।

রায়ের সময় দণ্ডিত আসামি ফখরুজ্জামান ও খন্দকার গোলাম সাব্বির আহমেদ পলাতক ছিলেন।

তবে রায় ঘোষণার কয়েক দিনের মাথায় ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর গোড়ান এলাকা থেকে ৬৬ বছর বয়সী ফখরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)। পরে তাকে ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।

দণ্ডিতদের মধ্যে সাব্বির এখনও পলাতক রয়েছেন আর বাকীরা কারাগারে আছেন।

এই মামলার শুরু হয় ২০১৫ সালের ১৯ মে। ময়মনসিংহের ত্রিশালের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমানের স্ত্রী রহিমা খাতুন মামলাটি দায়ের করেন।

পরে ময়মনসিংহের ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মামলাটি ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মতিউর রহমান ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ১১ জুলাই পর্যন্ত তদন্ত করেন।

২০১৬ সালের ১১ জুলাই তদন্ত সংস্থা আসামিদের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, হত্যা ও গুমের অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন দাখিল করে।

ওই বছরের অক্টোবরে প্রসিকিউশনের আবেদনে মামলার আট আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। ওইদিনই ঢাকায় গ্রেপ্তার হন এমএ হান্নান ও তার ছেলে রফিক সাজ্জাদ এবং ময়মনসিংহ সদর ও ত্রিশালে গ্রেপ্তার হন আরও তিনজন।

মামলার মোট আট আসামির মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিচার চলার মধ্যেই কারাগারে মারা যান জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য এমএ আব্দুল হান্নান, তার ছেলে মো. রফিক সাজ্জাদ ও মিজানুর রহমান মিন্টু। ফলে মামলায় আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচজনে।

২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয় এবং ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল।