হাতিরঝিল টু গুলশান-বনানী: নতুন সেতুতে নতুন নৌপথ

গুলশান ও বনানী লেকের সংযোগ সড়কে ছয়টি সেতুর নকশা তৈরিসহ ১৩০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের অনেক কাজই এগিয়েছে বলে জানিয়েছেন মেয়র আতিকুল ইসলাম।

ওবায়দুর মাসুম, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 August 2022, 06:45 PM
Updated : 13 August 2022, 06:45 PM

হাতিরঝিল হয়ে গুলশান ও বনানী লেক দিয়ে নৌ চলাচলের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা এবার প্রকল্পে গড়িয়েছে; যেটির আওতায় সংযোগ সড়কগুলোতে বিদ্যমান কালভার্ট ও সেতু ভেঙে করা হবে নতুন সেতু।

পাশাপাশি লেকের পানি বাড়ানো হবে যাতে প্রস্তাবিত নৌপথে বছরজুড়ে চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে; যা রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে চাপ কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একইসঙ্গে লেক ও আশপাশের এলাকার উন্নয়নও করা হবে প্রকল্পের আওতায়; থাকবে বিনোদনের ব্যবস্থা। লক্ষ্য হাতিরঝিলের মত দৃষ্টিনন্দন কেন্দ্ররূপে গড়ে তোলা।

দীর্ঘদিন থেকে আলোচনায় থাকা রাজধানীর কেন্দ্রের এই তিন জলাশয় ঘিরে চলাচলের পথ খুললে বেশ কিছু এলাকার বাসিন্দাদের নগরীতে দৈনন্দিন যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্য যেমন আসবে, তেমনি সময় ও অর্থ সাশ্রয় হওয়ার কথা বলে আসছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

“আমি নিজেই চিন্তা করি গুলশান এক নম্বর সড়কে ব্রিজ করে এটা চালু করে দিলে বিশাল একটা নৌরুট হবে। এই এলাকার বাসের ওপর চাপ কমবে। নৌকায় খুব আরাম হবে। যানজট হবে না,” এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার এ প্রকল্প নিয়ে আশাবাদী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম এভাবেই বলছিলেন তার প্রত্যাশার কথা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি জানান, এজন্য নকশা তৈরিসহ অনেক কাজই এগিয়ে রেখেছে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া উত্তর সিটি করপোরেশন। এখন সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হাতিরঝিলের উপশাখা খাল (বনানী-হাতিরঝিল-নড়াইখাল) সংস্কার, পানি প্রবাহ বৃদ্ধি, নৌ যোগাযোগ ও বিনোদন সুবিধার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক এ প্রকল্প প্রস্তাব গত ১২ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

হাতিরঝিলের সঙ্গে যুক্ত করে নৌ চলাচলের ব্যবস্থা করতে প্রকল্পের আওতায় ছয়টি সেতু করা হবে। একই সঙ্গে দুটি ইউলুপ ও একটি ওভারপাস করা হবে।

বর্তমানে লেকগুলোকে যুক্ত করা নিকেতন-গুলশান সড়ক, মহাখালী থেকে গুলশান ১ নম্বর সড়ক, বনানী থেকে গুলশান ২ নম্বর সড়ক, গুলশান ১ নম্বর থেকে বাড্ডা লিংক রোডের চারটি কালভার্ট ভেঙে সেখানে উঁচু করে সেতু করা হবে।

এছাড়া গুলশান ২ নম্বর থেকে বারিধারা সড়কের থেকে সেতুটিও ভেঙে আরও উঁচু করা হবে। আর গুলশানের মানারাত স্কুল থেকে শাহজাদপুর সড়কে আরও একটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে প্রকল্পে।

সড়কে ওভারপাসটি হবে গুলশান থেকে বাড্ডা লিংক রোডের গুদারাঘাট অংশে।

এছাড়া এই লিংক রোডের গুলশান প্রান্তে একটি এবং মহাখালী ও গুলশান সড়কের গুলশান প্রান্তে একটি ইউ লুপ করা হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হাতিরঝিলের সঙ্গে ওই দুটি লেক মিলিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা আছে।

“এসব নৌপথ সম্প্রসারণ হলে শতভাগ বিকল্প হয়তো হবে না কিন্তু যাদের গন্তব্য স্থলে যাত্রাপথটা মিলে যাবে অথবা নৌপথ শেষ হওয়ার পরও কিছুটা পথ হাঁটতে হবে তাদের জন্য ভালো হবে। মানুষ নির্ঝঞ্জাট, আরামদায়ক বাহনে দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিল দেখতে দেখতে যাতায়াত করতে পারবে। এছাড়া একেকটা ওয়াটার বোটে মিনিবাসের সমান যাত্রী বহন করতে পারবে, যা সড়কে চাপ কমাবে।”

যাওয়া যাবে কোথায়

পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যমান বাধাগুলো কাটিয়ে এসব লেক দিয়ে নৌ চলাচল শুরুর ব্যবস্থা করা গেলে অনেকগুলো এলাকার মধ্যে যাতায়াত সহজ হবে; কমবে অনেক দূরত্ব এবং যানজট আর গণপরিবহনের ভোগান্তি দূর হবে।

বর্তমানে হাতিরঝিলের এফডিসি প্রান্তে ওয়াটার ট্যাক্সি টার্মিনাল থেকে বাড্ডা লিঙ্ক রোড পর্যন্ত নৌপথের দূরত্ব সাড়ে তিন কিলোমিটার, রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত পৌনে তিন কিলোমিটার। রামপুরা ব্রিজ থেকে বাড্ডা লিঙ্ক রোড পর্যন্ত নৌপথের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার।

হাতিরঝিলের সঙ্গে বনানী লেকের সংযোগ রয়েছে; তবে সংযোগ সড়ক ও নিচু কালভার্টের কারণে নৌ যান চলাচলের সুযোগ নেই। প্রকল্পে নতুন সেতু করে বনানী ও বারিধারা পর্যন্ত নৌপথ করা হবে।

এফডিসি থেকে বারিধারা পর্যন্ত নৌপথে দূরত্ব সাড়ে ছয় কিলোমিটার এবং বনানী কবরস্থান পর্যন্ত পৌনে ছয় কিলোমিটার। বনানী থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত দূরত্ব হবে সাড়ে চার কিলোমিটার।

একইভাবে হাতিরঝিল থেকে গুলশানের শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি পার্ক ও নিকেতনের মাঝখান দিয়ে নৌপথে বনানীর ১৮ নম্বর সড়ক পর্যন্ত চলাচলের সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বনানী লেকের ওপর বানানো নিকেতন-গুলশান সড়ক, মহাখালী-গুলশান এবং বনানী-গুলশানে যাওয়া কামাল আতাতুর্ক এভিনিউর কালভার্টের কারণে যা এখন সম্ভব হচ্ছে না।

হাতিরঝিলের সঙ্গে বনানী কড়াইল বস্তির দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে বনানী চেয়ারম্যান বাড়ি পর্যন্ত আরেকটি নৌরুট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য ওই বস্তির পাশে দখল হয়ে যাওয়া লেক উদ্ধার করতে হবে।

এই প্রকল্পের স্থাপত্য নকশা করেছেন ইকবাল হাবিব। তিনি জানান, গুলশান ও নিকেতনের মাঝখান দিয়ে একটি নৌপথ যাবে। মহাখালী টিঅ্যান্ডটি বস্তির কাছে এসে সেটি আবার দুই ভাগ হবে।

একটি অংশ চলে যাবে বনানী কবরস্থান পর্যন্ত। আরেক অংশ কড়াইল বস্তির দক্ষিণ পাশ দিয়ে যাবে বনানী ৮ নম্বর সড়ক পর্যন্ত।

পথ দেখাচ্ছে হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সি

রাজধানীর দিলু রোডের বাসিন্দা নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী সামিন আহমেদ প্রতিদিন হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সিতে করে বসুন্ধরার ক্যাম্পাসে যান। এফডিসির সামনে থেকে ওয়াটার ট্যাক্সিতে উঠে বাড্ডা লিঙ্ক রোডে নামেন। সেখান থেকে বাসে করে যান বসুন্ধরা গেইট পর্যন্ত। প্রতিদিনই ভাবেন ওয়াটার ট্যাক্সিতে করে যদি বারিধারা পর্যন্ত যাওয়া যেত।

তিনি বলেন, “আমি এখানে নেমে কুড়িলের বাসে উঠি। যানজট না থাকলে ১৫ মিনিটে যাওয়া যায়, কিন্তু জ্যাম থাকলে শাহজাদপুর, নতুন বাজার পার হয়ে এক ঘণ্টায়ও যাওয়া যায় না। বোট বারিধারা পর্যন্ত গেলে সেখানে নেমে হেঁটেও যাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা, বোটে গেলে খুব আরামে যাওয়া যায়।”

উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা মিল্লাত হোসেনের অফিস তেজগাঁওয়ে। তিনিও যাতায়াতে ওয়াটার ট্যাক্সি বেছে নিয়েছেন।

হাতিরঝিলের বর্তমান নৌরুট আরও সম্প্রসারণ করা দরকার মন্তব্য করে তিনি বলেন, “নৌরুটের সুবিধা হল যানজট নাই। খুবই আরামদায়ক, পানির কাছাকাছি বলে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা অনুভূতি হয়। বাসের রড ধরে যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। নৌরুটটা কোনোভাবে সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত আর ওদিকে বারিধারা এবং বনানী পর্যন্ত নিতে পারলে যুগান্তকারী কাজ হবে।”

রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, এক সময় ওই নেটওয়ার্ক থাকলেও কালভার্টের কারণে এখন নৌযান চলতে পারে না। মহাখালী ও বনানী থেকে গুলশান, গুলশান থেকে বাড্ডা ও বারিধারামুখী সড়কের ওপর বানানো কয়েকটি কালভার্ট ভেঙ্গে সেখানে উঁচু সেতু করলেই এসব নৌরুট চালু করা সম্ভব।

“হাতিরঝিলের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় নৌপথ খুবই জনপ্রিয়। বোটে করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াতে তিনটা বিষয় কাজ করে- সাশ্রয়ী, কম সময় এবং উপভোগ করা যায়,” যোগ করেন তিনি।

তার মতে, “আমি মনে করি ওই হাতিরঝিলের সঙ্গে দুটি লেকে নৌপথ সম্প্রসারণ করলে ফ্যান্টাস্টিক বিষয় হবে। এটা যানজট নিরসনে যেমন ভূমিকা পালন করবে পরিবেশের ওপরও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।

“ওই ওয়াটার চ্যানেলটা হলে ঢাকা শহরের দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতা নিরসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”

হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে হাতিরঝিলে ওয়াটার ট্যাক্সির চলাচল শুরু হয়। বর্তমানে এফডিসি গেট থেকে রামপুরা ও বাড্ডা লিঙ্ক রোড এবং বাড্ডা লিঙ্ক রোড থেকে রামপুরা রুটে ১৫টি ওয়াটার ট্যাক্সি চলে।

ওয়াটার ট্যাক্সিগুলো হাতিরঝিল থেকে গুলশান শ্যুটিং ক্লাবের পেছন দিয়ে গুলশান লেকে ঢোকে, যায় বাড্ডা লিঙ্ক রোড পর্যন্ত।

তবে গুলশান লেকের ওপর বানানো গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড, গুলশান-শাহজাদপুর সড়ক এবং গুলশান-বারিধারা সড়কের নিচু কালভার্টের কারণে এর বেশি নৌ চলাচলের কোনো সুযোগ নেই।

কী থাকছে প্রকল্পে

এই সুযোগ তৈরি করতেই উত্তর সিটি ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকার এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

নতুন নৌপথ চালুর জন্য হাতিরঝিল, গুলশান ও বনানী লেককে সংযুক্তকারী সেতু ও কালভার্ট ভেঙে উঁচু করে সেতু করা হবে। নতুন একটি সেতুও নির্মাণ করা হবে গুলশান থেকে শাহবাজপুর সড়কে।

একই সঙ্গে একটি ওভারপাস এবং দুটি ইউ লুপ নির্মাণও করা হবে এসব সড়কে যান চলাচল সচারু করতে।

প্রকল্পের আওতায় গুলশান ও বনানী লেক এবং পাড় সংস্কার করা হবে, লেকের পাশে থাকবে বিনোদনের নতুন ব্যবস্থা। লেকের পানি ধারণ ক্ষমতা ও প্রবাহ বাড়ানো হবে।

ডিএনসিসি ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের যৌথ বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাবে ৪৪৩ কোটি টাকার বেশি রাখা হয়েছে ব্রিজ, ইউলুপ ও গ্রেড সেপারেটর নির্মাণে, পানির গুণমান ব্যবস্থাপনায় রাখা হয়েছে ১০১ কোটি, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় ১১৭ কোটি এবং পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে ৬৮ কোটি টাকা।

মোট ব্যয়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দেবে এক হাজার ১৮ কোটি টাকা এবং উত্তর সিটি নিজেদের তহবিল থেকে ৩৩৯ কোটি টাকা দেবে।

প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এটি বাস্তবায়ন হলে গুলশান ও বনানী লেকও হাতিরঝিলের মত দৃষ্টিনন্দন বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হবে। চলতি বছরে কাজ শুরু করে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্থপতি ইকবাল হাবিব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, নতুন নৌপথের পাশাপাশি গুলশানের যান চলাচলেও ভূমিকা রাখবে প্রকল্পটি। এজন্য এটির আওতায় দুটি ইউ লুপ নির্মাণ করা হবে। এতে গুলশান ১ নম্বর এলাকায় তখন কোনো সিগন্যাল থাকবে না।

একইভাবে গুলশান থেকে বাড্ডামুখী যানবাহনকে গুদারাঘাটের ক্রসিংয়ে পড়তে হবে না।

তিনি জানান, নতুন একটিসহ পুরনো সেতু ও কালভার্ট ভেঙে এমনভাবে সেতুগুলো করা হবে যেন সেগুলোর নিচ দিয়ে নৌযান যেতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ওই দুটি লেকের সঙ্গে হাতিরঝিলের নৌপথকে যুক্ত করতে পারলে তা ঢাকার যানজট এবং যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে সাহায্য করবে।

তবে অধ্যাপক শামসুল হক সম্ভাবনাময় এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগে থেকে সতর্ক থাকারও পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ব্যাপক আকারে নৌযান নামিয়ে ছেড়ে দিলে হবে না। সেগুলো যেন লেকের পরিবেশ দূষণ না করে সেদিকে নজর রাখতে হবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক