৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

সেই ফেরদৌসীকে নিয়ে এখন দিশেহারা পরিবার, প্রয়োজন ভালো চিকিৎসা

ফেরদৌসীর মা বলেন, “তারা দুই লাখ ট্যাকা দিছে, মেয়েরে চিকিৎসা করাইয়া আইনা দিছে, মামলা ডিসমিস হইয়া গ্যাছে গা। এহন তারা মইরা গ্যালেও আমার মেয়েরে আর দ্যাখব না। ওর যে অবস্থা হইছে, ওরে তো আমি বিয়াও দিতে পারুম না।”

সেই ফেরদৌসীকে নিয়ে এখন দিশেহারা পরিবার, প্রয়োজন ভালো চিকিৎসা

অর্থাভাবে মেয়েকে ঢাকায় সাংবাদিক সৈয়দ আশফাকের বাসায় দিয়েছিলেন জোসনা বেগম; কিন্তু সেই ভবন থেকে মেয়ের পড়ে যাওয়ার ঘটনায় গোটা পরিবারে নেমেছে অন্ধকার।

গোলাম মর্তুজা অন্তু গোলাম মর্তুজা অন্তু

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ফিরে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Feb 2024, 01:36 AM

Updated : 29 Feb 2024, 11:15 AM

দুই দফা অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতাল ছাড়লেও এখনো বসলে উঠে দাঁড়াতে পারে না ৯ বছরের ফেরদৌসী, প্রস্রাব করতে গেলেও চিৎকার দিয়ে ওঠে যন্ত্রণায়।

এই বয়সে যখন তার স্কুল আর খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা, তখন শারীরিক এমন ক্ষত আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটছে তার।

অচল সংসারে একটু ভালো চলার আশায় ফেরদৌসীকে ঢাকায় ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হকের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে পাঠিয়েছিলেন তার মা-বাবা। কদিন পরই খবর পান, ওই ভবন থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছে মেয়ে।

গত বছরে ৬ অগাস্টের সেই ঘটনায় মামলা দায়ের করে ফেরদৌসীকে নির্যাতনের অভিযোগ করে তার পরিবার। সেই মামলায় গত সপ্তাহে আদালত থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন সৈয়দ আশফাক ও তার স্ত্রী তানিয়া খন্দকার।

ওই ঘটনা নিয়ে প্রথম দিকে তেমন আলোচনা হয়নি। কিন্তু ঠিক ছয় মাস পর গত ৬ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ আশফাকের বাসা থেকে একইভাবে পড়ে প্রীতি উরাং নামে আরেক কিশোরী গৃহকর্মীর মৃত্যুর পর আলোচনা হচ্ছে ফেরদৌসীর পড়ে যাওয়া নিয়েও।

আহত ফেরদৌসীর চিকিৎসা আর ‘২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণে’ প্রথম মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেও ৬ ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় ঘটনায় রিমান্ড শেষে এখন কারাগারে আছেন আশফাক ও তার স্ত্রী তানিয়া। এই সাংবাদিকের বাসা মোহাম্মদপুরে শাহজাহান রোডের জেনিভা ক্যাম্প সংলগ্ন ভবনের নয় তলায়।

ফেরদৌসীর পরিবার বলছে, মেয়েটি ঘরে ফিরলেও এখনো সে স্বাভাবিক কাজকর্ম বা চলাফেরা করতে পারে না। পরিবারের উপার্জন না থাকায় তাকে স্কুলে পাঠানোর কথা তারা ভাবতেও পারেন না।

Image

গত ৬ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ আশফাকের বাসা থেকে একইভাবে পড়ে প্রীতি উরাং নামে আরেক কিশোরী গৃহকর্মীর মৃত্যুর পর আলোচনা হচ্ছে ফেরদৌসীর পড়ে যাওয়ার আগের ঘটনা নিয়েও

ফেরদৌসীর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের কাহেতুরা গ্রামে। শহুরে বস্তির মত ঘিঞ্জি বাড়িঘরের মাঝে সরু গলি ধরে খানিকটা যাওয়ার পর দেখা যায় তাদের ভাঙাচোরা টিনের ঘর। এক শতাংশ জায়গার ওপর অনেক বছর আগে ঘরটি তৈরি করলেও এখন আর মেরামতের সামর্থ্য নেই পরিবারের।

গত সোমবার ওই বাড়িতে গিয়ে কথা হয় ফেরদৌসী, তার মা জোসনা বেগম ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে। ফেরদৌসীর বাবা কেলো মিয়া বাড়িতে ছিলেন না।

সত্তোরর্ধ্ব কেলো মিয়ার প্রথম স্ত্রী ১৬ বছর আগে মারা গেলে জোসনা বেগমকে তিনি বিয়ে করেন। সেই ঘরে তার তিন মেয়ে। বড় মেয়ের বয়স ১৫, মেজো ফেরদৌসীর নয়, আর ছোট মেয়ের বয়স তিন বছর।

গৃহকর্মী প্রীতি উরাংয়ের মৃত্যুর ঘটনায় সৈয়দ আশফাক গ্রেপ্তার হওয়ার পর ফেরদৌসীদের বাড়িতেও ভিড় করতে শুরু করেন সাংবাদিকরা। জানার চেষ্টা করছেন আগের ঘটনা। সে কারণে ফেরদৌসীদের বাড়ি এরই মধ্যে গ্রামে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। নতুন কেউ এলেই স্থানীয়রা জড়ো হচ্ছেন, উৎসাহ নিয়ে কথা বলছেন।

Image

ঢাকার মোহাম্মদপুরে এই ভবন থেকে পড়েই গত বছরে ৬ অগাস্ট আহত হয় ফেরদৌসী; আর এ বছর ৬ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয় প্রীতি উরাংয়ের

কী হয়েছিল সেদিন

ভবন থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় ফেরদৌসী তার মাকে বলেছে, বাসার মালিক তাকে বাড়িতে যেতে দিচ্ছিল না। তাই সে ওপর থেকে জানালা দিয়ে নামার চেষ্টা করছিল। কিছুদূর নামার পর পা পিছলে নিচে পড়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে যায়।

এরপর বাসার মালিক তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে কয়েকদিন তার চিকিৎসা হয়। পরে নেওয়া হয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে।

ফেরদৌসীর মা জোসনা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাসার মালিকের চাপের মুখে মেয়েকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।”

ওই ঘটনার পর বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন ফেরদৌসীর খালাত ভাই নাজিমুদ্দিন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, তাদের আরেক আত্মীয় হেদায়েতুল্লাহ ঘটনা পর থেকে পরিবারটির আসা-যাওয়া ও থাকাসহ বিভিন্ন খরচ বহন করছিলেন। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না জোসনা বেগমের। সেটি করতে গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র বানাতে হয়েছে। সেখানে লেগেছে ৮ হাজার টাকা। এছাড়া চিকিৎসা থেকে যাতায়াতসহ সব খরচই হেদায়েতুল্লাহ দিয়েছেন।

Image

ফেরদৌসীদের ভাঙাচোরা ঘরটি আর মেরামতেরও উপায় নেই।

জোসনা বেগমের গ্রাম সম্পর্কে আত্মীয় হেদায়েতুল্লাহ বলেন, “পরিবারটির তখন এমন অবস্থা ছিল, তাদের পাশে না দাঁড়ালে এসব কিছুই হত না। টাকা-পয়সা না থাকায় তারা দিশেহারা ছিল। পরে সব বাদ দিয়ে আগে পরিবারটি যেন একটা বিচার পায়, মেয়েটি যেন চিকিৎসা পায়, সেই চেষ্টা আমরা করেছি।

“আমাদের টাকা খরচ করতে দেখে ফেরদৌসীর মা বলেছিলেন, ক্ষতিপূরণ পেলে টাকা দিয়ে দেবেন। তবে আমরা টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে ভাবিনি।”

সৈয়দ আশফাকের বাসায় ওই ঘটনার পর মধ্যস্থতা করেন হেদায়েতুল্লাহ। প্রথমে আপসরফার ওই পথে তারা যেতে না চাইলেও ফেরদৌসীর বাবা-মায়ের তরফ থেকেই আপসের বিষয়টি আসে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান হেদায়েত।

সৈয়দ আশফাক এবং তার স্ত্রী কারাগারে থাকায় সেদিনের ঘটনা নিয়ে তাদের ভাষ্য জানতে পারেনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

‘মইরা গ্যালেও আর মেয়েরে ওরা দ্যাখব না’

আপসরফায় চিকিৎসা আর ‘ক্ষতিপূরণ হিসেবে’ ফেরদৌসীর পরিবারকে ‘২ লাখ’ টাকা দিয়েছেন সাংবাদিক আশফাক। এরপর মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি এবং তার স্ত্রী।

তবে ‘ক্ষতিপূরণের’ সেই টাকা ফেরদৌসীর শারীরিক ক্ষতির কাছে যৎসামান্য বলেই মনে করছে তার পরিবার।

Image

আদালতে ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হক ও তার স্ত্রী তানিয়া খন্দকার

ফেরদৌসীর মা বলেন, “মেয়ের যে অবস্থা, তাতে ওর জীবন শ্যাষ। সারাজীবন ডাক্তার, ওষুধ লাগব। ওই বাড়ির মালিকেরা কইয়া দিছে, তারা দুই লাখ ট্যাকা দিছে, মেয়েরে চিকিৎসা করাইয়া আইনা দিছে, মামলা ডিসমিস হইয়া গ্যাছে গা। এহন মইরা গ্যালেও তারা আমার মেয়েরে আর দ্যাখব না। ওর যে অবস্থা হইছে, ওরে তো আমি বিয়াও দিতে পারুম না।”

জোসনা বেগমের কথায় সায় দিয়ে তার বাড়িতে জড়ো হওয়া অন্য নারীরা বলছিলেন, উপর থেকে পড়ার পর ফেরদৌসী তলপেটে আঘাত পেয়েছে। তার জননাঙ্গে অস্ত্রোপচারের চিহ্ন রয়েছে। এ অবস্থায় শিশুটিকে নিয়ে কতদিন হাসপাতালে দৌড়াতে পারবে তার পরিবার, এটা বড় প্রশ্ন।

জোসনা বেগম বলেন, দুই লাখ টাকার চেক তারা পেয়েছেন। কিন্তু ফেরদৌসীর চিকিৎসায় তাদের যে আত্মীয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ করে ফেলেছেন, তাকে সেই অর্থ ফেরত দিতে হবে। মেয়ের ক্ষতগুলো সেরে উঠলেও এখন সে ঘন ঘন অসুস্থ হচ্ছে। এমন অবস্থায় মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় আছেন তারা।

ফেরদৌসীর চাচাত ভাইয়ের স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক নারী বলেন, “গত কয়েকদিনে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে অনেকে মেয়েটিকে নানা প্রশ্ন করেছে। কেউ জানতে চেয়েছে, তাকে ওপর থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে কিনা। ফেলে দেওয়ার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে কিনা, এমন নানা প্রশ্ন।

“ছোট শিশু এত কঠিন কঠিন শব্দের মানেও বোঝে না। এসব কারণে ওর মধ্যে এক ধরনের সাংবাদিক ভীতি তৈরি হয়েছে। এখন বাইরের মানুষের সামনে এলে সে কোনো কথাই বলতে চায় না।”

‘এখন কেবলই হতাশা’

ফেরদৌসীর বাবা কেলো মিয়া অনেক দিন ধরে অসুস্থ; কোনো কাজ করতে পারেন না। পরিবারে উপার্জনক্ষম আর কেউ নেই।

Image

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের কাহেতুরা গ্রামে ঘিঞ্জি বাড়িগুলোর সরু গলি ধরেই যেতে হয় ফেরদৌসীদের বাড়িতে।

জোসনা বেগম জানান, পরিবারের অনটনে মেয়েদের তিনি স্কুলে পাঠাতে পারেননি। বড় মেয়েটাকে ঢাকায় এক বাড়িতে কাজে দিয়েছেন। মেজোটাকেও সেই পথে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তার যে শারীরিক অবস্থা, তাতে আর কোনো আশা দেখছেন না।

মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর কথা বললে তিনি বলেন, “ক্যামনে পাঠামু। পরিবারে কোনো কামাই নাই।”

জোসনা বেগমের সঙ্গে কথা বলার সময় আরেক নারী এগিয়ে এসে বলেন, “হ্যারা খুবই গরিব, আপনি বুঝতাছেন না। মাইয়া ব্যথা পাইছে শুইনা যে তারা ঢাকা যাইব, সেই ট্যাকাও তাগো আছিল না। মাইয়া উপ্রে থিকা পড়ার খবর পথমে পাইছে তার চাচাত ভাই হেদায়েতুল্লাহ। হেই ব্যাডায় মাইয়ার মারে ফোন কইরা কইছে, তুমরা এক্ষণ ঢাকা আয়।

“মাইয়ার মায় ভাবছে হয়ত মাইয়ারে ফেরত দিব, এই কারণে যাইতে কইছে। আবার তার কাছে ট্যাকাও নাই। সে কাউকে কিছু কয়ও না, নিজেও বুঝে না। পরে ঢাকাত্তে তারা পাশের বাড়িতে ফোন কইরা কইছে, এরপর আমরা সবাই মিল্লা তাগো গাড়িত তুইলা দিছি।”